গরমে জনজীবন অতিষ্ঠ;বিশুদ্ধ পানির সংকট

0
30

2দৈনিক বার্তা:  বৈশাখের তীব্র তাপদাহে সারা  দেশ শুকিয়ে কাঠ হয়ে  গেছে। বৃষ্টি না হওয়া এবং মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার কারণে হাহাকার পড়ে  গেছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। এ অবস্থায়  ভোগান্তি আরো বাড়িয়ে তুলতেই  যেন গরমের সঙ্গে রীতিমতো পাল্লা দিয়ে শুরু হয়েছে বিদ্যুৎ বিভ্রাটও। প্রচণ্ড গরম আরো অন্তত দু’দিন চলবে বলে আভাস দিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ। এই সময়ের মধ্যে বষ্টির  কোনো সম্ভাবনা  নেই। গত কিছুদিন ধরে প্রায় সারা  দেশজুড়ে বয়ে যাচ্ছে মৃদু  থেকে তীব্র দাবদাহ, যাতে জনজীবনে দুর্ভোগ  নেমে এসেছে।

বাংলা নতুন বছরের প্রথম মাস  বৈশাখ শুরু হয়েছে গত ১৪ এপ্রিল,  বৈশাখের তীব্র গরম এবার ঠিকমতই  দেখা দিলেও এখনো পর্যন্ত  দেখা মেলেনি বৃষ্টির। আবহাওয়া অধিদফতর সূত্রে জানা  গেছে, আগামী তিন-চার দিনেও বৃষ্টির  দেখা পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম, এমনকি তাপমাত্রা আরো  বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাই ে বশি।আবহাওয়াবিদ আব্দুর রহমান জানিয়েছেন, গত কয়েকদিন ধরে বৃষ্টি না হওয়ার কারণেই তাপমাত্রা  বেড়ে  গেলেও এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

অবশ্য, গত মাসে  দেশে যতটুকুও বৃষ্টি হয়েছে তাও গড় বৃষ্টিপাতের প্রায় ৬৬ শতাংশ কম ছিল।  যেখানে রাজধানীতে এপ্রিলের গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১৪৭ মিলিমিটার হওয়ার কথা,  সেখানে গত ১৮ দিনে ঢাকায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৬১ মিলিমিটারের কাছাকাছি। পঞ্চাশোর্ধ আলমগীর মিয়ার মুখ রক্তলাল হয়ে আছে। দরদর করে ঘাম ঝড়ছে কপাল  বেয়ে। গায়ের শার্ট  ঘেমে শরীরের সঙ্গে লেপ্টে আছে। হাতের শিরাগুলো  থেকেও  যেন বাষ্প বের হচ্ছে। মুখ হাঁ করে যেন দম নিতে চাইছেন বাদশা মিয়া।

দুপুরে সূর্য তখন মাথার উপর। বৈশাখের দাবদাহে পরিবেশ  যেমন উত্তপ্ত হয়ে আছে, তেমনি মাথার উপর যেন সরাসরি অগ্নি বৃষ্টি ছড়াচ্ছে। কপালে বাঁধা গামছা দিয়ে গলার ঘাম মুছেন তিনি।

ঢাকাতেই চার  মেয়ে আর স্ত্রীসহ জগন্নাথ  রোডে বাস করেন আলমগীর মিয়ার মিয়া। গরম নিয়ে কথা উঠাতেই বলেন, ‘উফ… আর পারি না…শরীর পুইড়া যায়।সকাল আটটা  থেকে রিকশা চালাচ্ছেন তিনি। দুপুর নাগাদ আয়  কেমন হয়েছে? জানতে চাইলে বলেন, গরমে মানুষ  বেরই হয় কম। যাত্রী নেই।  দেড়শো টাকার কিছু বেশি আয় হইছে।গরমে ভাড়া বাড়ান কিনা জানতে চাইলে বলেন, বৃষ্টিতে ভাড়া বেশি চাওয়া যায়, কিন্তু গরমে মানুষ দিতে চায় না।এদিকে রাস্তায় গরমের ব্যারোমিটারে তাপমাত্রা আরও বাড়ছে। বাড়ছে  রোদের তেজ।  সেই সঙ্গে চরাচর হয়ে উঠছে আরও অসহনীয়। শহরের রাস্তায় এই গরম অনুভূত হচ্ছে বাড়তি  তেজে।

গরম বাড়ার সাথে সাথে বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং খোলা বাসী খাবারের জন্য সারাদেশেই ডায়রিয়ার প্রকোপ বেড়েছে।  রোগীমের মধ্যে শিশুদের সংখ্যাই  বেশি।  রোগীর চাপ এতো  বেশি  যে জায়গা হচ্ছে না হাসপাতালে। সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার মতো সাধারণ স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাবও এর কারণ বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। রোগী আছে কম বেশি সব বয়সীরাই। তবে ডায়রিয়া বেশি ভোগাচ্ছে শিশুদের।

গরমে বাসী খাবার আর উপকূলীয় এই অঞ্চলে বিশুদ্ধ খাওয়ার পানির অভাবে ডায়রিয়া ছড়াচ্ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। সেই সঙ্গে খাওয়ার আগে সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত  ধোয়ার পরামর্শও দিয়েছেন তারা।ডায়রিয়া হলে ভয় না পেয়ে রোগীকে বারবার খাওয়ার স্যালাইন দেয়া এবং খাওয়ানোর আগে অবশ্যই সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।

যশোরের তাপমাত্রা  বৃহস্পতিবার ৪২ দশমিক ৬ ডিগ্রি  সেলসিয়াস। এটি এ বছরে  দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বলে রেকর্ড করেছে আবহাওয়া দপ্তর।যশোরের বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান বিমানঘাঁটির আবহাওয়া বিভাগ এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

এক সপ্তাহ ধরে যশোরের তাপমাত্রা ৪০  থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। তীব্র দাবদাহের কারণে যশোরে পানির স্তর স্বাভাবিকের  চেয়ে ছয় ফুট নিচে নেমে  গেছে। শহরের ৯৫ শতাংশ হস্তচালিত নলকূপে পানি পাওয়া যাচ্ছে না। খাওয়ার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

শহরের আড়াই লাখ মানুষের জন্যে  পৌরসভার রয়েছে মাত্র ১৪০টি গভীর নলকূপ। এগুলো দিয়ে শহরের মানুষের খাওয়ার পানির চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না। পৌরসভার পাইপলাইনের খাওয়ার অনুপযোগী পানির ওপর মানুষকে নির্ভর করতে হচ্ছে। এ পানি ফুটিয়ে চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করছে মানুষ।

যশোর  পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী (পানি) হাফিজুর রহমান বলেন, ২৭  থেকে ২৮ ফুট নিচে পানির স্তর থাকলে হস্তচালিত নলকূপে পানি পাওয়া যায়। কিন্তু এখন যশোরের পানির স্তর ৩৩ ফুট নিচে নেমে গেছে। এ কারণে শহরের ৯৫ ভাগ নলকূপে পানি নেই। পানির সংকট কাটাতে পৌরসভার পাইপলাইনের পানির সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে।

যেসব নলকূপে পানি রয়েছে, এলাকার মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে সেখান  থেকে পানি নিচ্ছে। প্রতিদিন সকালে ও বিকেলে পাড়ায় পাড়ায় নলকূপের পাশে দীর্ঘ লাইন পড়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে  থেকে শহরবাসীকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে আগামী ২৪ ঘণ্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আকাশ অ¯’ায়ীভাবে আংশিক মেঘলাসহ আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে।
রাজশাহী, পাবনা, ফরিদপুর ও চাঁদপুর অঞ্চলসহ খুলনা বিভাগের উপর দিয়ে তীব্র তাপপ্রবাহ এবং দেশের অন্যত্র মাঝারি থেকে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে।

আবহাওয়া দৃশ্যপটের সংক্ষিপ্তসারে বলা হয়, লঘুচাপের বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ এবং তৎসংলগ্ন এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত। স্বাভাবিক লঘুচাপ দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে।

পিডিবি’র এক কর্মকর্তা দাবি করেন- অধিক চাহিদা  মেটানোর জন্য টানা বিদ্যুৎ সরবরাহের ফলে স্থানীয়ভাবে বিদ্যুৎ বণ্টনের জন্য যন্ত্রপাতি অতিরিক্ত গরম হয়ে যায় বলে সেগুলোকে ঠাণ্ডা করতে কিছু সময় বন্ধ করে রাখতে হয়।

পিডিবি’র একজন পরিচালক বলেন, মাত্র এক মাস আগেও দিনের বেলায় অফ-পিক সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল সাড়ে চার হাজার  মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যার পর  থেকে অর্থাৎ পিক আওয়ারে এই চাহিদার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াতো সাত হাজার  মেগাওয়াট পর্যন্ত। পর্যাপ্ত পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহের মাধ্যমে আমরা এই পুরো চাহিদাই মিটিয়েছি।বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে দিনের বেলাতেই বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় সাড়ে ছয় হাজার মেগাওয়াট হয়ে  গেছে, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে চাহিদা বেড়েছে প্রায় দুই হাজার  মেগাওয়াট। সবাই তাদের ফ্যান আর এসি চালিয়ে রাখছে বলেই এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

2
file phot