9দৈনিক বার্তাঃ প্রধানমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবারও নিরবচ্ছিন্ন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর জোর দিয়ে বলেছেন, কেবল এটাই কোন দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে।তিনি বলেন, আমি মনে করি কেবল নিরবচ্ছিন্ন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াই কোন দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী সোমবার সকালে আকাসাকা প্রাসাদে জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি লীগের সদস্যদের সঙ্গে এক বৈঠকে বক্তৃতা করছিলেন।জাপান পার্লামেন্টের হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভ সদস্য তাকিও কাওয়ামুরা জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্ট লীগের সদস্যদের নেতৃত্ব দেন ।

বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মাহবুবুল হক শাকিল সাংবাদিকদের এ কথা জানান।তিনি বলেন,বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন যে, দু’দেশের আইনপ্রণেতারা বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো সুসংহত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন।

তিনি আরো বলেন, আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুদৃঢ়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও জনগণের ক্ষমতায়নের পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করা।প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকার দেশের ঐতিহ্যবাহী ধর্মনিরপেক্ষতা ও সকল ধর্মের মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনেও কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য জিডিপির হার ২০১৫ সালের মধ্যে ৮ শতাংশ ও ২০১৭ সালের মধ্যে ১০ শতাংশে উন্নীত করা। এই হার ধরে রেখে ২০২১ সালের মধ্যে আমরা দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে চাই।

শেখ হাসিনা বলেন, ২০১২-১৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ১৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশী এবং বৈদেশিক মূদ্রার রিজার্ভ দঁড়ায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।তিনি বলেন, আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল এবং সকল অর্থনৈতিক সূচক ইতিবাচক অগ্রগতির ধারায় রয়েছে।প্রধানমন্ত্রী বলেন, গোল্ডম্যান শ্যাসের মতে বাংলাদেশ তাদের পরবর্তী এগারো দেশের তালিকায় এবং জেপি মরগান তাদের প্রথম ৫ দেশের তালিকায় বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।তিনি বাংলাদেশ-জাপান বন্ধুত্ব জোরদারের অঙ্গীকারের জন্য জাপান-বাংলাদেশ সংসদীয় লীগের সদস্যদের ধন্যবাদ জানান।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে জাপানের জনগণের সমর্থনের কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতি প্রদানকারী কয়েকটি দেশের মধ্যে জাপান অন্যতম। তারা স্বাধীনতার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ১৯৭২ সালের ফেব্র“য়ারিতে আমাদের স্বীকৃতি দেয়।তিনি বলেন, জাপানের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালের অক্টোবরে এদেশ সফরে আসেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর ওই ঐতিহাসিক সফরের মাধ্যমেই দু’দেশের মধ্যকার সম্পর্ক সুদৃঢ় হয় এবং সেই থেকে জাপান বাংলাদেশের একনিষ্ঠ উন্নয়ন অংশীদার ও বিশ্বস্ত বন্ধু।শেখ হাসিনা বলেন, বিগত বছরগুলোতে আমাদের জাতীয় উন্নয়নের সকল ক্ষেত্রে জাপানের সহায়তা অপরিবর্তিত রয়েছে। তিনি বলেন, দেশ গঠনের অগ্রযাত্রা বিশেষ করে আমাদের অবকাঠামো ও মানব সম্পদ উন্নয়নে জাপানের সমর্থন জাতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, প্রাকৃতিক দুযোর্গ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব সত্ত্বেও বাংলাদেশ গত ৫ বছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের ওপরে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও জাপান আন্তর্জাতিক অঙ্গন বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অস্ত্র বিস্তার রোধ, বিশ্ব শান্তি ও স্থিতিশীলতাসর মত সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সহযোগিতা করে যাচ্ছে।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের অভিন্ন উদ্দেশের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, জাপান-বাংলাদেশ সংসদীয় লীগ বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে সমন্বিত অংশিদারিত্বের চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

প্রধানমন্ত্রী জাপান-বাংলাদেশ সংসদীয় লীগের সাফল্য কামনা করেন এবং বাংলাদেশের কাঙ্খিত উন্নয়ন ও অগ্রগতির যাত্রায় বাংলাদেশের পাশে থাকায় জাপানে বাংলাদেশের বন্ধুদের ধন্যবাদ জানান।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অতি দ্রুত সতর্কতা সংকেত প্রদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করেছে উল্লেখ করে তিনি এ ব্যাপারে বাংলাদেশ-জাপান যৌথ সহযোগিতার ওপর জোর দেন।

জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টরী ফ্রেন্ডশীপ লীগের সদস্যরা বলেন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে পরস্পরিক বন্ধুতবপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান।

তারা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পরে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানকারী কয়েকটি দেশের মধ্যে জাপান অন্যতম। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ১০ বছর পর জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশীপ লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। তারা প্রধানমন্ত্রীকে আরো জানান যে জাপানের কোম্পানীগুলো বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরো বিনিয়োগ করতে আগ্রহী।

প্রতিনিধিদলের প্রধান তাকিও কাওয়ামুরা বলেন, শেখ হাসিনার এ সফর জাপান-বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরো জোরদার এবং সেই সঙ্গে দু’দেশের আস্থার সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করবে। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার এ সফর উভয় দেশের সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ককেও জোরদার করবে।

আর্থসামাজিক ও অবকাঠামোগত খাতে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উন্নয়নের প্রশংসা করে প্রতিনিধি দলের প্রধান বলেন, এটি জাপানসহ গোটা বিশ্বের মনোযোগ আকৃষ্ট করেছে।

এদিকে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টোকিওর ইম্পেরিয়াল প্রাসাদে জাপানের সম্রাট আকিহিতোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।জাপানের স্থানীয় সময় সোমবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রী তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এ আমন্ত্রণ জানান।

প্রধানমন্ত্রী জাপানের সম্রাট ও সম্রাজ্ঞীকে তাদের পূর্ববর্তী সফরের পর এ দেশের অগ্রগতি দেখতে সফরের আমন্ত্রণ জানান।ইম্পেরিয়াল প্রাসাদে প্রধানমন্ত্রীর আগমনে সম্রাট আকিহিতো তাঁকে অভিনন্দন জানান।

প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭৩ সালে জাপান সফর এবং জপানের সম্রাট ও সম্রাজ্ঞী ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশে সৌহার্দপূর্ণ সফর বিনিময়ের কথা স্মরণ করেন,তখন আকিহিতো ক্রাউন প্রিন্স ছিলেন।প্রধানমন্ত্রী তাঁর আগের সফরের সময়ে সম্রাটের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার কথাও এ সময় স্মরণ করেন।

সম্রাট বাংলাদেশের অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেন। প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্যের কথা উল্লেখ করেন, বিশেষ করে আর্থসামাজিক ও দারিদ্র বিমোচন ক্ষেত্রে সাফল্যের কথা তুলে ধরেন।সম্রাট আকিহিতো দারিদ্র মোকাবেলায় শেখ হাসিনার সরকারের গৃহীত নানা কৌশলের প্রতি সমর্থন ও আগ্রহ প্রকাশ করেন।প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণের জন্য গৃহীত বিভিন্ন কৌশলের কথা সবিস্তারে বর্ণনা করেন

এছাড়া শেখ হাসিনা ভূমিহীন কৃষকদের ক্ষমতায়নের জন্যে তাদের ভূমি প্রদান, কম সুদে ঋণ প্রদান ও বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা এবং দরিদ্রদের শিক্ষার বিভিন্ন সুযোড় প্রদানের কথা উল্লেখ করেন।তিনি বলেন, এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করায় দারিদ্রতার স্তর হ্রাস পেয়ে ২৬ শতাংশে নেমে এসেছে। দ্রুত শিল্পায়নের মাধ্যমে কাজের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের উন্নয়নে জাপানের সহায়তার কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে আরো জাপানি বিনিয়োগ প্রয়োজন।এর আগে প্রধানমন্ত্রী ইম্পেরিয়াল প্রাসাদে পৌঁছলে প্রাসাদের হাউসহোল্ড নোবুতাকি ওদানো তাঁকে গ্র্যান্ড মাস্টার অভ্যর্থনা প্রদান করেন।এ সময় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সোমবার সকালে আকাসাকা প্রাসাদে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়।
প্রধানমন্ত্রী জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো এ্যাবের আমন্ত্রণে চারদিনের সরকারি সফরে গতকাল টোকিও পৌঁছান।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে যোগদানের উদ্দেশে স্থানীয় সময় সকাল সোয়া নয়টায় জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রাসাদের নয়নাভিরাম চত্বরে পৌঁছান।সংক্ষিপ্ত এ অনুষ্ঠানে জাপানের গ্রাউন্ড-সেল্ফ ডিফেন্স ফোর্সের একটি চৌকস দল প্রধানমন্ত্রীকে গার্ড অব অনার প্রদান করে। তিনি গার্ড পরিদর্শন ও সশস্ত্র বাহিনীর অভিবাদন গ্রহণ করেন।এ সময় দু’দেশের জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করা হয়।পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর সফরসঙ্গী মন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে পরিচয় করিয়ে দেন।জাপানের প্রধানমন্ত্রীও তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্য ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে শেখ হাসিনাকে পরিচয় করিয়ে দেন।

অনুষ্ঠানে জাপানের বহু সংখ্যক স্কুলশিশু দু’দেশের ছোট ছোট জাতীয় পতাকা নেড়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে অর্ভ্যথনা জানায়।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম শাহরিয়ার আলম, এ্যাম্বাসেডর-এট-লার্জ এম জিয়াউদ্দিন, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবদুস সোবহান সিকদার, পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক, ইআরডি সচিব মো: মেজবাহউদ্দিন, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মাহবুবুল হক শাকিল, জাপানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন ও এফবিসিসিআই সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।