brazil-vs-germany

দৈনিক বার্তা – ব্রাজিল মানেই ফুটবল। ব্রাজিল মানে সমুদ্র সৈকতে বিকিনিখ্যাত সুন্দরীদের ভিড়। ব্রাজিল মানে নয়ন জুড়ানো সাম্বা। গোটা ফুটবল বিশ্বে জনপ্রিয়তায় ব্রাজিল সবার আগে। সঙ্গত কারণে ব্রাজিল না থাকা মানে পানসে ফাইনাল। এখন স্বপ্নের ফাইনালের অপেক্ষায় ফুটবল বিশ্ব। অপেক্ষায় ব্রাজিলিয়ানরাও। আর সেই অপেক্ষার সামনে প্রতিপক্ষ হয়ে বীরপুরুষ (!) এডলফ হিটলার দাঁড়িয়ে আছে ফুটবলের যমদূত হিসেবে। বেলো হরিজোন্তে স্টেডিয়ামে আজ (মঙ্গলবার) প্রথম সেমিফাইনালে আয়োজক ব্রাজিলের মোকাবেলা করবে হিটলারের দেশ জার্মানি।

আনন্দের এই ফল্গুধারায় ব্রাজিল ভক্তরা উৎকণ্ঠায় দলের প্রাণপ্রদীপ নেইমার নামক মহানায়কের ইনজুরি নিয়ে। সেমিফাইনালের আগে ব্রাজিল মহাফাঁপরে ডি সিলভাকে না পেয়ে। জার্মান শিবিরেও ইনজুরি সমস্যা রয়েছে। কিন্তু মানতেই হবে, ফাইনালে ওঠার পথ উভয় প্রতিপক্ষের জন্য খুবই কঠিন। এ লড়াইয়ে কে জিতবে, তার আগাম হিসাব টানা বোকামি।
বিশ্ব ফুটবলের কিংবদন্তি পেলে কী বলেছেন? আমেরিকা থেকে কোনোদিন বিশ্বকাপ নিতে পারেনি ইউরোপিয়ানরা। পেলে বলেছিলেন, এই যোগ্যতা শুধু এবারকার জার্মানির আছে। দেখতে দেখতে তো জার্মানি অনেক দূর চলে গেল। আর মাত্র দুই ধাপ। তাহলে কিন্তু পেলের ব্রাজিলকে সেমিতেই কাঁদতে হবে! আবার স্কলারি, জিকো, রোনালদোর কথাও সত্য হতে পারে। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা স্বপ্নের ফাইনালের সম্ভাবনাও দেখছেন তারা। বহু চড়াই উতরাই পেরিয়ে দুই লাতিন পরাশক্তি যে সেমিতে পেঁৗছে গেছে। জার্মানিকে ব্রাজিল, নেদারল্যান্ডসকে আর্জেন্টিনা হারাতে পারলেই হয় এখন। মেসি-নেইমার, বার্সেলোনার দুই বন্ধু, ফাইনালে পরস্পরকে হারাতে চেয়েছিলেন। বেচারা নেইমারের বিশ্বকাপটাই শেষ হয়ে গেল অনাকাঙ্ক্ষিত ইনজুরিতে পড়ে। কিন্তু ব্রাজিল তো আর শেষ হয়ে যায়নি।  যদিও সত্যিকারের ব্রাজিল এবং ০এবারকার ব্রাজিলের মধ্যে বিস্তর ফারাক। নিজেদের মাঠে তারা লড়াই করছে কেবল জেতার জন্য। এখানে ব্রাজিলীয় ঘারানার চিরাচরিত ছন্দ বলে কোনোকিছু নেই। তবে লুইস ফেলিপে স্কলারির দায়িত্ব নেয়ার পর অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে ব্রাজিলকে। অপ্রত্যাশিতভাবে ফিফা র‌্যাংকিংয়ে অনেক নিচে নেমে যাওয়া দলটির মধ্যে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন কনফেডারেশন্স কাপ জিতিয়ে। এতে স্কলারি আবারো প্রমাণ করেছেন, ফুটবলের বড়মাপের আসরে কাপ জেতানোর তকমাটা তার কত সমৃদ্ধ।

ব্রাজিল কোচের সবচেয়ে বড় গুণ প্রতিপক্ষ দেখে কৌশল নির্ধারণ করা। সর্বশেষ ২০০২ বিশ্বকাপ জেতানো স্কলারি ব্রাজিলিয়ানদের খুবই প্রিয় মানুষ। আর ‘হেক্সা’ জেতাতে পারলে তিনি হয়ে উঠবেন কিংবদন্তি। বিপক্ষ যেই হোক, ব্রাজিল খেললে স্টেডিয়ামে একটা অপরূপ আলোকবর্তিকা তৈরি হয়। ২০০২ সালে পঞ্চম শিরোপা জেতা ব্রাজিল পরপর দুই আসরে বিদায় নিয়েছে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে। এবার ঘরের মাঠে শেষ চারে জায়গা করে নিয়েছে সেলেকাওরা। তাদের লক্ষ্য ৬৪ বছর আগে ঘরের মাঠে ফাইনালে উঠেও হেরে যাওয়ার ট্র্যাজেডি ভুলিয়ে দেয়া। প্রতিপক্ষ জার্মানি এ নিয়ে টানা চতুর্থবার সেমিফাইনালে। জাপান-কোরিয়া বিশ্বকাপের ফাইনালে এই ব্রাজিলের কাছে হেরেই চতুর্থ শিরোপা জয়ের স্বপ্ন চুরমার হয়েছিল তাদের। এবার সেই ব্রাজিলকে প্রতিশোধের আগুনে পুড়িয়ে মারাকানার টিকিট পেতে মরিয়া ক্লোসা-মুলাররা। গ্রুপপর্বে ক্রোয়েশিয়া এবং ক্যামেরুনকে হারিয়ে আর মেক্সিকোর সঙ্গে ড্র করে নকআউটে ওঠে ব্রাজিল। প্রি-কোয়ার্টারে চিলি এবং কোয়ার্টার ফাইনালে কলম্বিয়াকে হারিয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে স্বাগতিকরা। অপরদিকে, পর্তুগাল ও যুক্তরাষ্ট্রকে হারিয়ে এবং ঘানার সঙ্গে ড্র করে ব্রাজিলের মতোই দ্বিতীয় পর্বে জায়গা করে নিয়েছে জার্মানি গ্রুপসেরার মর্যাদা নিয়ে। দুই নকআউটের প্রথমটিতে আলজেরিয়া এবং দ্বিতীয় ম্যাচে সমৃদ্ধ ফ্রান্সকে উড়িয়ে দিয়ে সেমিফাইনালে জার্মানি।

দ্বিতীয় পর্ব শেষে যেসব রেকর্ডের সামনে দাঁড়িয়েছিল বিশ্বকাপ, তার একটি হয়ে গেছে কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার জয়ে। এই প্রথম বিশ্বকাপে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা দুই দল সেমিফাইনালে। আছে ইউরোপের জার্মানি এবং নেদারল্যান্ডস। ইংল্যান্ড, স্পেন, ইতালির বিদায়ের পর ‘বিশ্বকাপ শেষ’ বলে গলা ফাটিয়েছিলেন কেউ কেউ। বিশ্বকাপ শেষ হয়নি। বরং বিশ্বকাপ তার ঝুলিতে লুকিয়ে রাখা আকর্ষণই বের করছে একটি একটি করে। তিন সাবেক চ্যাম্পিয়নের সঙ্গে তিনবারের রানার্সআপ সেরা চার দলই তো শিরোপার লড়াইয়ে। এ বিশ্বকাপ যে ‘স্বপ্নের ফাইনালের’ স্বপ্ন দেখানো আর লাতিন-ইউরোপ মহারণের। লাতিন থেকে প্রথম ট্রফি নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও যে আছে ইউরোপের কোনো দেশের। আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলকে ছাড়া বিশ্বকাপের ফাইনাল কল্পনা করা যায়? কিন্তু ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ছিটকে গেলে ফাইনালের লড়াইটা কি দ্রুপদী ফুটবল, রূপের সৌন্দর্যে বিমোহিত করতে পারবে ফুটবল বিশ্বকে? সত্যিকারের হিসাব হচ্ছে, মোটেই না। বাদ পড়া মানে বিশ্বজুড়ে উচ্ছ্বাসের পরিবর্তে কেবলই শোকের মাতম।