প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের নিচে হবে :ড.দেবপ্রিয়

0
18

1দৈনিক বার্তা:  সিপিডি’র ফেলো ড.দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন,সরকার ছাড়া সকলে বলেছেন, প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের নিচে হবে। যদি এটা হয় তবে পরপর চতুর্থবারের মতো প্রবৃদ্ধির পতন হবে। প্রবৃদ্ধি আগামী ১০ বছরের মধ্যে ৬ শতাংশের নিচে  নেমে যাবে। ফলে ২০১০ সালের পর আমরা  যে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির দিকে যাচ্ছিলাম  সেখান  থেকে বিচ্যুত হবো।

তিনি বলেন, গত বছর প্রথমবারের মতো জিডিপির এক শতাংশ ব্যক্তিগত খাতে বিনিয়োগের পতন ঘটেছিলো। এটি অভূতপূর্ব ঘটনা। এবারো এক শতাংশ পতন ঘটতে পারে। বিনিয়োগের বন্ধ্যাত্ব উন্নয়নের প্রধান বাধা। বিনিয়োগ বন্ধ্যাত্বের সূচনা ২০১২-১৩ অর্থবছর  থেকে হয়েছে।

শনিবার ডিসিসিআইএ’র সম্মেলনকেন্দ্রে অর্থনৈতিক রিপোর্টার্স  ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত আগামী বাজেটের প্রতিশ্র“তি ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক আলোচনাসভায় তিনি এ অভিমত ব্যক্ত করেন।

অভ্যন্তরীণ সম্পদ ব্যবহারের ওপর জোর দিয়ে সিপিডি’র  ফেলো ড.দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাজেট ঘাটতির ৯০ শতাংশই পূরণ করা হচ্ছে ঋণ করা অর্থ  থেকে।  বৈদেশিক সহায্যের ব্যবহার নিচে  নেমে যাচ্ছে। ফলে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সঠিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, উন্নয়নের জন্য সরকারি- বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর যে সংস্কার করার দরকার ছিলো তা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে  যে রাজনৈতিক অস্থিরতা অব্যাহত আছে,  সে পরিস্থিতিতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।

আগামী জাতীয় বাজেটের আকার দুই লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা হলে বাস্তবসম্মত হবে বলে মনে করন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মির্জা আজিজুল ইসলাম।
তিনি বলেন, বাস্তবায়ন করার ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে সরকারের বাজেট ঘোষণা করা উচিত। আমার হিসাব মতে, দুই লাখ ৩৪ হাজার  কোটি টাকার বাজেট বাস্তবসম্মত হতে পারে। যদি দুই লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা হয় তবে তা কাগজি বাজেটে পরিণত হবে। যেটি আগের বছরের বাজেটেও হয়েছে।

এডিপির বিষয়ে মির্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, গত নয় মাসে এডিপির ২৮ হাজার ৪২৮ কোটি টাকার মতো বাস্তবায়ন হয়েছে।  সে হিসেবে আমি বলবো কোনো ভাবেই ৬৬ হাজার কোটি টাকা থেকে ৬৭ হাজার কোটি টাকার ওপরে এডিপি হওয়া উচিত না।

তিনি আরও বলেন, উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন বাজেটের  বেশিরভাগ অর্থ ব্যয় হচ্ছে জনপ্রশাসন খাতে। এটি কতোটা উৎপাদনমুখী  সেটি বিবেচনা করতে হবে। এছাড়া প্রতিরক্ষা খাতের ব্যয়ের দিকটিতে নজর দিতে হবে।

বিনিয়োগের বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই উপদেষ্টা বলেন, বর্তমান স্থিতিশীল রাজনৈতিক অবস্থা স্থায়ী হবে কি না এটি নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। এ স্থিতিশীলতা ঝড়ের আগের অবস্থা কি না সেটি বিবেচনা করতে হবে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হবে, বিনিয়োগকারীদের সেটি বোঝাতে না পারলে তারা বিনিয়োগে আসবেন না।

সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বাজেটে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, সুষম বণ্টন ও দারিদ্র্য বিমোচন- এ চারটি বিষয়ে নজর দিতে হবে। বিনিয়োগটা যাতে প্রকৃত খাতে হয়  সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

প্রত্যক্ষ করের ওপর  জোর  দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এডিপির যে আকারের কথা বলা হচ্ছে, এতো বড় এডিপি আমাদের দরকার  নেই। এডিপির প্রয়োজন মূলত  বেসিক প্রয়োজনের ক্ষেত্রে।

আর্থিক খাতের ব্যবস্থাপনার দিকে নজর  দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আর্থিক খাতের ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা থাকলে এটি হবে সংক্রামক ব্যধির মতো। এ সমস্যরর সমাধান না হলে উন্নয়ন হবে না। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর দুর্বলতা রয়েছে। তারা সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এ অবস্থারও উন্নয়ন ঘটাতে হবে।

অর্থনীতিবিদ বিনায়ক  সেন বলেন, মধ্য আয়ের  দেশে  পৌঁছালেই গুণগত পরিবর্তন হবে এমনটি ভাবা ঠিক না। আমাদের পার্শ্ববতী  দেশ ভারত মধ্য আয়ের  দেশে উপণীত হয়েছে।  দেশটিতে দারিদ্র্য, পুষ্টি, আয়  বৈষম্যসহ নানা সমস্যা রয়েছে। সুতরাং এমন মধ্য আয়ের  দেশে  পৌঁছাতে হবে যেখানে দারিদ্র্য নিরসন হবে, নারীদের পুষ্টি সমস্যার সমাধান হবে।

এজন্য তিনি অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিনিয়োগে স্থবিরতা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে সমস্যাগ্রস্থ অবকাঠামোর উন্নয়ন করতে হবে।

স্বপ্নের পদ্মাসেতু একদিন হবেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ খাতের উন্নয়নে নজর দিতে হবে। উপজেলা নির্বাচন হয়ে গেছে। এখন উপজেলা পরিষদকে শক্তিশালী করতে হবে।

অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমেদ বলেন,বাজেটের দুটি দিক। একটি অর্থ সংগ্রহের দিক। আর একটি অর্থ ব্যয়ের দিক।

বাজেটে শিক্ষাখাতে ব্যয় বাড়ানো, প্রবৃদ্ধির দিকে নজর  দেওয়া, ছোট-বড় সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের দিকে নজর দিয়ে সহায়তা  দেওয়া, খাদ্যখাতের মূল্যস্ফীতি কমানো, অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বিজিএমইএ’র সভাপতি আতিকুল ইসলাম ত্রুটিগত কারণে যে কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাবে  সেগুলো পুনঃস্থাপনের (রিলোকেট) জন্য আগামী জাতীয় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ  দেওয়ার দাবি জানান।

ডিসিসিআই’র সভাপতি  মোহাম্মদ শাহজাহান খান বলেন, বাজেটে কর এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে যাতে এটি বোঝা না হয়ে যায়।

বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী বলেন, ব্যাংকের দিকে তাকালেই বোঝা যায় ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো নেই। অনেক ব্যাংক সময় দেওয়ার পরও শেয়ারহোল্ডারদের জন্য লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারেনি।

পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়ে ডিএসই’র সাবেক সভাপতি রকিবুর রহমান বলেন,  যে  দেশের অর্থনীতি যতো শক্তিশালী, সে দেশের পুঁজিবাজার ততো শক্তিশালী। ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে শিল্প করলে চক্রবৃদ্ধি হারে সুদের হার দাঁড়ায় ১৮ শতাংশ।  সেখানে পুঁজিবাজার  থেকে টাকা তুললে কস্ট অব ফান্ড অনেক কম।

ইআরএফ’র সদস্য ফরিদ হোসেনর সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন, এফবিসিসিআই’র সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ, ইআরএফ’র সভাপতি সুলতান মাহমুদ, সাধারণ সম্পাদক সাজেদুর রহমানসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধি ও ইআরএফ’র সদস্যরা।