দক্ষিণ এশিয়ার শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে কাজ করছে বাংলাদেশ : প্রধানমন্ত্রী

23 PM20140123184048

ঢাকা,১ ফেব্রুয়ারি : বাংলা একাডেমি, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান,রমনা বটমূল,আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট ও শিল্পকলা একাডেমী এলাকা নিয়ে রাজধানীতে একটি সাংস্কৃতিক বলয় গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা৷

শনিবার বিকেলে রাজধানীর বাংলা একাডেমিতে ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৪’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব পরিকল্পনার কথা জানান৷প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বিশ্বের প্রতিটি দেশের রাজধানীতে একটি সাংস্কৃতিক বলয় থাকে৷ সেখানে সাংস্কৃতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়৷ বাংলা একাডেমি থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত যাতায়াতের জন্য একটি সুন্দর (ওভারব্রিজ) উড়ালসেতু অথবা আন্ডারপাস করে দেওয়া হবে বলে তিনি জানান৷

প্রধানমন্ত্রী সাংস্কৃতিক বলয়ের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে বলেন, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পরে তাঁর সরকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে রমনা বটমূল পর্যন্ত উড়ালসেতু করে দিয়েছে৷ তিনি বলেন, আবার রমনা পার্ক থেকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট ও শিল্পকলা একাডেমী পর্যন্ত আরেকটি আন্ডারপাস করে দেওয়া যায়৷ তাহলে পুরো এলাকার মধ্যে একটা সংযোগ হবে৷ এ ধরনের একটা পরিকল্পনা সরকারের আছে বলে তিনি জানান৷

শেখ হাসিনা বলেন, মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আবারও সরকার গঠন করতে পেরেছি৷ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যখন শুরু হয়েছে, ইনশাআল্লাহ সম্পন্ন করতে পারব৷ তিনি বলেন, যে জাতি ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছে সে জাতি আত্মমর্যাদা নিয়ে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে৷ এ জন্য সবার সহযোগিতা চান তিনি৷ এ সময় তিনি একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পেছনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের উদ্যোগ ও অবদানের কথা তুলে ধরেন৷

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বইমেলা প্রেরণার উত্‍সব৷ আমরা সারা বছর বসে থাকি, কখন গ্রন্থমেলা শুরু হবে৷ অনেক দিন ধরেই চিন্তা ছিল কীভাবে মেলার স্থান সমপ্রসারিত করা যায়৷ গ্রন্থমেলা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত সমপ্রসারণ প্রতিটি বাংলার মানুষের জন্য গবেৃর বিষয় বলে তিনি উল্লেখ করেন৷ কারণ, এই সমপ্রসারণ এমন জায়গায় হয়েছে, যেখানে ৭ মার্চের ভাষণ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান৷ ঘোষণা দিয়েছিলেন “এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম”৷

প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকার লেখক-প্রকাশকের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সচেতন রয়েছে৷ তিনি বাংলার শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্মগুলো অন্য ভাষায় অনুবাদ করে সারা বিশ্বের ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান৷ বক্তব্য শেষে গ্রন্থমেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন প্রধানমন্ত্রী ও অতিথিরা৷

জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতি আদায়ের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা৷শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা করার উদ্যোগ নিয়েছি৷ কিছু সমস্যা আছে৷ তারপরও আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে৷

এই প্রসঙ্গে জাতিসংঘে বাংলায় দেয়া বঙ্গবন্ধুর ভাষণের স্মৃতি স্মরণ করে তিনি বলেন,তার ধারাবাহিকতায় আমিও জাতিসংঘে যতবার বক্তৃতা দিয়েছি, বাংলায় দিয়েছি৷প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের মধ্যদিয়ে শুরু হওয়া গ্রন্থমেলা ভাষা আন্দোলনের মাস ফেব্রুয়ারিজুড়ে চলবে৷

সরকার জাতীয় গ্রন্থ নীতি প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, লেখক-প্রকাশকদের ব্যাপারে সরকার আন্তরিক৷ প্রকাশকদের সহজ শর্তে ঋণ দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে৷বাংলাকে পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে বিদেশি ভাষায় বাংলা সাহিত্যের অনুবাদের জন্যও লেখকদের প্রতি আহ্বানও জানান তিনি৷

বরাবর বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে গ্রন্থমেলা হলেও এবার তা পাশের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেও সমপ্রসারিত হয়েছে৷এই বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বইমেলা করা নিয়ে মত-দ্বিমত থাকতে পারে৷ তবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের একটা ঐতিহাসিক মূল্য আছে৷সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় অবদানের জন্য নয়টি শাখায় ১১ জনের বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী৷ শনিবার মেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানেই এই পুরস্কার দেয়া হয়৷

কবিতায় হেলাল হাফিজ, কথাসাহিত্যে পূরবী বসু, প্রবন্ধে মফিদুল হক, গবেষণায় জামিল চৌধুরী ও প্রভাংশু ত্রিপুরা, অনুবাদে কায়সার হক, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যে হারুণ হাবীব, আত্মজীবনী/ স্মৃতি কথা/ ভ্রমণ কাহিনীতে মাহফুজুর রহমান, বিজ্ঞান প্রযুক্তি ও পরিবেশে শহীদুল ইসলাম এবং শিশু সাহিত্যে কাইজার চৌধুরী ও আসলাম সানী এবছর পুরস্কার পেয়েছেন৷

পুরস্কারপ্রাপ্তদের হাতে এক লাখ টাকার চেক, একটি করে শুভেচ্ছা স্মারক ও সনদ তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী৷ এদের মধ্যে পূরবী বসু ও মাহফুজুর রহমান দেশের বাইরে থাকায় তারা অনুষ্ঠানে আসতে পারেননি৷

অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মূকাভিনেতা পার্থ প্রতিম মজুমদারকে সম্মানসূচক বাংলা একাডেমী ফেলোশিপ দেয়া হয়৷শামসুজ্জামান খান তার ও গোলাম মুর্শিদের সম্পাদনায় তিন খণ্ডের ‘বাংলা ভাষা বিবর্তনের অভিধান’ প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন৷

উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, বাংলা একাডেমী, শিশু একাডেমিসহ শিল্পকলা একাডেমিকে নিয়ে রাজধানীতে একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে৷

বাংলা একাডেমীর সভাপতি অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেন তথ্য প্রযুক্তির যুগে হয়ত কাগজে ছাপা বই বিলুপ্ত হয়ে যাবে৷ কিন্তু এ বিষয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা অনেক ইতিবাচক৷ মনে হয় আরো কিছু কাল হয় তো এ ধরনের আশঙ্কা না করলেও চলবে৷ বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান বলেন, বিদেশি প্রকাশকরাও যেন মেলায় অংশ নিতে পারে, সেজন্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছে৷

জাতীয় সঙ্গীত ও চার ধর্মের গ্রন্থ থেকে পাঠের মাধ্যমে শুরু হয় উদ্বোধন অনুষ্ঠান৷ এর পর ভাষা শহীদদের স্মরণে বাজানো হয় ‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি’৷ এরপর ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিটের নীরবতা পালন করা হয়৷দ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান৷ সংস্কৃতিমন্ত্রী বলেন, গ্রন্থমেলার মধ্যে দিয়ে সাংস্কৃতিক বিকাশ ঘটে৷ মন্ত্রী মেলার পরিসর বাড়ার কথা তুলে ধরে বলেন, এটি ছিল দীর্ঘদিনের দাবি৷ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে মেলার পরিসর বাড়িয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছে৷দর্শক সারিতে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম প্রমুখ৷