1 দৈনিক বার্তাঃ
আইনের শাসন নেই বলে সারাদেশে পৈশাচিক তাণ্ডব চালাচ্ছে অবৈধ সরকার বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি   চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তিনি বলেছেন, দেশে শাসন নেই, প্রশাসন  নেই। আছে শুধু ত্রাস। আছে শুধু নিরাপত্তাহীনতা। ঘরে অফিসে  কোথাও কেউ নিরপদে নেই। বাংলাদেশ এখন আতঙ্কের জনপদ।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে  বেগম খালেদা জিয়া এসব কথা বলেন।দেশব্যাপী চলমান খুন-গুম-অপহরণের পরিস্থিতি তুলে ধরতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে শুধু ঢাকা মহানগরীতে গুম ও অপহরণের শিকার ২২ ব্যক্তির স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন।অবশ্য বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর ইন্সটিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্সে ‘গুম, খুন ও বিচার বহির্ভূত হত্যার প্রতিবাদ জানাতে নাগরিক সমাবেশের কথা ছিল বিএনপি। কিন্তু পুলিশি বাধায় পণ্ড হয়ে যায় বিএনপির ওই কর্মসূচি।

সমাবেশ উপলক্ষে বৃহস্পতিবার সকাল  থেকেই বিএনপি  নেতাকর্মীরা মঞ্চ নির্মাণসহ অন্যান্য কাজ শুরু করে। পরে পুলিশ তাদের  সেখান  থেকে চলে যেতে বাধ্য করে। একপর্যায়ে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের প্রধান  গেট তালাবদ্ধ  দেখা যায়। বর্তমানে সেখানে বিপুল সংখ্যক পুলিশের উপস্থিতি ছিল।সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকার কথা ছিল বিএনপি  চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার।

এরপর সেখানেই অবস্থান নিয়ে এ ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।পরে দুপুরেই তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত হয় ভুক্তভোগী স্বজনদের সঙ্গে খালেদা জিয়া গুলশানে তার রাজনৈতিক কার্যালয়েই  দেখা করবেন।এদিকে শুধু সমাবেশ পণ্ডই নয়, বাড়তি সতর্কতা হিসেবে গুলশানে খালেদা জিয়ার বাসা ও কার্যালয়ের সামনে অবস্থান  নেয় অতিরিক্ত পুলিশ।ওই নাগরিক সমাবেশে বিশিষ্ট নাগরিক, গণমাধ্যমের সম্পাদক ও  জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, ঢাকায় বিভিন্ন  দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাই-কমিশনারদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বলে বিএনপির তরফে জানানো হয়।

খালেদা অভিযোগ করেন, দেশে আইনের শাসনের অনুপস্থিতি আমাদের কাছ  থেকে সভ্য পরিবেশ উধাও করে দিয়েছে, সারাদেশে পৈশাচিক তাণ্ডব চলছে। আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। আমরা আবার এক  নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে ফিরে যাচ্ছি।তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগের শাসনামলে তাণ্ডবে আতঙ্কিত হয়ে প্রখ্যাত সাংবাদিক নির্মল সেন লিখেছিলেন, স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই।সেই অবস্থাকেও ছাড়িয়ে গেছে এখনকার পরিস্থিতি।

তিনি বলেন, ক’দিন আগে নারায়ণগঞ্জে সাতজনকে খুন করা হয়েছে। এর মধ্যেই  ফেনীতে উপজেলা চেয়ারম্যানকে গুলি করে হত্যা করে আগুনে পুড়িয়ে অঙ্গার করা হয়েছে।এসব ঘটনার জন্য আওয়ামী লীগের  লোকেরাই দায়ী বলে সংবাদ মাধ্যমে উঠে এসেছে বলে দাবি করেন বিএনপি চেয়ারপারসন।

দেশের চলমান, খুন-গুম-অপহরণসহ শাসক দলের বিভিন্ন অপকর্ম তুলে ধরেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।

এ সময়  ফেনীতে এক আওয়ামী লীগ নেতাকে গুলি করে ও পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা তুলে ধরে আক্ষেপ করে বেগম খালেদা জিয়া বলেন,  দেশের মানুষ দেশ স্বাধীন করেছিল শান্তিতে বেঁচে থাকার জন্য। কিন্তু শাসক দলের অপকর্ম ও দুঃশাসনে  দেশে আজ  নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।  যেখানে  সেখানে লাশ পাওয়া যাচ্ছে। মানুষকে পুড়িয়ে মারা হচ্ছে। গুম করা হচ্ছে। স্বাধীন  দেশের আজ এ কী অবস্থা! খালোদা বলেন, সমাবেশ করতে না দিয়ে বর্তমান অবৈধ সরকার অগণতান্ত্রিক আচরণ করছে।দেশে একদলীয়, বাকশালীয় শাষন ব্যাবস্থা চলছে।

বিএনপি চেয়ারপারসন ও বেগম খালেদা জিয়া বলেন, জঙ্গিবাদ দমন ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের  গ্রেফতারের জন্য র‌্যাবকে আমরাই গঠন করেছিলাম। আমরা তখন তাদেরকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করিনি। কিন্তু বর্তমান সরকার র‌্যাবকে দলীয় ও রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে র‌্যাবকে কলঙ্কিত করেছে। এর মধ্য দিয়ে  দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর সুনাম ও মর্যাদা ক্ষুন্ন করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে বেগম জিয়া আরো বলেন, রাতের অন্ধকারে কাউকে  গ্রেফতার করা চলবে না। কাউকে  গ্রেফতার করতে হলে তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকতে হবে। প্রয়োজনে পুলিশ এবং সাক্ষীর উপস্থিতিতে  গ্রেফতার করতে হবে।

বেগম খালেদা জিয়া বলেন, বিরোধী দলের আন্দোলন ভণ্ডুলের ইদ্দেশ্যে নেতাকর্মীদের হত্যা ও গুম করানো হচ্ছে র‌্যাবকে দিয়ে।এই এলিট  ফোর্সকে আমরা কখনও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে ব্যবহার করেনি। কিন্তু এই সরকার তাদের অপব্যবহার করেছে। হীন উদ্দেশ্যে দলীয় আনুগত্য পদায়নের মানদণ্ড করা হয়েছে।

তিনি বলেন, র‌্যাব আমরাই গঠন করেছিলাম। জঙ্গিবাদ দমন, মাদক চোরাচালান রোধ করে এই বাহিনী ব্যাপক জনপ্রিয়তা  পেয়েছিল। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ধরতে র‌্যাব অসামন্য সাফল্য  পেয়েছিল। র‌্যাব জনগণের বিপুল আশীর্বাদ ও সমার্থনপুষ্ট হয়েছিল। আবারও র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র‌্যাব) বিলুপ্ত করার দাবি জানান বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া।

খালেদা জিয়া বলেন, বিএনপি আমলে র‌্যাবের রাজনীতিকরণ করা হয়নি। কিন্তু এই সরকারের আমলে সেই বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের নির্মূলে ব্যবহার করা হচ্ছে।

বর্তমান সরকার অন্ধ দলীয় আনুগত্যে র‌্যাবে নিয়োগ দিচ্ছে।বেআইনি পন্থায় সারা দেশের বিরোধী দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়েছে। ঘরবাড়ি ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের নির্যাতন করা হয়েছে।তিনি আরও বলেন, বেআইনি কার্যক্রমে ব্যবহার করার কারণেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা উচ্ছৃঙ্খল হয়ে পড়েছে।গত এক বছরে বিএনপির ৩শ’১০ জন নেতাকর্মী গুম-খুনের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গুলশানে বিএনপি  চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে  তিনি একথা বলেন।

গুম, খুন ও বিচার বহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন এমন কয়েকজন নেতাকর্মীর স্বজনদের সঙ্গে বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়ার মতবিনিময়ের শুরুতে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখছিলেন ফখরুল।ক্ষতিগ্রস্ত ২২টি পরিবারকে এতে আমন্ত্রণ জানানো হয়।ফখরুল বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের কষ্টের কোনো   শেষ নেই। তারা জানেন না তাদের পরিবারের প্রিয় সদস্যটি  কোথায় আছেন, কেমন আছেন? যারা হত্যার শিকার হয়েছেন তারা জানেন না, তাদের অপরাধ কী ছিল? এ ঘটনায় বিচারও পাচ্ছেন না স্বজনরা।

যাদের পরিবারকে আমন্ত্রণ জানানো ছিল তারা হলেন- এম ইলিয়াস আলী,  চৌধুরী আলম, ইফতেখার আহমেদ দিনার,  মো. জহির, সেলিম রেজা, আসাদুজ্জামান, সম্রাট  মোল্লা, মাজহারুল ইসলাম রাসেল, পারভেজ  হোসেন,চঞ্চল, আল-আমিন, খালেদ হোসেন সেলিম, সাজেদুল ইসলাম সুমন, আবদুল কাদের ভুইয়া মাসুম (তানভির), এ এম আদনান চৌধুরী, নিজাম উদ্দিন মুন্না, কাউসার, মো. তরিকুল ইসলাম, মাহবুব  হোসেন সুজন, কাজী ফরহাদ, তরিকুল ইসলাম তারা, মফিজুল ইসলাম রাশেদ।

খালেদা জিয়া ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম, ভাইস  চেয়ারম্যান সাদেক  হোসেন  খোকা, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু,যুগ্ম-মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদ, আমান উল্লাহ আমান, মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসিরউদ্দিন অসীম,বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি)সভাপতি আন্দালিব রহমান পার্থ, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র অধ্যাপক এম এ মান্নান প্রমুখ।

গুম-খুন ও বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার নেতাকর্মীদের স্বজনদের কান্নায় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার কার্যালয়।ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ সরকার-প্রশাসন বিশেষ কওে র‌্যারে প্রতি। ঘটনার পর তারা কোনো বিহিত পাচ্ছেন না বলেও জানান তারা।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গুলশানে নিজের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ক্ষতিগ্রস্ত স্বজনদের সঙ্গে মতবিনিময় বৈঠকে বসেন খালেদা।একে একে স্বজনরা এ সময় নিজেদের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে কান্নায়  ভেঙে পড়েন। তাদের সেই কান্না স্পর্শ করে উপস্থিত সবাইকেই। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ অন্য অনেকের চোখেই অশ্র“  দেখা যায়।

গুম হয়ে যাওয়া এ এম আদনান  চৌধুরী ছিলেন  তেজগাঁও থানার স্বেচ্ছাসেবক দলের  নেতা। তার বাবা রুহুল আমিন চৌধুরী বলেন, র‌্যাব সদস্যরা যখন আমার ছেলেকে নিতে আসে, তখন প্রশাসনের সদস্য বলেই তাদের প্রতি বিশ্বাস রেখেছিলাম। তারা রাতে নিয়ে যায়,  ছেলেকে ফেরত না  পেয়ে র‌্যাব’র অফিসে যাই। কিন্তু তারা বলেন, কেউ এমন অপারেশনে যায় নাই।এরপর ডিবি অফিসে যান রুহুল। এভাবেই নানাভাবে চেষ্টা করে এখনও ছেলের হদিস পাননি বলে জানান তিনি।

বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনের  বোন মারেফা ইসলাম বলেন, আমার মা এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না যে তার ছেলে নেই। তিনি বেঁচে থাকতে তার ছেলে থাকবে না এটা তিনি মানতে পারছেন না। আমাদের এই কষ্টের কোনো সীমা নাই।

নিজাম উদ্দিন মুন্নার বাবা  মো. শামসুদ্দিন বলেন, আমার চোখের সামনে থেকে পাখির মতো করে আমার ছেলেটিকে নিয়ে গেল। তার কোনো অপরাধ নাই। তার নামে কোনো মামলা বা জিডি নাই। তার অপরাধ সে বিএনপি করে।তরিকুল ইসলাম ঝন্টুকেও একই সময় উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন ঝন্টুর মা। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্দেশ্যে বলেন, আপনার কাছে আমার আকুল আবেদন, আমার ছেলেকে ভিক্ষা দিন।মাহবুব হাসান সুজনের বাবা আবদুল জলিল বলেন, আমার  ছেলের একমাত্র অপরাধ-  সে ছাত্রদল করতো। ভয়ে  সে বাসায় থাকতো না।  সোনারগাঁ গিয়ে সে লুকিয়ে ছিল।স্থানীয় শ্রমিকরা জানান, রাতে সাড়ে ১২টায় পাঁচজন লোক তাদের নিয়ে যায়।এ সময় কাজী ফরহাদকেও নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে জানান জলিল।