21দৈনিক বার্তাঃ গণমুখী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ ব্যক্তিত্ব তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, প্রবাদপ্রতীম এই ব্যক্তিত্ব দেশের সাংবাদিকতাকে একটানে বদলে দিয়েছিলেন। মানুষের প্রত্যাশা, বেদনাকে জোরালোভাবে তুলে ধরবার এক আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল তার। দৈনিক ইত্তেফাক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সাংবাদিকতাকে অবলম্বন করে জীবনব্যাপী তিনি এদেশের মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

তিনি ছিলেন নির্ভীক সাংবাদিকতার কিংবদন্তী পুরুষ, আধুনিক সংবাদপত্রের রূপকার, বাঙালি জাতীয়তাবাদ আন্দোলনের অন্যতম প্রবক্তা। ‘রাজনৈতিক ধোঁকাবাজি’, ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ আর ‘রঙ্গমঞ্চ’ শিরোনামে কলাম লিখে বাংলাদেশের মানুষকে স্বাধীনতাকামী করে তোলেন মানিক মিয়া। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের কথা সহজ ভাষায় তিনি মানুষের সামনে তুলে ধরেন। নীতির প্রশ্নে, বাংলার মানুষের অধিকারের বিষয়ে তিনি কখনো আপস করেননি। দৈনিক ইত্তেফাক ছিল তার সেই সংগ্রামী জীবনের প্রধান হাতিয়ার।

১৯৬৯ সালের এই দিনে মাত্র ৫৮ বছর বয়সে পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন ক্ষণজন্মা এই সাংবাদিক। ভাগ্য-বিড়ম্বিত বাঙালি জাতির জীবন-সংগ্রাম, অস্তিত্ব-আত্মমর্যাদা এবং আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রেরণা প্রদানকারী শক্তির উত্স হয়ে উঠেছিলেন তিনি এবং তার প্রকাশিত সংবাদপত্র ‘দৈনিক ইত্তেফাক’। তাঁর সংগ্রামদীপ্ত জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে বাংলার মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও সাংবাদিকতার দায়িত্ববোধ জড়িয়ে ছিল।

এ দেশে সাংবাদিকতার জগতে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া একটি অবিস্মরণীয় নাম। ‘মোসাফির’ ছদ্মনামে তার ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ কলামে নির্ভীক সত্য ভাষণ, অনন্য রাজনৈতিক দিক-নির্দেশনা এবং গণমানুষের প্রতি ভালোবাসার কারণেই বাংলার মানুষের হৃদয়ে তিনি অবিনশ্বর হয়ে রয়েছেন। মানিক মিয়া প্রচলিত অর্থে শুধুমাত্র একজন সাংবাদিক ছিলেন না বরং সাংবাদিকতার মাধ্যমে মানুষের মুক্তির পথ রচনার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তার আপসহীন মনোভাবের কারণে প্রতিক্রিয়াশীল পাকিস্তানি শাসকরা বার বার তার কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে চেয়েছে। ‘দৈনিক ইত্তেফাকে’র ওপর বার বার নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়।

বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনে ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ এক অসামান্য ভূমিকা পালন করেছিল। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকে আপসহীনভাবে তিনি সত্য প্রকাশ করেছেন। একসময় তদানীন্তন পাকিস্তান সামরিক সরকার দৈনিক ইত্তেফাকের প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়। সে সময় সরকারের সঙ্গে আপস করলে তিনি ইত্তেফাক প্রকাশনা অব্যাহত রাখতে পারতেন। কিন্তু তিনি এবং তার চেতনায় উদ্বুদ্ধ সাংবাদিক শ্রেণী জনমানুষের সংবাদপত্রের প্রতি যে বিশ্বাস তার সঙ্গে আপস করেননি। তিন বছর পত্রিকা প্রকাশ বন্ধ রেখেছিলেন। সামরিক জান্তা ও স্বৈরাচারী শাসকের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে নির্ভীক সাংবাদিকতার যে উদাহরণ তিনি সৃষ্টি করে গেছেন তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত।

তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ছিলেন উদার গণতন্ত্রের ধারক। একজন রাজনীতিমনস্ক সাংবাদিক হয়েও তার রাজনৈতিক কোন উচ্চাভিলাষ ছিল না, ছিল না ব্যক্তিগত কোন লোভ। এ কারণেই সত্ ও নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সত্য কথা বলার সাহস দেখাতে পারতেন। জেল-জুলুম, অত্যাচার, নিপীড়ন এবং সরকারের অসহযোগিতাকে মোকাবেলা করে, নীতির প্রশ্নে অবিচল থেকে তাকে মানুষের অধিকারের কথা বলতে হয়েছে।

তিনি যেমন বাংলা সাংবাদিকতা জগতে পথ প্রদর্শক, তেমনই রাজনীতিতেও। রাজনৈতিক জগতে তিনি ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভাবশিষ্য। ঘনিষ্ঠ ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক ছিল মানিক মিয়ার।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘আমার মানিক ভাই’ শিরোনামে এক লেখায় উল্লেখ করেছেন, ‘… আমার ব্যক্তিগত জীবনে মানিক ভাই’র প্রভাব যে কত গভীর, তা ভাষায় ব্যক্ত করার মত নয়। ১৯৪৩ সাল থেকে তাঁর সাথে আমার পরিচয়। সে পরিচয়ের পর থেকে সারাটা জীবন আমরা দু’ভাই একসাথে জনগণের অধিকার অর্জনের সংগ্রাম করেছি। … একটা বিষয়ে আমরা উভয়ই একমত ছিলাম এবং তা হল, বাংলার স্বাধীনতা। স্বাধীনতা ভিন্ন বাঙালির মুক্তি নেই, এ বিষয়ে আমাদের মাঝে কোন দ্বিধা-দ্বন্দ্বের অবকাশ ছিল না। আর ছিল না বলেই নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যেও দু’জন দু’ফ্রন্টে থেকে কাজ করেছি। আমি কাজ করেছি মাঠে-ময়দানে আর মানিক ভাই তার ক্ষুরধার লেখনীর সাহায্যে।’

শোষণ-বঞ্চনা, সাম্প্রদায়িকতা, রাষ্ট্রের স্বৈরাচারী আচরণের বিরুদ্ধে এবং গণতন্ত্রের পক্ষে তাঁর কলম ছিল সোচ্চার। পাকিস্তানী আমলে সমকালীন রাজনৈতিক ঘটনাবলীকে উপজীব্য করে তিনি যেসব ক্ষুরধার নিবন্ধ, কলাম লিখেছেন সেসব লেখনী আজকের বাংলাদেশেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। শুধু সাংবাদিক কিংবা রাজনীতির পথপ্রদর্শকই নন মানুষ হিসাবেই তিনি ছিলেন আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাঁর সংস্পর্শে যিনি একবার এসেছেন তিনি তার সম্মোহনী ব্যক্তিত্বের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন। তেমনি তার সহানুভূতিশীল হূদয় ও মানুষের প্রতি মমত্ববোধ আজো মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়।

সংক্ষিপ্ত জীবনী
তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার জন্ম ১৯১১ সালে পিরোজপুর জেলার ভাণ্ডারিয়া গ্রামে। তার বাবার নাম মুসলেম উদ্দিন মিয়া। শৈশবেই মানিক মিয়ার মা মারা যান। গ্রামের পূর্ব ভাণ্ডারিয়া মডেল প্রাইমারি স্কুলে মানিক মিয়ার শিক্ষা জীবনের শুরু। সেখানে কিছুদিন পড়ার পর তিনি ভর্তি হন ভাণ্ডারিয়া হাইস্কুলে। ভাণ্ডারিয়া স্কুলে মানিক মিয়া অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। তারপর চলে যান পিরোজপুর জেলা সরকারি হাইস্কুলে। সেখান থেকেই তিনি কৃতিত্বের সাথে এন্ট্রান্স পাস করেন। ১৯৩৫ সালে মানিক মিয়া ডিস্টিংশনসহ বরিশাল বিএম কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন। পড়াশোনা শেষ করে তিনি পিরোজপুর জেলা সিভিল কোর্টে চাকরি শুরু করেন। পিরোজপুর জেলা সিভিল কোর্টে কর্মরত থাকাবস্থায় ১৯৩৭ সালে ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা থানার অন্তর্গত গোয়ালদি গ্রামের অভিজাত পরিবারের খোন্দকার আবুল হাসান সাহেবের কন্যা মাজেদা বেগমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি।

মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দিনব্যাপী কর্মসূচি
দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক মরহুম তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দৈনিক ইত্তেফাকের পক্ষ থেকে আজ রোববার সকাল সাতটা থেকে মরহুমের আজিমপুর কবরস্থানের মাজারে কোরআনখানি ও বেলা ১০টায় মোনাজাতের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া দৈনিক ইত্তেফাকের কাজলারপাড়ের অফিসে সকাল আটটা থেকে কোরআনখানি ও বাদ জোহর মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।

আজ রোববার মরহুমের জ্যেষ্ঠ পুত্র ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন এতিমখানায় কাঙ্গালী ভোজের আয়োজন করেছেন। মরহুম মানিক মিয়ার কনিষ্ঠ পুত্র বন ও পরিবেশমন্ত্রী আনোয়ার হোসেনের ধানমন্ডির বাসভবনে কোরআনখানি ও এতিমখানায় তবারক বিতরণের আয়োজন করা হয়েছে। মরহুম তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার জ্যেষ্ঠা কন্যা মরহুমা আখতারুন্নাহার বেবীর বাসভবনে বাদ এশা মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। সূত্র: ইত্তেফাক