3দৈনিক বার্তা: তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবং টিআইবির ট্রাস্টি  বোর্ডের চেয়ারম্যান এডভোকেট সুলতানা কামাল বলেছেন, সংবিধানই প্রধানমন্ত্রীকে একনায়কতন্ত্রের অধিকারদিয়েছে।এদিকে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আমাদের সংবিধানে নির্বাহী বিভাগের প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে একচ্ছত্র ক্ষমতা  দেয়া হয়েছে। আর এতে একধরনের গণতান্ত্রিক একনায়কতন্ত্র  তৈরি হয়েছে।  কোনো একজন খুন-গুম হলেও  সেই ঘটনার প্রতিকারে প্রধানমন্ত্রীর মতামত বা হস্তক্ষেপের দরকার হয়।

বুধবার রাজধানীর ব্র্যাক-ইন  সেন্টারে ‘জাতীয় শুদ্ধাচার ব্যবস্থার বিশ্লেষণ: বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন তিনি। প্রতিবেদনটি  তৈরি করেছেন অধ্যাপক সালাহউদ্দিন, এম আমিনুজ্জামান ও অধ্যাপক সুমাইয়া খায়ের।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশের (টিআইবি)  চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেছেন, পুলিশ এখন ক্ষমতাসীন দলের কাছে জিম্মি হয়ে আছে। রাজনীতি দলগুলোর স্বার্থ সিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে পুলিশ প্রশাসন ব্যবহৃত হচ্ছে।নারায়ণগঞ্জের সেভেন মার্ডার প্রসঙ্গে সুলতানা কামাল বলেন, পুলিশ বাহিনী যদি ইচ্ছে করলে জড়িত র‌্যাব সদস্যদের ধরতে পারতো।

টিআইবি প্রতিবেদনটিতে জানিয়েছে, জাতীয় সংসদের সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো সক্রিয় থাকলেও আর্থিক সম্পদের অপর্যাপ্ততা ও মানসম্পন্ন কর্মীর অভাব রয়েছে। সরকারের নির্বাহী বিভাগের জন্য বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হলেও নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের ফলে অপব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় নির্বাহী বিভাগের নিরঙ্কুশ এবং একচ্ছত্র ক্ষমতা চর্চা করে থাকেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী। সংবিধানই তাকে এ অধিকার দিয়েছে।আর এসব একচ্ছত্র অধিকার যাকে দেওয়া হয়, তিনি তার ইচ্ছেমতো ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন। যার ফলে জাতীয় শুদ্ধাচার এখানে বাধাগ্রস্ত।সরকারি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার কারণে পুলিশ বাহিনী হত্যাকারী র‌্যাব সদস্যদের  গ্রেফতার করতে পারছে না।এছাড়া, এ মামলায় একটি শক্তিশালী  গোষ্ঠির যোগসাজশ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সংবিধান রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানকে অকুণ্ঠ ক্ষমতা’দিয়েছে। এ ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে।তিনি বলেন, এজন্য সাংবিধানিক কাঠামো ও শাসন ব্যবস্থার কার্যপ্রণালীর কিছু পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবং টিআইবি’র ট্রাস্টি বোর্ডের  চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, সংবিধানই প্রধানমন্ত্রীকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় নির্বাহী বিভাগের নিরঙ্কুশ এবং একচ্ছত্র ক্ষমতা দিয়েছে। আর এসব একচ্ছত্র অধিকার যাকে দেওয়া হয়, তিনি তার ইচ্ছেমতো ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন। যার ফলে জাতীয় শুদ্ধাচার বাধাগ্রস্ত হয়।

টিআইবি’র প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুর্বল জাতীয় শুদ্ধাচার ব্যবস্থা আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার তুলনায় অনুশীলন এবং বাস্তবায়নের মধ্যে বিস্তৃত পার্থক্যের কারণে বাংলাদেশে সুশাসনের সম্ভাবনাকে ব্যাহত করছে। যার ফলে দুর্নীতির প্রসার ঘটছে।

২০১২ সালের আগস্ট  থেকে ২০১৩ সালের  সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত ওই গবেষণা অনুযায়ী, তুলনামূলকভাবে শক্ত আইনি, সম্পদ এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো থাকার পরও অপর্যাপ্ত বাস্তবায়ন ও চর্চা এবং আইন অমান্যের সংস্কৃতি বিরাজ করায় দেশে স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিতামূলক শাসন ব্যবস্থা দুর্বলতর হচ্ছে।

বার্লিনভিত্তিক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সহায়তায় একই ধরণের গবেষণা বাংলাদেশ ছাড়াও মালদ্বীপ,নেপাল, পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কায় পরিচালিত হয়েছে। গবেষণাটির যুগ্ম প্রণেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. সালাহউদ্দিন এম আমিনুজ্জামান এবং  টিআইবি’র উপ-নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের সংবাদ সম্মেলনে গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন।

গবেষণায় জাতীয় শুদ্ধাচার ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত ১৫টি স্তম্ভ বিশ্লেষিত হয়: সংসদ, নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, স্থানীয় সরকার, পুলিশ (আইন প্রয়োগকারী সংস্থা), মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম এবং ব্যবসা খাত। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের আইনি কাঠামো, সক্ষমতা, সুশাসন এবং ভূমিকার আলোকে বিশ্লেষণ করা হয়।

গুণগত এ গবেষণাটি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সূত্রের উপাত্ত ছাড়াও সংশ্লিষ্ট জাতীয় আইন, গবেষণা, প্রতিবেদন (গণমাধ্যম ও অন্যান্য) এবং মূখ্য সাক্ষাতদাতাদের তথ্যের ভিত্তিতে প্রণীত। গবেষণার ফলাফল একটি পিয়ার রিভিউ এবং লাইবেল  চেকের পর আট সদস্য বিশিষ্ট একটি শক্তিশালী উপদেষ্টা গ্র“প সত্যায়িত করেন।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, জাতীয় শুদ্ধাচার ব্যবস্থার বিশ্লেষণকে দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানের কার্যকরিতা এবং সামর্থের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী  অকার্যকর সংসদ ও বয়কটের সংস্কৃতি, সর্বময় কর্তত্বের অধিকারী নির্বাহী বিভাগ, অন্যদিকে বিচার বিভাগ, আমলাতন্ত্র এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ক্রমাগত দলীয়করণের ফলে সুশাসনের জন্য অপরিহার্য তদারকি ও জবাবদিহিতার ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, বিভিন্ন কমিশনগুলোর (নির্বাচন কমিশন, দুদক, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও তথ্য কমিশন) স্বাধীনতা ও কার্যকরিতা প্রশ্নবিদ্ধ হবার কারণে ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনআস্থা হ্রাস পেয়েছে। এছাড়া প্রতিবেদনে রাজনৈতিক দলগুলো, নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যমের  ক্ষেত্রে সুদৃঢ় অভ্যন্তরীণ সুশাসনের সমস্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন পাঠ  শেষে টিআইবি’র ট্রাস্টি  বোর্ডের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল ও নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।

অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, যেকোনো প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতার  অভাব  তৈরি হলেই শুদ্ধাচার ব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটে। যখন শুদ্ধাচার ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠানগুলো সঠিক ও কার্যকরভাবে পরিচালিত হবে তখন সমাজ ও রাষ্ট্রে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও দুর্নীতির মতো ঘটনা বিলুপ্তির মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গণতান্ত্রিক এবং জবাবদিহিমূলক সুশাসন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব অব্যাহতভাবে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়াও আরো কিছু বিষয় যা বিদ্যমান জাতীয় শুদ্ধাচার ব্যবস্থার ওপর প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তার করেছে। এগুলো হলো: প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর উদ্বেগজনক মাত্রায় দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি, অপর্যাপ্ত সম্পদ, স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতির বিস্তার এবং দুর্নীতির অস্বীকৃতি চর্চার ফলে সৃষ্ট বিচারহীনতার সংস্কৃতি।

তিনি আরো বলেন, সরকার জাতীয় শুদ্ধাচার  কৌশল’২০১২ গ্রহণ করার  প্রেক্ষাপটে এ গবেষণাটি প্রণীত হওয়ায় টিআইবি আশা করে, সরকারের কৌশল বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় বর্তমান গবেষণার ফলাফল ও সুপারিশগুলো বিবেচনায় নেওয়া হবে।

সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় শুদ্ধাচার ব্যবস্থার অন্তর্গত ১৫টি প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ৬৩টি সুপারিশ উত্থাপন করে ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সুপারিশগুলো হল:- সংসদকে কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ, আইন করে সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি বন্ধ করা, সংসদ সদস্যদের আচরণবিধি বিল আইনে রূপান্তর করা ইত্যাদি।