2দৈনিক বার্তা :দুর্নীতির দুই মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের  বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের  করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঐ মামলার সকল বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত  চেয়েও আবেদন করা হয়েছে। সোমবার সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় আইনজীবী এডভোকেট আসাদুজ্জামান খালেদা জিয়ার পক্ষে ঐ রিটটি দায়ের করেন।

তিনি জানান, খালেদা জিয়ার দুই মামলায় অভিযোগ গঠনের আদেশ দানকারী বিশেষ জজ আদালতের বিচারক বাসুদেব রায়ের নিয়োগের কোনো গেজেট প্রকাশিত হয়নি।বিধি অনুযায়ী বিশেষ জজ আদালতের নিয়োগে  গেজেট প্রকাশ করতে হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি। ফলে ঐ বিচারকের নিয়োগ প্রক্রিয়া অবৈধ।

যে কারণে ঐ বিচারকের দেয়া আদেশ অনুযায়ী খালেদা জিয়ার ঐ মামলার বিচার কাজ চলতে পারে না। এবং খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন অবৈধ।বুধবার বিচারপতি ফারাহ মাহবুবের  নেতৃত্বাধীন  বেঞ্চে এই রিট আবেদন শুনানির জন্য উপস্থাপন করা হতে পরে।রিট বিবেচনাধীন থাকা পর্যন্ত মামলা দু’টির বিচারিক কার্যক্রমের ওপর স্থগিতাদেশও চাওয়া হয়েছে।

খালেদার বিরুদ্ধে ওই দুই দুর্নীতি মামলার বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে ঢাকার বকসিবাজারের আলিয়া মাদ্রাসামাঠের অস্থায়ী আদালতে। এ দুই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য ২১ মে দিন ধার্য রয়েছে।

এর আগেও চার্জ গঠনের আদেশ বাতিল  চেয়ে গত ১৩ এপ্রিল হাইকোর্টে রিভিশন আবেদন করেন খালেদা জিয়া। ১৬, ১৭ ও ২০ এপ্রিল শুনানি শেষে ২৩ এপ্রিল রিভিশন আবেদন খারিজ করে দেন বিচারপতি বোরহান উদ্দিন ও বিচারপতি  কেএম কামরুল কাদেরের হাইকোর্ট বেঞ্চ। এর ফলে বিচারিক আদালতে খালেদা জিয়ার দুই দুর্নীতি মামলার অভিযোগ গঠন বহাল থাকায় বিচারিক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

গত ৭ মে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঢাকার তিন নম্বর বিশেষ জজ আদালতে বিচারাধীন জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের অর্থ আত্মসাৎ সংক্রান্ত বিশেষ মামলা ও জিয়াউর রহমান চ্যারিটেবল ট্রাস্টের টাকা আত্মসাৎ সংক্রান্ত বিশেষ মামলার বিচারিক কার্যক্রম ঢাকার মেট্রোপলিটন দায়রা জজ আদালতভবনের পরিবর্তে ঢাকা মহানগরের বকসিবাজার এলাকার সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা ও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার সংলগ্ন মাঠে নির্মিত অস্থায়ী আদালত ভবনে অনুষ্ঠিত হবে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, ঢাকার মেট্রোপলিটন দায়রা জজ আদালত ভবনে অবস্থিত বহু সংখ্যক আদালতে মামলার বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় ওই ভবন এবং এলাকাটি আদালত চলাকালে জনাকীর্ণ থাকে। তই নিরাপত্তাজনিত কারণে ফৌজদারি কার্যবিধির ৯(২) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার ওই দুই মামলা পরিচালনার জন্য ঢাকা মহানগরের বকসিবাজার এলাকার সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা ও ঢাকা  কেন্দ্রীয় কারাগার সংলগ্ন মাঠে নির্মিত ভবনটিকে (যা বিডিআর হত্যাকাণ্ড মামলার অস্থায়ী আদালত ছিল) অস্থায়ী আদালত হিসেবে ঘোষণা করেছে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরো জানানো হয়, মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ গত ৩০ এপ্রিল এ সংক্রান্ত আদেশ জারি করে। আদেশের  গেজেট ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় গত ১৯ মার্চ খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত। চার্জ গঠন করা হয় খালেদা জিয়ার বড় ছেলে ও বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ মামলা দু’টির অপর ৮ আসামির বিরুদ্ধেও।

ওইদিন খালেদার উপস্থিতিতে মামলা দু’টির চার্জ শুনানি  শেষে অভিযোগ গঠন করেন ঢাকা তৃতীয় ও বিশেষ জজ আদালতের বিচারক বাসুদেব রায়।ওই দিন চার্জ শুনানিতে খালেদার আইনজীবীদের সময়ের আবেদন নামঞ্জুর করে চার্জ গঠন করেন আদালত। বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে এর আগেও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ৪১ বার ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় ১১ বার চার্জ শুনানির জন্য সময় বাড়ানোর আবেদন করেছিলেন খালেদা জিয়া।

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট: ২০১১ সালের ৮ আগস্ট জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে অর্থ  লেনদেনের অভিযোগ এনে খালেদা জিয়াসহ চারজনের নামে তেজগাঁও থানায় মামলা দায়ের করেছিলেন দুর্নীতি দমন কমিশনের সহকারী পরিচালক হারুনুর রশিদ।মামলার অভিযোগ বলা হয়, ২০০৫ সালে কাকরাইলে সুরাইয়া খানমের কাছ থেকে ‘শহীদ জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট’-এর নামে ৪২ কাঠা জমি কেনা হয়। কিন্তু জমির দামের চেয়ে অতিরিক্ত ১ কোটি ২৪ লাখ ৯৩ হাজার টাকা জমির মালিককে দেওয়া হয়েছে বলে কাগজপত্রে  দেখানো হয়, যার কোনো বৈধ উৎস ট্রাস্ট দেখাতে পারেনি।

জমির মালিককে দেওয়া ওই অর্থ ছাড়াও ট্রাস্টের নামে  মোট ৩  কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা অবৈধ লেনদেনের তথ্য পাওয়া  গেছে।২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি এ মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুর্নীতি দমন কমিশনের সহকারী পরিচালক হারুনুর রশিদ খান।

২০১১ সালের ৮ ডিসেম্বর খালেদা জিয়া হাইকোর্ট  থেকে আট সপ্তাহের জামিন পান। ১৭ জানুয়ারি খালেদা জিয়া ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে জামিননামা দাখিল করেন।

মামলায় অভিযুক্ত অপর তিন আসামি হলেন খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ  চৌধুরী, হারিছ  চৌধুরীর তৎকালীন একান্ত সচিব, বর্তমানে বিআইডব্লিউটিএ’র নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক জিয়াউল ইসলাম মুন্না ও ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান।জিয়াউল ইসলাম মুন্না ও মনিরুল ইসলাম খান জামিনে আছেন। হারিছ  চৌধুরী মামলার শুরু  থেকেই পলাতক।

এদিকে, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে দুর্নীতির অভিযোগে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় মামলাটি দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন।এতিমদের সহায়তা করার উদ্দেশ্যে একটি বিদেশি ব্যাংক থেকে আসা ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ এনে এ মামলা দায়ের করা হয়।

মামলার অপর আসামিরা হলেন বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান খালেদাপুত্র তারেক রহমান, মাগুরার সাবেক এমপি কাজী সালিমুল হক কামাল ওরফে ‘ইকোনো কামাল’, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও মমিনুর রহমান।

তারেক রহমান দেশের বাইরে আছেন। মাগুরার সাবেক এমপি কাজী সালিমুল হক কামাল ওরফে ইকোনো কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ জামিনে আছেন। তবে শরফুদ্দিন আহমেদ আদালতে হাজির না থাকায় ১৯ মার্চ তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত।অপর দুই আসামি ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও মমিনুর রহমান মামলার শুরু থেকেই পলাতক।মামলাটি তদন্ত করে দুদকের সহকারী পরিচালক হারুনুর রশিদ খালেদা জিয়া, তারেক রহমানসহ অপর চারজনকে অভিযুক্ত করে ২০০৯ সালের ৫ আগস্ট আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন।