একুশের বইমেলার প্রথম দিনে মানুষের ঢল

একুশের বইমেলার প্রথম দিনে মানুষের ঢলঢাকা, 2 ফেব্রুয়ারি, ২০১৪ : ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত অমর একুশে গ্রন্থমেলা ৩৬ বছর পর ঐতিহাসিক বাংলা একাডেমি চত্বর ছাড়িয়ে আজ থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নতুন আমেজ নিয়ে শুরু হয়েছে।
বিকাল সাড়ে তিনটায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাসব্যাপী বাঙালীর এ প্রাণের মেলার উদ্বোধন ঘোষণা করেন। উদ্বোধনের পর তিনি সম্প্রসারিত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলা একাডেমীর স্টলসহ বেশ কয়েকটি স্টল ঘুরে দেখেন।

প্রধানমন্ত্রী মেলা প্রাঙ্গণে অবস্থানকালীন পাঠক-দর্শণার্থীরা মেলায় প্রবেশের অপেক্ষায় দীর্ঘ লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী চলে যাওয়ার পরপরই হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে মেলায় প্রবেশের জন্য। নানা সংকট ও সম্ভাবনার দোলাচল নিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বড় পরিসরে যাত্রা করা মেলার প্রথম দিনটি পাঠক-দর্শণার্থীদের হতাশ করেছে। কারণ ২৩২টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অধিকাংশের স্টলেই চলছে সাজ-সজ্জার কাজ।

মেলা ঘুরে দেখা গেছে, অনেক প্রকাশক গ্রন্থমেলার নীতিমালার তোয়াক্কা না করে স্টল সজ্জায় আবার বাণিজ্যিকীকরণের আশ্রয় নিয়েছিল। তারা বইয়ের চেয়ে ভোগ্যপণ্যকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে স্টল সাজিয়েছিল। এমন অর্ধ-শতাধিক স্টলের ব্যানার, সাইনবোর্ড ও দেয়ালজুড়ে শোভা পেতে দেখা গেছে চিপস, বিস্কুট, কেক, জুস, ন্যুডলস, মিনারেল ওয়াটার ইত্যাদির বিজ্ঞাপন। স্টলগুলোর সাজ-সজ্জা দেখে যে কারো মনে হতে পারে এটা বই নয়, ভোগ্যপণ্যের মেলা।

তবে বাংলা একাডেমির নির্দেশে স্টলগুলো থেকে এসব বিজ্ঞাপন যে আবার মুছে ফেলার ব্যর্থ চেষ্টা করা হয়েছে সেটাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে পণ্যের বিজ্ঞাপনের ওপর রঙ পলিশের ধরণ দেখে। যা ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণকারী পাঠক-দর্শনার্থীদের হৃদয়কে বেশ পীড়া দিয়েছে। একাধিক পাঠক-দর্শনার্থী বাসসকে জানান, বাংলা একাডেমি চত্বর থেকে গ্রন্থমেলাকে সরিয়ে আনতে না আনতেই ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি বিজোড়িত এ মেলাকে নিয়ে অসাধু প্রকাশকদের বাণিজ্যিকীকরণের যে ধরণ আজ মেলায় ফুটে উঠেছে, যা অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক।

একাডেমির কঠোর পদক্ষেপের কারণে হয়তো প্রকাশকরা বিজ্ঞাপনের ওপর রঙের পলিশ দিতে বাধ্য হয়েছে। তারপরও মেলায় প্রবেশ করলে এখনও মনে হবে এটা জ্ঞানের নয়, পণ্য সামগ্রী ক্রয়ের মেলা। তারা আরো বলেন, একাডেমিকে আরো কঠোর হয়ে অসাধু ওই প্রকাশকদের চুনকাম করা ব্যানার ও দেয়ার লিখন সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তনের নির্দেশ দিতে হবে। তা না হলে আগামীতে তারা এতে আরো উদ্বুদ্ধ হবে। একাডেমির তোয়াক্কা না করে একে বারোয়ারি মেলায় পরিণত করবে।

এ প্রসঙ্গে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বলেন, যেসব প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বইয়ের পাশাপাশি পণ্যের বিজ্ঞাপন দিয়ে স্টল সাজিয়েছিল, তাদের আমরা আজ স্টল খুলতে দেইনি। আমাদের কঠোরতার কারণেই অনেকে বিজ্ঞাপনের উপর রঙ পলিশ করে তা মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে। তবে একাডেমি তাদের জানিয়ে দিয়েছে ব্যানার পরিবর্তন না করলে স্টল খুলতে দেয়া হবে না। মহাপরিচালক এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, যে স্টলগুলো এ কাজ করেছে তাদের নাম আপাতত বলতে চাচ্ছি না, তবে তাদের সর্তক করে দেয়া হয়েছে। যদি তারা নির্দেশ না মানে, তখন তাদের বিরুদ্ধে আরো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি ওসমান গণি বলেন, কিছু প্রকাশক এ কাজ করে আমাদের ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি বিজড়িত মেলাকে কলঙ্কিত করেছে, এ জন্য সমিতির পক্ষ থেকে আমি দুঃখ প্রকাশ করছি।
তিনি বলেন, সভাপতি হিসাবে আমি কথা দিচ্ছি আগামী দিন থেকে একটি স্টলেও ভোগ্যপণ্যের কোন বিজ্ঞাপন দেখা যাবে না। এদিকে মহান ভাষা আন্দোলনের চেতনাঋদ্ধ এ মেলার স্থান পরিবর্তন করায় এবার মেলার অভ্যন্তরে প্রচুর খোলামেলা স্থান রয়েছে। মেলার প্রথম দিনে প্রধানমন্ত্রী চলে যাওয়ার পরপরই মানুষের ঢল নামলেও বড় পরিসরের কারণে তা পাঠক-দর্শনার্থীদের চলাচলে কোন ব্যাঘাত ঘটাতে পারেনি। মেলায় আগত সবার মাঝে দেখা গেছে উৎসবের আমেজ।
হাতে গোনা যে ক’টি প্রকাশনা সংস্থা আজ স্টল সাজিয়েছে, তাদের মধ্যে বাংলা একাডেমি, অন্যপ্রকাশ, আগামী, পালক, মওলা, অঙ্কুর উল্লেখযোগ্য।

অন্যপ্রকাশের সত্ত্বাধিকারী মাজহারুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অন্য প্রকাশে স্টল পরিদর্শন করেছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে প্রয়াত জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের রচনা সমগ্র’র প্রথম থেকে সপ্তম খন্ড পর্যন্ত ও স্মারকগ্রন্থ উপহার হিসাবে প্রদান করেন। প্রধানমন্ত্রী চলে যাওয়ার পর অনেকে স্টলেই আবার শুরু হয়েছে সাজ-সজ্জার কাজ। শোনা গেছে কাঠ, পেড়েক ও হাতুড়-বাটালের ঠুকঠাক শব্দ। অনেক স্টলে আবার বিদ্যুত সংযোগের কাজও করতে দেখা গেছে।

নতুন বই

অন্যপ্রকাশ এবার মেলায় এসেছে হুমায়ূন আহমেদের হিমু দশ, রচনাবলী-৭, কাকারু, টগর এ্যান্ড জেরি, ব্যাং কন্যা এ্যালেং, কানী ডাইনী, বোকা রাজার সোনার সিংহাসন, ফরিদুর রেজা সাগরের ভেনিসের ডেনিস সাহেব, শাকুর মজিদের নোবেল শহর ও শাহাবুদ্দিন নাগরীর হেমিংওয়ের দেশে। আগামী এনেছে তসলিমা নাসরীনের নিষিদ্ধ। পালক এনেছে গোলাম মোস্তাফার সাহিত্য অন্বেষা।

 @রেজওয়ান