Nil gach1টিপু সুলতান/দৈনিক বার্তাঃ বড় কষ্ট নিয়ে ছড়াটা বানিয়েছিল নীলচাষিরা। এই ছড়া শোনানো সেই দীনবন্ধু মিত্রও আর নেই, নেই নীল বাঁদরেরাও। ভারতজুড়ে চাষিদের বিদ্রোহের মুখে নীলকর সাহেবরা ল্যাজ গুটিয়েছিল প্রায় দেড়’শ বছর আগে। ধুলোর নিচে চলে গেছে নীলকর সাহেবদের অত্যাচার। বাংলা থেকে নীল চাষও হারিয়ে গিয়েছে ব্রিটিশদের বিদায়ের পরপরই। তারপরও  বাংলার মানুষেরা এখনো নীল চাষের কথা শুনলে শিউরে ওঠে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে বাংলার সাধারণ চাষীদের উপর নীলকরদের অত্যাচারের দৃশ্য। তাই এখনও অনেকে নীল গাছকে অভিষপ্ত গাছ হিসেবে  মনে করে। তবে বর্তমানে সেই নিল চাষ আবারো ফিরেএসেছে দেশের রংপুর-নীলফামারী অঞ্চলে  তবে এবার অভিশপ্ত হয়ে নয় ফিরে এসেছে আর্শীবাদ হয়ে। শিল্প কারখানা বিহীন  আত্মহত্যা প্রবন ঝিনাইদহ জেলায় নীল চাষ হতে পারে বেকারত্ব ঘুচানোর এক অনণ্য মাধ্যম।
নীল গুল্ম জাতীয় এক প্রকারের উদ্ভিদ। এর অন্যান্য স্থানীয় নাম, নিলিনী, রঞ্জনী, গ্রামিনিয়া, কালোকেশী, নীলপুষ্প, মধুপত্রিকা। বৈজ্ঞানিক নামঃ রহফরমড়ভবৎধ ঃরহপঃড়ৎরধ । এটি ঋধনধপবধব পরিবারের সদস্য।
বাংলা ভূখন্ডে ইন্ডিগোফেরা এর ১৫ প্রজাতির গাছ জন্মে। নীল পানিতে দ্রব্য গুকোসাইড নামক রাসায়নিক হিসাবে থাকে।


নীল রং তৈরির পদ্ধতি নিম্নরূপ – গাছ কেটে বড় কড়াইতে পানির মধ্যে প্রায় ১২ ঘণ্টা ডুবিয়ে রাখলে তা থেকে সবুজ রং এর নির্যাস রের হয়। এরপর এই নির্যাস নতুন পাত্রে ঢেলে এই দ্রবনকে কাঠি দিয়ে অনেক্ষণ নাড়তে হয় যাতে নীল বাতাসের অক্সিজেন এর সংস্পর্শে আসে। এর ফলে অদ্রাব্য নীল এর তলানী নীচে জমা হয় এবং পরে তা পৃথক করে শুকিয়ে টুকরো টুকরো করে কাটা হয়। রংপুর অঞ্চলের নীলচাষীরা জানান, প্রতি কেজি নীল তৈরী করতে নীলের পাতা ক্রয়, শ্রমিকের মজুরি ইত্যাদী বাবদ খরচ হয় ৯০০ থেকে ১০০০ টাকা। আর প্রতি কেজি নীল বিক্রি হয় ১৫০০ থেকে ২৫০০ টাকা।  খরচ হয় মঙ্গাকবলিত রংপুর জেলায় বেসরকারী সংস্থা কেয়ারের অর্থায়নে নীল প্রক্রিয়াজাতকরন কারখানা গড়ে উঠেছে। দেশের ও বিশ্ব বাজারে নীলের চাহিদা ব্যাপক। বর্তমানে রংপুরের নীল বিদেশে রপ্তানী হচ্ছে। এই নীল ডাইং করে স্কাপ, চাদর ও কাঁথা তৈরী করে বিদেশের বাজারে রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা  সম্ভব। নাইট্রোজেনে ভরপুর নীলের বর্জ্য ইউরিয়ার বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।  এই গাছে ভেষজগুনও বিদ্যমান। প্রাচীন ভারতে আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে নীলে আছে প্রশন্তি। আধুনিক কবিরাজি চিকিৎসায় নীলে শিকড় ও পাতার নানা অসুখে ব্যবহৃত হয়। পাতার রস মৃগীরোগীর জন্য উপকারী। এছাড়া নীলের পাতা একটি উন্নত মানের সবুজ সার।
বাড়ির আশপাশের আঙিনা, উঁচুভিটা ও বালুমাটি মিশ্রিত অনুর্বর জমিতে এই ঐতিহাসিক নীল চাষ করা যেতে পারে। এছাড়া কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উদ্যোগে জেলার বিভিন্ন এলাকার কাচা ও পাকা সড়কের দু’ধারে নীল গাছ লাগানো যেতে পারে। এতে বেকার যুবক ও অবহেলিত নারীরা সহজে ও অল্প পরিমান অর্থ বিনিয়োগে মোটা অঙ্কের অর্থ আয় করতে পারে। একটি  নীল গাছগুলো সাধারণত ৫-৬ ফুট লম্বা হয়। পাতা সরু ও ছোট। গরু-ছাগল এ পাতা খায় না। এ গাছের চাষের জন্য অন্য আগাছাও জন্মানোর সুযোগ পায় না। এ গাছ উৎপাদনে রাসায়নিক কিংবা গোবর সারের প্রয়োজন হয় না। সাধারণত চৈত্র মাসে এর বীজ বপন করা হয় এবং আশ্বিন-কার্তিক মাসে গাছগুলো শিকড়সহ তুলে পাতাসহ মাটি দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। এক একর জমিতে নীল চাষ করতে সাধারণত ২ কেজি বীজের প্রয়োজন হয়। ২ কেজি বীজের মূল্য মাত্র ৪০-৫০ টাকা।
ঝিনাইদহে  নীল চাষ ও তার সম্ভাবনা নিয়ে কথা হয় জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালকের সাথে তিনি জানান, ১০ বছর পূর্বে একবার নীল চাষের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিলো কিন্তু বিভিন্ন জটিলতার কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। তবে বেসরকারী ভাবে বা ব্যক্তিগত পর্যায়ে কেউ নীল চাষের উদ্যোগ গ্রহণ করলে কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর তাদেরকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবেন বলে তিনি জানান।
যে নীল একদিন তাঁদের পেটের ভাত কেড়ে নিয়েছিল, আজ সেই নীল ফিরে আসতে পারে কৃষকের মুখের হাসি হয়ে। এই নীল চাষই হতে পারে অবহেলিত নারী ও বেকার যুবকের সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকার  প্রধান অবলম্বন।