11840_f5সিডনি বিমানবন্দরে প্রথম পা রেখেই বাংলাদেশের মেয়ে তৃষার মনটা আকাশের মতো বিশাল বড় হয়ে গেল। তার
মনে হলো, জীবনের এক নতুন সকাল শুরু হলো। তার সামনে উন্নত জীবনের হাতছানি। ১৬ বছর বয়সী তৃষা (ছদ্মনাম) অল্প সময়ের মধ্যেই বুঝতে পারলো সে প্রতারণার শিকার। ফাঁদে ফেলা হয়েছে তাকে। নিজস্বতা বলতে কিছু নেই তার। তৃষা ও তার ছোট ভাইকে এক নিকটাত্মীয় ভাল পড়াশোনা করানোর জন্য অস্ট্রেলিয়া নিয়ে যান। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর তিনি তার ছেলেকে বিয়ে করতে তৃষার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেন। তাকে স্কুলে ভর্তি করা হয় ঠিকই, তবে এর বাইরে তার কোন জীবন নেই। বাসা থেকে তাকে বের হতে দেয়া হয় না। নেই ফোনের সুবিধা। নেই যোগাযোগের কোন মাধ্যম। এমন অবস্থায় এক রকম বন্দি করে ওই আত্মীয় বাংলাদেশে অবস্থান করা তার ছেলেকে, যার বয়স ৩৬ বছর, তাকে বিয়ে করতে চাপ সৃষ্টি করেন। তার উদ্দেশ্য, এই বিয়ে হয়ে গেলে তিনি নিজের ছেলেকে অস্ট্রেলিয়া নিয়ে যেতে পারবেন। এতে তৃষা রাজি না হলে তার ওপর চাপ আরও বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে সে বৌদ্ধ সমপ্রদায়ের দুই ব্যক্তির নজরে পড়ে। তারা তাকে উদ্ধার করে পরিচ্ছন্নতার একটি কাজ দেন। প্রতিদিন এ থেকে যে আয় হয় তা দিয়ে কোনমতে ছোট ভাইকে নিয়ে সিডনির নিউ টাউনে একটি বাসায় থেকে। দিনে পরিচ্ছন্নতার কাজ করে আর রাতে পড়াশোনা করে। এভাবেই কাটছে তার দিন-রাত। তৃষার প্রত্যাশা তার মতো প্রতারণার শিকার যেন আর কেউ না হয়। এ খবর দিয়েছে নিউজিল্যান্ডের অনলাইন স্টাফ পত্রিকা। এতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে তৃষার জীবনচিত্র। বলা হয়েছে, পিতা-মাতাকে সন্তানের উন্নত শিক্ষা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তৃষা ও তার ছোট ভাইকে অস্ট্রেলিয়া নিয়ে যান তার ওই নিকটাত্মীয়। তৃষা সেখানে পৌঁছার অল্প পরেই বুঝতে পারে তার মতলব। ২০১১ সালের এক বসন্তের সকালে পূর্ব সিডনিতে পৌঁছে তৃষা ও তার ছোট ভাই। এর পর থেকেই তার ওপর নির্যাতন শুরু হয়। তার সব যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়া হয়। বলা হয়, ৩৬ বছর বয়সী এক ছেলেকে বিয়েতে রাজি হতে হবে তাকে, যাতে সে অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার ভিসা পায়। তৃষাকে তার পিতা-মাতার সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেয়া হয় না। কম্পিউটার ব্যবহার করতে দেয়া হয় না। মাঝে মাঝেই স্কুলে যেতে দেয়া হয় না। তৃষার হাতে কোন অর্থও ছিল না। ছিল না কোন গাড়ি। পারতো না ভাল ইংরেজি বলতে। ওই সময়ের পরিণতি সম্পর্কে তৃষা বলেছে, আমি শুধু ভাবতাম আমার এখন কি করা উচিত। কিছু করার মতো কোন সুযোগ ছিল না। আমি এখানে কাউকে চিনি না। আমার সঙ্গী ছিল একমাত্র ছোট ভাই। এছাড়া, আমি ছিলাম নিঃসঙ্গ। ভাই ছোট হওয়ায় তার সঙ্গেও এসব নিয়ে কথা বলতে পারিনি। এতে আস্তে আস্তে হতাশায় ডুবে যেতে থাকি। একদিন এক বালিকার গল্প শুনতে পায় সে। বলা হয়, ১২ বছর বয়সী একটি বালিকাকে বিয়ে দেয়া হয়েছে ২৬ বছরের এক যুবকের সঙ্গে। তাদের শারীরিক সম্পর্কও হয়েছে। এ খবর প্রকাশ হওয়ার পর ওই বালিকার স্বামীকে এবং যে ব্যক্তি বিয়ে পড়িয়েছেন তাকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দারা। তাদের বিরুদ্ধে শিশু নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ঘটনা ঘটেছে হান্টার ভ্যালিতে। অস্ট্রেলিয়ার আইন অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সের আগে কোন নারী বা পুরুষের বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া নিষিদ্ধ। এ খবর শোনার পর তৃষা সিদ্ধান্ত নেয়, তাকে কারও সহায়তা নিতে হবে। তৃষা বলে, বাসায় সময় কাটানোর বাইরে মাঝে মধ্যে আমি পড়াশোনা করতাম। কখনও হাঁটতে বেরুতাম। এক পর্যায়ে আমার ওই আংকেল তার ৩৬ বছর বয়সী ছেলের কাছে আমার হয়ে ই-মেইল পাঠানো শুরু করেন। তৃষার ভয় হয়, তিনি হয়তো তৃষার হয়ে তার ওই ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্কের সেতুবন্ধন গড়ার চেষ্টা করছেন। তিনি তাদেরকে দম্পতি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছেন। ১২ মাসেরও বেশি সময় তিনি তৃষাকে চাপ দিতে থাকেন তার ওই আংকেলের ছেলেকে বিয়ে করতে। একই সঙ্গে রেজিস্ট্রেশন পেপারে সই করতে বলেন। একবার তিনি রক্তচক্ষু করে ধমকে বললেন, তোমাকে আমার অনুগত হতে হবে। আমি তোমাকে এখানে এনেছি। তোমাকে পড়াশোনার সুযোগ করে দিয়েছি। দিয়েছি নতুন জীবন। তাই তোমাকে বিয়ে করতেই হবে।
ওদিকে বাংলাদেশে অবস্থানরত তার পিতা-মাতা অনুরোধ করতে থাকেন সন্তানদের দেশে ফেরত পাঠাতে। কিন্তু তৃষার ওই আংকেল তাদের কাছে দাবি করে বসেন ১০ হাজার ডলার। এত টাকা দেয়ার মতো সামর্থ্য ছিল না তৃষার পিতা-মাতার। তারা সন্তানদের সঙ্গে কথাও বলতে পারেন না। এক পর্যায়ে অনেক দিন ধরে জমা করা অর্থে তৃষা মোবাইল ফোনের একটি সিম কার্ড কিনে নেয়। তা দিয়ে দেশে পিতা-মাতার সঙ্গে যোগাযোগ করে। তৃষা বলেছে, আমার আংকেল তার যে ছেলেকে বিয়ে করার জন্য চাপ দিচ্ছেন আমি তাকে দেখি ভাই হিসেবে। আমি তো আমার ভাইকে বিয়ে করতে পারি না। আমি বিয়ের জন্য প্রস্তুতও নই। আমি পড়াশোনা করতে চাই। জীবন আমার। সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা আছে আমার। এক পর্যায়ে আংকেল বলে, এখন বিয়ে করে ফেলো। আমার ছেলে অস্ট্রেলিয়া আসার সঙ্গে সঙ্গে তুমি তাকে তালাক দিও। এমন সময় একদিন তার আংকেল বাসার ভিতরে বৌদ্ধ সমপ্রদায়ের কয়েকজনের সঙ্গে আড্ডা জমান। সেখানে যোগ দেন নাতালি, পঙ্কজ ও মেরি নামের তিনজন। তারা তৃষার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারেন কিছু একটা অঘটন ঘটে গেছে। নাতালি বলেন, আমার মনে হয়েছে মেয়েটাকে আটকে রাখা হয়েছে। সে একা। এ নিয়ে সিডনিতে অবস্থানরত বাংলাদেশী বৌদ্ধ সমপ্রদায়ের সঙ্গে তৃষার ওই আংকেলের বেশ কথা কাটাকাটি হয়। কিন্তু তাতে কাজ হয় নি। তিনি একরোখা।
অবশেষে ২০১২ সালের অক্টোবরে তৃষা তার ব্যাগ গুছিয়ে নেয়। নাতালি ও পঙ্কজের সঙ্গে বেরিয়ে যায় আংকেলের বাসা থেকে। সেখান থেকে পরে নিউ টাউনে এক বাসা ভাড়া নেয়। সঙ্গে তার ছোট ভাই। নাতালি বলেছেন, তৃষাকে এভাবে ‘অপহরণ’ করা জরুরি ছিল। তার আংকেল যেহেতু বিয়ে সম্পন্ন করাতে পারেন নি তাই তার বিরুদ্ধে অভিযোগও গঠন করা যাচ্ছে না। গত সপ্তাহে নিউ টাউনের বাসায় বসেছিল তৃষা। মুক্ত জীবনের আনন্দ বলতে গিয়ে সে কেঁদে ফেলেছে। এখন প্রতিদিন পরিচ্ছন্নকর্মীর কাজ করে সে। তা থেকে যে আয় হয় তা দিয়ে বাসা ভাড়া দেয়। ছোট ভাইয়ের দেখাশোনা করে। আর রাতের বেলা পড়াশোনা করে। এই পড়াশোনার মাধ্যমেই সে জীবনে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার স্বপ্ন দেখছে।