pilkhana_72364২৫ ফেব্রুয়ারি: আজ ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানা হত্যা দিবস। ২০০৯ সালের এই দিনে তদানীন্তন বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) বাহিনীর বিপথগামী কিছু সদস্য তাদের কিছু দাবি-দাওয়া আদায়ের জন্য বিদ্রোহ করে। এ সময় তারা ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করে। পিলখানায় সেদিন বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যরা যে তাণ্ডব চালিয়েছিল, তা পৃথিবীর কোনো বাহিনীর বিদ্রোহের ইতিহাসে পাওয়া যায় না। তাদের হাত থেকে বিডিআর মহাপরিচালকের বাসার কাজের মেয়ে, রিকশা চালক, সব্জি বিক্রেতা ও ছাত্রসহ সাধারণ মানুষও সেদিন রেহাই পাননি।
বিডিআরের সিপাহি সেলিম রেজা, কাজল আলী, বাছেদ, শামীম আল মামুন, জুয়েল ও ল্যান্স নায়েক ইকরামসহ ঘাতকদের হিংস্র তাণ্ডবে সেদিন ৫৭ সেনা পরিবারসহ শতাধিক পরিবার সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় হাজার হাজার সাধারণ বিডিআর সদস্যের পরিবার। নির্মম এ হত্যাকাণ্ডের বিচার, সংশ্লিষ্টদের সাহায্য-সহযোগিতা ও ঘুরে দাঁড়ানোর নানা চেষ্টার পরও স্বজনহারাদের কান্না থামেনি আজও। তবে কলংকিত সেই ইতিহাস ও ক্ষত ভুলে ঘুরে দাঁড়ানোর নিরন্তর প্রচেষ্টা আজ সবার মাঝেই বিদ্যমান। তবে বিদ্রোহ ও হত্যাযজ্ঞ মামলার বিচার প্রক্রিয়া শেষ হলেও একই ঘটনায় দায়ের হওয়া বিস্ফোরক আইনের মামলাটি এখনও নিু আদালতে বিচারধীন রয়েছে। নারকীয় এ হত্যাযজ্ঞের পাঁচ বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ। এ উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বিজিবি ও বিভিন্ন সংগঠন।
‘কলংক অনেকটা দূর হয়েছে’: বিডিআর বিদ্রোহ ও পিলখানা হত্যাযজ্ঞের মতো কলংকজনক কালো অধ্যায়কে পেছনে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ বলেছেন, বিদ্রোহের নামে নির্মম হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী এ বাহিনীর ওপর ২০০৯ সালে যে কলংক লেপন করা হয়েছিল কয়েকটি পদক্ষেপের কারণে সেটা অনেকটাই দূর হয়েছে। ঘটনার পর গত পাঁচ বছরের মধ্যে অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা ও সাজা দেয়া এবং বাহিনীর জন্য নতুন কঠোর আইন প্রণয়ন সবচেয়ে বড় অগ্রগতি। মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ বলেন, একটি বাহিনীর জন্য প্রয়োজন কঠোর আইন, যা আগে ছিল না। ১৯৯১ সালেও বিডিআরে বিদ্রোহ হয়েছিল। তখন যদি কঠোর আইন প্রণয়ন করা হতো, তাহলে ২০০৯ সালে এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটত না। তাছাড়া আদালতের মাধ্যমে যে বিচার হয়েছে, সেটা পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া শেষে দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে নিহত ও তাদের স্বজন এবং সহকর্মীরা শান্তি ও স্বস্তি পাবে। অতীতের মতো সরকারের সার্বিক সহযোগিতা নিয়ে বাহিনীকে আরও উদ্যোমী ও গতিশীল করে জাতির অর্পিত দায়িত্ব পালনে কাজ করার অঙ্গীকার করেন তিনি।
বিচার প্রক্রিয়া : এ নির্মম ও নৃশংস হত্যাযজ্ঞের পর প্রথমে কোতোয়ালি থানায় ও পরে নিউমার্কেট থানায় সদর ব্যাটালিয়নের ডিএডি তৌহিদুল আলমসহ ছয়জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে মামলা দায়ের করে পুলিশ। বাহিনীর নিজস্ব আইনেও পিলখানাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ৫৭টি বিদ্রোহ মামলা হয়। এসব মামলায় ছয় হাজারেরও বেশি বিডিআর সদস্যকে আসামি করা হয়। ২০১২ সালের ২০ অক্টোবর সদর রাইফেল ব্যাটালিয়নের ৭২৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়ার মধ্য দিয়ে ৫৭টি বিদ্রোহের মামলার নিষ্পত্তি সম্পন্ন করা হয়। রাজধানীর বখশিবাজারে মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিশেষ এজলাশে ২০১১ সালের ৫ জানুয়ারি শুরু হয় পিলখানা হত্যাযজ্ঞ মামলার বিচার কার্যক্রম। দীর্ঘ প্রায় দুই বছর এ কার্যক্রম শেষে গত বছরের ৫ নভেম্বর এ মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ে ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬১ জনকে যাবজ্জীবন ও বিভিন্ন মেয়াদে ২৬২ জনকে সাজা দেয়া হয়। বেকসুর খালাস দেয়া হয় ২৭১ জনকে। বিচার প্রক্রিয়া চলার সময় চারজন মারা যান। সর্বশেষ ২৩ ফেব্র“য়ারি কাশিমপুর কারাগারে বন্দি অবস্থায় মারা যান এ মামলার অন্যতম মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ডিএডি মির্জা হাবিবুর রহমান। হত্যাযজ্ঞ মামলাটি বর্তমানে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। বিস্ফোরক আইনের মামলাটি এখন নিু আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। এ মাসের শুরুর দিকে এ মামলার বিচারক ড. মোঃ আখতারুজ্জামান মামলা চালাতে বিব্রত বোধ করে মামলাটি মহানগর দায়রা জজের কাছে পাঠিয়ে দেন। এ মামলার আসামি রয়েছেন ৭৮৭ জন। আগামী ৩ মার্চ এ মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য পরবর্তী দিন ধার্য রয়েছে। এ মামলা চালানোর প্রক্রিয়া নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন আসামি পক্ষের আইনজীবী আমিনুল ইসলাম ও শামীম সরদার। তারা বলেন, হত্যা মামলাটিতেও তারা ন্যায়বিচার পাননি। এরই মধ্যে তারা উচ্চ আদালতে আপিল করেছেন। অন্যদিকে বিস্ফোরক আইনের মামলাটি নিয়েও চলছে টানাহেঁচড়া। ৫৭টি বিদ্রোহ মামলায় বিডিআরের নিজস্ব আইনে গঠিত বিশেষ আদালতে পাঁচ হাজার ৯২৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়। হত্যা মামলার সাড়ে আটশ’ আসামিও এসব বিদ্রোহ মামলার আসামি হিসেবে বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন। পিলখানা হত্যা মামলায় বিএনপি নেতা নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টু ও আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক বিডিআর সদস্য তোরাব আলীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। এ মামলার ২০ আসামি ঘটনার পর থেকে পলাতক রয়েছেন।
আদালতের পর্যবেক্ষণ : মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিশেষ এজলাসে গত ৫ নভেম্বর দেয়া রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক ড. মোঃ আখতারুজ্জামান বলেন, একটি মর্মান্তিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই এ মামলা হয়েছে। সুরতহাল রিপোর্ট পড়ে আমার নিজেরই গা শিউরে উঠেছে। হত্যার পর তারা লাশ ক্ষত-বিক্ষত করেছে। সামরিক বাহিনীর মনোবল ভেঙ্গে দিতে এ হত্যাকাণ্ড হতে পারে। বহির্বিশ্বে এ জাতিকে উচ্ছৃংখল জাতি হিসেবে চিহ্নিত করে দেশের সুনাম ক্ষুণ্ন, বিনিয়োগে বাধাগ্রস্তসহ রাজনৈতিক ও সামাজিক মোটিভ কাজ করেছে বলেও তিনি পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন। বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া প্রসঙ্গে বিচারক বলেন, এর জন্য সরকারি নিয়মানুযায়ী সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন দফতরে যেতে হয়। কোনো রাজনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে নয়। বিডিআরের দেয়া লিফলেটের কিছু দাবি যৌক্তিক হলেও বেশিরভাগ দাবিই অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন। কারণ যার যার যোগ্যতা অনুযায়ী সে সেই সুবিধা পাবে। ‘অপারেশন ডাল-ভাত’ কর্মসূচি এ বিদ্রোহের অন্যতম একটি বড় কারণ বলেও উল্লেখ করেন তিনি। বিচারক আরও বলেন, কোনো শৃংখলাবদ্ধ বাহিনী যেমন সেনা বাহিনী বা আধা-সামরিক বাহিনী বা সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে এরকম কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করা উচিত নয়। এতে তাদের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। গোয়েন্দা ব্যর্থতাকেও দায়ী করেন বিচারক। সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মতো বিডিআর সদস্যদের জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে পাঠানো যায় কিনা তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভেবে দেখতেও পরামর্শ দেন। এছাড়া সেনা সদস্যদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ রেখে বিডিআর সদস্যরা দেশের নিরাপত্তা রক্ষার কাজে নিয়োজিত আছেন। এ জন্য প্রতিরক্ষা বাহিনীর মতো ২০ শতাংশ ভাতা ও ঝুঁকি ভাতা দেয়া যায় কিনা সেটাও ভেবে দেখা উচিত বলে মনে করেন বিচারক আখতারুজ্জামান।
বিদ্রোহের সময় দু’দিনের চিত্র : চার্জশিট থেকে জানা যায়, ঘটনার সময় পুরো পিলখানায় বিডিআরের সদস্য ছিলেন ছয় হাজার ৯০৩ জন। দরবার হলে ৯৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ বিডিআরের দুই হাজার ৪৮৩ জন সদস্য উপস্থিত ছিলেন। এ ঘটনায় দুই হাজার ৪১৪টি আগ্নেয়াস্ত্র থেকে গুলি করা হয়েছিল। এর মধ্যে এক হাজার ৮৪৫টি রাইফেল, ৫২৮টি সাব মেশিন গান, ২৩টি পিস্তল ও ১৮টি এলএমজি ছিল।
পিলখানায় বিজিবির কর্মসূচি : বেদনাবিধুর এ দিবসটি পালনের লক্ষ্যে পিলখানায় নিহতদের জন্য দোয়া, মিলাদ মাহফিল, কবরে ফুল দেয়ার মতো কিছু কর্মসূচি নেয়া হয়েছে বিজিবির পক্ষ থেকে। বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠনও নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মুহম্মদ মোহসিন রেজা জানান, পিলখানায় সংঘটিত বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডে শহীদ ব্যক্তিবর্গের স্মরণে আজ মঙ্গলবার শাহাদাত বার্ষিকী পালিত হবে। দিনের কর্মসূচি অনুুযায়ী শহীদ ব্যক্তিবর্গের রুহের মাগফিরাতের উদ্দেশে পিলখানাসহ বিজিবির সব রিজিয়ন, সেক্টর, প্রতিষ্ঠান ও ইউনিটের ব্যবস্থাপনায় বাদ ফজর খতমে কোরআন এবং বিজিবির সব মসজিদে এবং বিওপি পর্যায়ে শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ সেনা বাহিনীর ব্যবস্থাপনায় সকাল ৯টায় বনানী সামরিক কবরস্থানে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, তিন বাহিনীর প্রধান (সম্মিলিতভাবে), স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এবং বিজিবি মহাপরিচালক (একত্রে) শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। পরদিন ২৬ ফেব্র“য়ারি বুধবার বিকাল সাড়ে ৪টায় পিলখানার বীর-উত্তম ফজলুর রহমান খন্দকার মিলনায়তনে শহীদ ব্যক্তিদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। এ দোয়া ও মিলাদ মাহফিলে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, বিজিবি মহাপরিচালক, শহীদ ব্যক্তিবর্গের নিকটাত্মীয়, পিলখানায় কর্মরত সব অফিসার, জেসিও, অন্যান্য পদবির সৈনিক এবং বেসামরিক কর্মচারীরা অংশগ্রহণ করবেন।