সর্বত্র বাংলা ভাষা প্রচলনে সরকারের আগ্রহ নেই:হাইকোর্ট

0
24

2দৈনিক বার্তা : সর্বত্র বাংলা ভাষা প্রচলনের নির্দেশ বাস্তবায়নের বিষয়ে ১৫ মের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বিবাদীদের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। মঙ্গলবার বিচারপতি কাজী  রেজাউল হক ও বিচারপতি এ বি এম আলতাফ  হোসেন সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট  বেঞ্চ এ আদেশ  দেন।

আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন বিষয়ে বিবাদীদের দাখিল করা প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে আদালত বলেন,আদেশের সম্মতি পূরণ দেখে মনে হয়, প্রতিপক্ষ একে অপরকে চিঠি  প্রেরণ ছাড়া বাংলা ভাষা প্রচলন বিষয়ে কার্যকর  কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করে নাই…।আদালত বলেন, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বাংলা ভাষা প্রচলনের বিষয়ে কোনো আগ্রহ নেই।এ অবস্থায় আদালত গত ১৭  ফেব্র“য়ারি  দেওয়া রুলের আদেশ পালনে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ  দেন। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার ও জনপ্রশাসন সচিবকে পক্ষভুক্ত করার আদেশ  দেন।

আদালত বলেছে, প্রতিবেদন দুটি দেখে মনে হচ্ছে,তারা চিঠি চালাচালি ছাড়া আর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, বাংলা ভাষা প্রচলনে  দেয়া আদেশ বাস্তবায়নে তাদের  কোনো আগ্রহ নেই। আদেশ বাস্তবায়ন না করলে আমরা প্রয়োজনে সব সচিবকে ডেকে এনে দাঁড় করিয়ে রাখবো।এর আগে গত ১৭  ফেব্র“য়ারি হাই  কোর্টের এই  বেঞ্চ এক আদেশে  দেশের সব সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার,গাড়ির নম্বর প্লেট, সব সরকারি দপ্তরের নামফলক এবং ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়াতে ইংরেজি বিজ্ঞাপন ও মিশ্র ভাষার ব্যবহার বন্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়।

দূতাবাস, বিদেশি সংস্থা ও তৎসংশ্লিষ্ট  ক্ষেত্রকে এই আদেশের আওতার বাইরে রাখা হয়। ১ মাসের মধ্যে এই আদেশ বাস্তবায়ন করে আদালতকে অবহিত করতে বিবাদীদের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।

মঙ্গলবার  দেয়া ব্যাখ্যায় আদালত জানিয়েছে, ইংরেজি পত্রিকা ইংরেজি বিজ্ঞাপন ছাপাতে পারবে। পাশাপাশি বিবাদীর তালিকায় দুই সচিবের নাম যোগ করা হয়েছে, যারা হচ্ছেন জনপ্রশাসন সচিব ও স্থানীয় সরকার সচিব।এক মাসের ওই সময়সীমার মধ্যে আদেশ বাস্তবায়ন না করায় রিটকারী আইনজীবী গত ৬ এপ্রিল বিবাদী ছয় সচিবের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ করেন। এরপর মঙ্গলবার বিষয়টি পরবর্তী শুনানির জন্য আসে।

শুনানির পর  ডেপুটি অ্যাটর্নি  জেনারেল বিশ্বজিৎ রায় সাংবাদিকদের বলেন, আজ আমরা তথ্য সচিব ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবের  দেয়া দুটি প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেছি। আদালত প্রতিবেদন দেখে সন্তুষ্ট হতে পারেননি।

আদালত বলেছে,প্রতিবেদন দুটি দেখে মনে হচ্ছে, তারা চিঠি চালাচালি ছাড়া আর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।পরিস্থিতি  দেখে মনে হচ্ছে, বাংলা ভাষা প্রচলনে দেয়া আদেশ বাস্তবায়নে তাদের কোনো আগ্রহ  নেই। আদেশ বাস্তবায়ন না করলে আমরা প্রয়োজনে সব সচিবকে ডেকে এনে দাঁড় করিয়ে রাখবো।

ইতোপূর্বে দেয়া নির্দেশনা বাস্তবায়ন করে আগামী ১৫  মের মধ্যে প্রতিবেদন দেয়ার নির্দেশনা এসেছে বলেও জানান তিনি।এক প্রশ্নের জবাবে বিশ্বজিৎ রায় বলেন, বাস্তবায়নের বিষয়টি একটু জটিল। এ কারণে অবমাননার রুল না দিয়ে আদালত সময় দিয়েছে। কারণ অনেক মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় করে বিষয়টি করতে হচ্ছে।আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট ড.ইউনুছ আলী আকন্দ।

১৭  ফেব্রয়িারি আদালত রুলও জারি করেন। রুলে অনতিবিলম্বে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, ১৯৮৭ (১৯৮৭ সালের ২নং আইন) বাস্তবায়নে সরকারেরর নিষ্ক্রিয়তা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না এবং ওই বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, ১৯৮৭ বাংলাদেশের সর্বত্র অনুসরণ করার জন্য কেন নির্দেশনা দেওয়া হবে না এবং ওই আইনের ৪ ধারা মতে প্রয়োজনীয় বিধি/সার্কুলার জারি/প্রকাশ করার প্রয়োজনীয় নির্দেশনা কেন দেওয়া হবে না তা জানতে চেয়েছেন হাইকোর্ট।

গত ১৬ফেব্র“য়ারি আদালতে রিট আবেদনটি দায়ের করেন মো. ইউনুছ আলী আকন্দ।আবেদনে বলা হয়, বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, ১৯৮৭ (১৯৮৭ সনের ২নং আইন) পাস হয়১৯৮৭ সালের ৮ মার্চ। কিন্তু দীর্ঘ ২৬ বছরেও আইনটি ঢালাওভাবে প্রচার হয়নি বা আইনটি সর্বত্র অনুসরণ করা হচ্ছে না।

আইনের ধারা ৩নং উপ-ধারা (৩) মতে উল্লেখ আছে যে, ‘৩(৩) যদি কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী এই আইন অমান্য করেন তাহা হইলে উক্ত কার্যের জন্য তিনি সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধির অধীনে অসদাচরণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে এবং তাহার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধি অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে।

সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী এ আইন ঢালাওভাবে অমান্য করে এলেও এ পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে সরকারি শৃঙ্খলা ও আপিল বিধি অনুসারে  কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। আইন বাস্তবায়নে সরকার নিষ্ক্রিয় এবং সরকার কোনো কোনো ক্ষেত্রে কোনো পদক্ষেপও নিচ্ছে না।

সরকারি কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের নাম, চিঠিপত্র আদান প্রদান, আইন আদালতের সওয়াল জবাব এবং অন্যান্য আইনানুগ কার্যাবলী বাংলায় লিখিত হচ্ছে না। সরকারি ব্যাংকসহ অন্যান্য ব্যাংকের কার্যক্রমও বাংলা ভাষায় করা হচ্ছে না।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে সরকার বাংলা ভাষার পরিবর্তে ইংরেজি শব্দ দিয়ে আইনও করে। উদাহরণ স্বরূপ বাংলাদেশ রাইফেলস’ যেটি বাংলা শব্দ এটাকে পরিবর্তন করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)’ নামে ইংরেজি শব্দ দিয়ে আইনও পাস করে। যা সংবিধানের ৩/৭/২৬ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। দৈনিক পত্রিকা, টেলিভিশনসহ অন্যান্য মিডিয়ার বিজ্ঞাপনেও বাংলার পরিবর্তে ইংরেজি ব্যবহার হয়।

অনেক প্রতিষ্ঠানের নাম বাংলার পরিবর্তে ইংরেজিতে লেখা দেখা যায়। টেলিভিশন মিডিয়ার নাম বাংলায়  নেই বললেই চলে। যেমন- ঈযধহহবষ-৯, ইঞঠ ডড়ৎষফ, অঞঘ ইধহষধ, অঞঘ ঘবংি, ইধহমষধ ারংরড়হ, ঈযধহহবষ-ও, ঈযধহহবষ-২৪, ঊঞঠ, জঞঠ, ঘঞঠ, এঞঠ, ইত্যাদি। তাদের লাইসেন্সও সরকার ওই নামেই দিয়েছে। তাদের প্রচার-প্রচারণা, বিজ্ঞাপন ইত্যাদি বাংলার পরিবর্তে ইংরেজিতে দেখা যায়।

সরকার লাখ লাখ গাড়ির নম্বর  প্লেট অনেক ক্ষেত্রে বাংলার পরিবর্তে ইংরেজিতে  দেয়। এছাড়া অন্যান্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, ১৯৮৭ অনুসরণ করা হচ্ছে না যা আইনের ৩(৩) ধারা অনুসারে অসদাচরণ করিয়াছে বলে গণ্য হবে এবং তার/তাদের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধি অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

আইনের ৪ ধারায় উল্লেখ আছে, সরকার সরকারি  গেজেট বিজ্ঞপ্তি দ্বারা এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে বিধি প্রণয়ন করিতে পারিবেন।কিন্তু এ বিষয়ে সরকার এতো নিষ্ক্রিয়  যে, আইনটি সর্বত্র প্রচার এবং বাস্তবায়নের জন্য এখন পর্যন্ত  কোনো বিধিমালা বা সার্কুলার জারি করে নাই।