1
ভোটের অঙ্কে আওয়ামী লীগ জিতলেও হেরেছে গণতন্ত্র

উপজেলা ভোট শেষ। এখন হিসাব মেলানোর পালা। আওয়ামী লীগ বলছে সংখ্যার দিক থেকে আমরা এগিয়ে। আর বিরোধী বিএনপি বলছে সংখ্যা বড় নয়। ভোটেই প্রমাণিত হলো আওয়ামী লীগের অধীনে স্বচ্ছ ভোট সম্ভব নয়। দুনিয়াকে এখন বোঝানো সম্ভব হবে আওয়ামী লীগের কাছে ভোট কতটা অনিরাপদ। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে ভোট নাটকের প্রথম অঙ্ক সম্পন্ন হয়েছিল। উপজেলা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এর চূড়ান্ত সমাপ্তি ঘটেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দিন হয়তো বলবেন এই কাজটা আমি করিনি। আমার সহকর্মী আবদুল মোবারক সেরে ফেলেছেন। কাদার মধ্যে একজন মোবারক হারিয়ে গেলে কি হবে। ভোটের যে সর্বনাশ হয়ে গেল। একদিন শেখ হাসিনা ভাত ও ভোটের রাজনীতির জন্য লড়াই করেছিলেন। সফলও হয়েছিলেন। মাগুরার বিতর্কিত নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশবাসীকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন বিএনপির অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। এসেছিল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার। দুর্ভাগ্য হলো, শেখ হাসিনার হাত ধরেই আবার ফিরে গেল আগের অবস্থানে। এতে কার লাভ, কার ক্ষতি এ নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। তবে মোটা দাগে বলতে গেলে এক বাক্যে বলতে হবে সংখ্যার দিক থেকে, ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার দিক থেকে আওয়ামী লীগ জয়ী হলেও আখেরে হেরেছে গণতন্ত্র। এখান থেকে বাংলাদেশকে ফিরিয়ে আনা খুবই কঠিন হবে। ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেল। তাই বলে কি আমরা অন্য প্রক্রিয়াকে সমর্থব দেবো, স্বাগত জানাবো? গণতন্ত্রে ভোটের কোন বিকল্প নেই। শুরুটা ছিল চমৎকার। প্রথম দফা নির্বাচন দেখে মনে হয়েছিল আওয়ামী লীগ তার বিতর্কিত ইমেজ বোধকরি ফিরিয়ে আনতে চাইছে। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি না গিয়ে ভুল করেছে এটা প্রমাণ করার চেষ্টা করবে। দ্বিতীয় দফায় কিছুটা কলঙ্কিত হলো অনিয়ম আর গায়েবি ভোটে। তৃতীয় থেকে পঞ্চম দফা নির্বাচনে একদম বিপরীত চিত্র। কে কি বললো, তা যায় আসে না। উপজেলায় নিয়ন্ত্রণ চাই। নিয়ন্ত্রণ তারা পেলেন বটে, তবে ভোটের প্রতি মানুষের আস্থা আর আগ্রহ থাকলো না। শাসক দল যদি সেটাই চেয়ে থাকে তাহলে বলতে হবে তারা শতভাগ সফল। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিব উদ্দীন হঠাৎ করে যখন দীর্ঘ ছুটিতে চলে যান তখনই বোঝা গিয়েছিল কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। আবদুল মোবারক যখন দায়িত্ব পেলেন তখন কারও বুঝতে বাকি থাকেনি। মোবারক বরাবরই সোজা-সাপটা নীতিতে বিশ্বাস করেন। তার কাছে রাখঢাক বলতে কিছু নেই। রাজনীতির বাইরে কিছুই চিন্তা করতে পারেন না। কাজী রকিব ছিলেন এখানে কিছুটা অন্তরায়। তাই তাকে ছুটিতে পাঠিয়ে দেয়া হলো। রকিবও তাই চেয়েছিলেন। কারণ ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে তিনি এতটাই কাদার মধ্যে ডুবে গিয়েছিলেন তা থেকে উঠে বিমানে চড়া তার জন্য কষ্টদায়ক ছিল। যাওয়ার সময় বন্ধু-বান্ধবদের বলে যান, আপাতত গুড বাই। কিছুদিন বাইরে কাটাই।
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নির্বাচন থেকে সরে গিয়ে যে অবস্থার মধ্যে পড়েছিলেন তা দেখে রকিব সাহেব পদত্যাগপত্র ফাইলে রেখে দিয়ে বন্ধু-বান্ধবদের বলেছিলেন, এত বড় ঝুঁকি নেয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু ভেতরে এক ধরনের অন্তর্জ্বালা কাজ করছিল। এ থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছিলেন। মোবারকের কূট বুদ্ধির কাছে হেরে গিয়ে এক সকালে যুক্তরাষ্ট্রগামী বিমানে চড়েন।
এখন প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগ উপজেলা নির্বাচন থেকে কি অর্জন করলো? তারা বলবেন, আমরা বেশি উপজেলায় জিতেছি। আসলে কি তারা জিতেছেন? কিভাবে জিতেছেন মিডিয়া লিখুক আর না লিখুক দেশের জনগণ তো স্বচক্ষে দেখলো। ভোট ছাড়াই যখন এমপি হওয়া সম্ভব তখন উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচনে এত স্বচ্ছ ভোটের প্রয়োজন কি? লোকদেখানো একটা আয়োজন হলেই তো চলে। তাই ভোটকেন্দ্র দখল করার প্রতিযোগিতা হয়েছে। রাতে ভোটের বাক্স বোঝাই হতো সেনা শাসনকালে। এবার তাই দেখা গেল। ভোট দেয়ার জন্য মানুষের যে আকুতি তাকে হালকা করে দেখার কোন সুযোগ নেই। মনে করার কারণ  নেই সবই শান্ত হয়ে গেছে। ইতিহাস বলে শান্ত বাংলাদেশ আচমকা অশান্ত হয়ে পড়ে। খোলাসা করে বলার কিছু নেই। সেনা শাসনকেও স্বীকৃতি দেয় আন্তর্জাতিক দুনিয়া। ৪০টি দেশের অভিনন্দন আনার পেছনে কত যে মেহনত করতে হয়েছে তা আমাদের সেগুনবাগিচার কূটনীতিকরা ভাল করেই জানেন। ‘বন্ধু রাষ্ট্র’গুলোও সরব ছিল দেশে দেশে স্বীকৃতি আনার কাফেলায়। এখনও সে তৎপরতা জারি রয়েছে। অবাক হবেন না জাতিসংঘ মহাসচিবকেও ঢাকায় দেখে। তাতে কি যায় আসে। ৫ই জানুয়ারির ভোটবিহীন নির্বাচনের কলঙ্ক থেকে কি বাংলাদেশ মুক্তি পেয়ে যাবে? কোন মতেই না। সুযোগ এসেছিল শেখ হাসিনার সামনে। তার পরামর্শদাতারা ভুল পরামর্শই দিয়েছিলেন বলে মনে হয়। উপজেলা নির্বাচন যদি অবাধ ও নিরপেক্ষ হতো তাতে যদি আওয়ামী লীগ শোচনীয়ভাবে হেরেও যেতো তাতে আওয়ামী লীগের কোন ক্ষতি ছিল না। বরং লাভের পাল্লা ভারি হতো। এটা তো ক্ষমতা পরিবর্তনের নির্বাচন নয়। সাতটি সিটিতে হেরে যাওয়ার পরও আওয়ামী লীগ দাপটের সঙ্গেই শাসন করেছে। বিএনপির কাছে একটি অস্ত্র তুলে দেয়া হলো। বিএনপি এখন দেশে-বিদেশে বলতে শুরু করেছে উপজেলা নির্বাচন দেখে কি মনে হয় না তাদের ভোট বর্জনের সিদ্ধান্ত কতটা সঠিক ছিল। শুনেছি শেখ হাসিনাকে নাকি বোঝানো হয়েছে উপজেলায় হেরে গেলে বিএনপি বলবে জনগণ এই সরকারকে চায় না। সে কারণে যেভাবেই হোক উপজেলা কব্জা করতে হবে। উপজেলা কব্জা করতে গিয়ে ভোট যে বন্দি হয়ে গেল নতুন এক বাক্সে- সেখান থেকে উদ্ধার করা কতটা যে কঠিন হবে তা কি আওয়ামী লীগ বুঝতে পারছে না?
ইতিহাস বলে, এ ধরনের আয়োজন থেকে অন্যরা সুবিধা ভোগ করে। ক্ষমতার মোহে শাসক দলটি এখন অন্ধ। এখন তাদের কাছে বিকল্প চিন্তা করার সুযোগ নেই। তাদেরকে স্মরণ করিয়েও কোন লাভ নেই। মিডিয়ার সমালোচনা এখন তাদের কাছে বিরক্তি ছাড়া আর কিছু নয়। বরং মিডিয়া ঠা-া হয়ে গেলে ক্ষতি নেই। সব দরজা-জানালা বন্ধ করে কাচের ঘরে বসে রাষ্ট্র যে চালানো যায় না দেশে দেশে আমরা তাই দেখছি। বাংলাদেশেও আমাদের অভিজ্ঞতা আছে। ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে এই কলামটির যবনিকাপাত টানতে চাই। মিসেস গান্ধী জরুরি অবস্থা জারির পর নিজের নির্বাচনী এলাকায়ও হেরে গেলেন। দেশজুড়ে তো হারলেনই। চারদিক থেকে তার কাছে খারাপ খবরই আসছিল। একদিন দুপুরে স্টাডি রুমে বসে কাজ করছিলেন। কিন্তু তার প্রিয় বিড়ালটা বড্ড যন্ত্রণা করছিল। এক পর্যায়ে তিনি বিড়ালটাকে মারতে গেলেন। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে বিড়ালটা তাকে আক্রমণ করতে তেড়ে এলো। মিসেস গান্ধী অবাক হচ্ছিলেন। এ কি হলো, এতদিন যাকে দুধকলা খাইয়ে বড় করলাম সে তো আমার অবাধ্য হয়ে গেল। বিকেলে তার একজন ঘনিষ্ঠ সহকর্মীর কাছে পুরো ঘটনাটি বললেন। সহকর্মী শুনে বললেন, ম্যাডাম আপনি যখন বিড়ালটাকে মারতে চেয়েছিলেন তখন কি দরজা-জানালা বন্ধ ছিল? হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন। সব বন্ধ ছিল। তাহলে ম্যাডাম এরকম হবেই। বিড়ালটা হয়তো এতটা অবাধ্য হতো না যদি দরজা-জানালা বন্ধ না থাকতো। সে আপনার ধমক শুনে পালিয়ে যেতো। সব বন্ধ থাকায় তার সামনে প্রতিবাদী হওয়া ছাড়া আর বিকল্প কি?