বন্যায় বিপর্যস্ত জনজীবন : দূর্গতদের পাশে কেউ নেই

0
236

Flood-affected local residents move to safer places on a boat after heavy rains at Jajimukh village

দৈনিকবার্তা -নিউজ : টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন জেলার বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে৷ যমুনা, তিস্তা ও ঘাঘট নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে৷ পানি বৃদ্ধির কারণে নদী ভাঙন ও নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে৷তলিয়ে গেছে আমন, আউশ, বীজতলা এবং শাকসবজি ও ফসলের ক্ষেত৷ বন্যা প্লাবিত এলাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানি ও খাদ্যের অভাবে পানিবন্দী মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছে৷ অনেক পরিবার ঘর ছেড়ে উঁচু মাচা ও কলা গাছের ভেলায় অবস্থান করছে৷ এখন পর্যন্ত অনেক স্থানে কোনো ত্রাণসামগ্রী পৌঁছেনি৷

দুর্ভোগের পাশাপাশি দুর্গত এলাকায় চলছে ত্রাণের জন্য হাহাকার৷এ অবস্থায় খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে বানভাসীদের৷ আগামী ৭২ ঘন্টায় লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী,রংপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, জামালপুর, টাঙ্গাইল, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, মুন্সীগঞ্জ, রাজবাড়ী ও ফরিদপুর জেলার বন্যা পরিস্থিতির সামান্য অবনতি হতে পারে৷জামালপুরে বন্যার চরম অবনতি হয়ে ২লৰাধীক মানুষ পানি বন্দি৷

জামালপুর প্রতিনিধি জানান: জামালপুর জেলার সার্বিক বন্যার পরিস্থিতি আরো অবনতি ঘটেছে৷ জেলার ৭টি উপজেলায় প্রায় ২লক্ষাধীক মানুষ পানি বন্দি হয়ে পড়েছে৷ এদিকে গত ২৪ঘন্টায় যমুনার বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে ২৩ সেন্টি মিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদ সীমার ৬৫সেন্টি মিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে৷ যমুনার পানি প্রতি ঘান্টায় বৃদ্ধি পাওয়া ফলে পানির তোড়ে মেলান্দহ উপজেলার মুহমুদপুর সড়ক ভেঙ্গে মেলান্দহ-মুহমুদপুর সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে৷ ইসলামপুর উপজেলার ইসলামপুর শিংভাঙ্গা সড়ক এবং ইসলামপুর- গুঠাইল সড়ক বন্যার পানিতে তালিয়ে উপজেলার সদরের সাথে যোগাযোগ বিছিন্ন হয়ে পড়েছে৷ গত ২৮আগষ্ঠ বৃগস্পতিবার বিকাল ৩টা নাগাদ যমুনার পানি বিপদ সীমার ৬৫ সেন্টি মিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল বলে পাউবো সুত্রে জানাগেছে৷ পানিবৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জেলার দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর, মেলান্দহ, মাদারগঞ্জ, সরিষাবাড়ী, বকসিগঞ্জসহ জামালপুর সদর উপজেলার বন্যার পানিতে তলিয়েগেছে৷ বিশেষ করে যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকা দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা চুকাইবাড়ী, চিকাজানী,বাহাদুনাবাদ ,ইসলামপুর উপজেলার পার্থশর্ী কুলকান্দি, বেলগাছা, চিনাডুলী, নোয়ারপাড়া, ইসলামপুর সদর, পলবান্দা, ইসলামপুর পৌরসভা, গোয়ালের চর, গাইবান্দা, চরগোয়ালীনী ও চরপুটিমারী ইউনিয়ন৷ মেলান্দহ উপজেলার, শ্যামপুর, মাহমুদপুর,াদ্রা, নাংলা, ফুলকোচা, ঝাউগড়া, ও ঘোষেরপাড়া ইউনিয়ন৷ মাদারগঞ্জ উপজেলার গুনারীতলা জোড়খালী, বালিজুড়ি ও চর পাকেরদহ ইউনিয়ন৷ সরিষাবাড়ী উপজেলার পিংনা, আওনা, পোগলদিঘা, সাতপোয়া,ও কামরাবাদ ইউনিয়ন৷ বকশিগঞ্জ উপজেলার সাদুরপাড়া, মেরম্নরচর,বগারচর,ও নিলিক্ষিয়া ইউনিয়ন, জামালপুর সদর উপজেলার লক্ষীরচর, ইউনিয়ন বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে৷

এসব এলাকায় নতুন করে প্ল্লাবিত হয়ে প্রায় ২ লক্ষাধীক মানুষ পানি বন্দি হয়ে পড়েছে৷ হাজার হাজার হেক্টর ফসলী জমি বন্যার পানিতে তলিয়ে বিনষ্ট হচ্ছে৷ এ সকল এলাকা মানুষসহ গৃহপালিত পশু , গরু, ছাগল হাঁস, মরগি পানি বন্দি হয়ে পড়েছে৷ বন্যা কবলিত মানুষ উচু বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে৷ আবার যমুনার দুর্ঘম দ্বীপচর হরিণধরা,জিগাতলা, চরবেড়কুশা,বরুল, মুনি্নয়া, সিন্দুরতলি, চরচেঙ্গানিয়া, প্রজাপতি, চরশিশুয়া ও চর বিশরশির এলাকায় মানুষের খাদ্য বিশুদ্ধ পানি চরম সংকট দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন চিনাড়ুলি ইউপির চেয়ারম্যান আব্দুস ছালাম ও সাপধুরি ইউপির চেয়ারম্যান সুরম্নজ মন্ডল৷  এদিকে মানুষের খাদ্যের পাশাপাশি গো খাদ্যে চরম সংকট দেখা দিয়েছে৷ এব্যাপারে জামালপুর -২ ইসলামপুর আসনের স্থানীয় এমপি আলহাজ ফরিদুল হক খান দুলাল জরম্নরী ভিক্তিতে মাননীয় ত্রান ও পুর্নবাসন মন্ত্রী হসত্মক্ষেপ কামনা করেছেন৷ অপর দিকে জামালপুরের জেলা প্রশাসক শাহাবউদ্দিন খান জানান এ রিপের্ট লিখা পর্যনত্ম বন্যা কবলিত এলাকা দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর ও সরিষাবাড়ি ৩ উপজেলায় ৩৩মেঃ টন চাল এবং ৫ লাখ টাকা শুকনো খাবার (চিড়া-গুড়) বিতরণ করেছেন বলে জানান৷এদিকে বন্যা দুর্গতরা জানায় এসব ত্রান বিতরনী তোলনা অনুযায়ী খুবই অপ্রতুল্য বলে অভিযোগ করেছেন তারা৷

নীলফামারী : উজানের ঢলে তিস্তা রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছে৷ ফলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে৷ এতে করে তিস্তাপাড়ের বসবাসরত পরিবারগুলোর নির্ঘুম রাত কাটছে৷ সর্তর্কতা জারি করার ফলে সেখানকার মানুষ আরও আতংকিত হয়ে পড়েছে৷ চর দ্বীপচর ও তিস্তাপাড়ের ডান ও বাম তীর বাঁধের ভেতর বসবাসরত পরিবারগুলো ঘরবাড়ি ছেড়ে গরু-ছাগল, হাঁস- মুরগি নিয়ে বাঁধ ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছে৷ তবে উজানের ঢল অব্যাহত থাকায় সতর্কতা অব্যাহত রাখা হয়েছে তিস্তায়৷ জেলার ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলার ১৮ হাজার পরিবার নতুনভাবে বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে৷ গ্রাম, পথঘাট সব লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়ায় চলাচলে মানুষজনকে কলার ভেলা বা ডিঙ্গি নৌকার উপর নির্ভর করতে হচ্ছে৷ ডিমলা উপজেলার টেপাখড়িবাড়ির ডানতীরে স্বপন বাঁধে প্রবল স্রোত আঘাত হানছে৷ এলাকার লোকজন পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহযোহিতায় বালির বস্তা, বাঁশ ও কাঠের গুড়ি ফেলে বাঁধ রক্ষায় চেষ্টা করে তা রক্ষা করতে সক্ষম হয়৷

বাঁধটি বিধ্বস্ত হলে তিস্তার প্রধান বাঁধ হুমকির মুখে পড়ে তিস্তা গতিপথ পরিবর্তন করে বসতো৷ বানভাসী লোকেরা চরম দুর্ভোগে পড়েছে৷ এদিকে রেড ক্রিসেন্ট নীলফামারী ইউনিট বুধবার ডালিয়া তিস্তা কলেজ প্রাঙ্গণে ১৭০টি বানভাসী পরিবারকে ৫ কেজি চাল, হাফ কেজি ডাল, ১ লিটার সয়াবিন তেল, ১ কেজি চিড়াসহ হাফ কেজি গুড়, মোমবাতি ও লাইটার বিতরণ করেন৷ নীলফামারী-১ আসনের সংসদ সদস্য আফতাব উদ্দিন সরকার ও জেলা রেড ক্রিসেন্টর সাধারণ সম্পাদক ডা. ঘাবিবুর রহমান হাবিব উপস্থিত থেকে দুর্গতদের মাঝে এসব বিতরণ করেন৷ জেলা প্রশাসক জাকীর হোসেন জানান, তিস্তা নদীর বন্যায় ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে প্রাথমিকভাবে দেড়শত মেট্রিক টন চাল ও নগদ তিন লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে৷ এই বরাদ্দের মধ্যে দুই দফায় ডিমলা উপজেলায় ২৫ মেট্রিক টন চাল নগদ ৪০ হাজার টাকা, জলঢাকা উপজেলায় ১০ মেট্রিক টন চাল ও ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে৷

গাইবান্ধা: পানি বৃদ্ধি পেয়ে ব্রহ্মপুত্রে বিপদসীমা অতিক্রম করে আরো নতুন এলাকা পস্নাবিত হওয়ায় জেলার চরসমূহ ও বৃহ্মপুত্র অববাহিকায় বন্যা পরিস্থিতির সার্বিক অবনতি হয়েছে৷  পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, ব্রহ্মপুত্রে ২৭ সেন্টিমিটার, তিসত্মায় ৩০ সেন্টিমিটার, করতোয়ায় ৩২ সেন্টিমিটার এবং ঘাগটে ৩২ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে৷  উজান থেকে পাহাড়ী ঢল ও বৃষ্টির কারনে এই পানি প্রবাহ বেড়েছে৷ যদিও জেলার ব্রহ্মপুত্রের ফুলছড়ি ঘাট পয়েন্ট বিপদসীমার ১৪ সেন্টিমিটার, ঘাগটের জেলা শহরের নিউব্রিজ পয়েন্টে ৫০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে৷এ ছাড়া সুন্দরগঞ্জ পয়েন্টে তিসত্মায় সুন্দরগঞ্জ পয়েন্টে ৫৫ সেন্টিমিটার এবং গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা শহরের কাছে কাটাখালি ব্রিজ পয়েন্টে করতোয়ায় বিপদসীমার ২৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে৷

বৃহ্মপুত্রে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ও চন্ডিপুর ইউনিয়ন, সদর উপজেলার মোল্লারচর ইউনিয়ন, ফুলছড়ি উপজেলার ফজলুপুর, এরেন্দাবাড়ী, গজারিয়া, ফুলছড়ি ও উড়িয়া ইউনিয়নস, সাঘাটা উপজেলার হলদিয়া ও সাঘাটা ইউনিয়নের সোয়া দুই লাখের বেশী মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে৷  এতে শস্যা বিশেষ করে আমন বীজতলা আউস, রোপা আমন, গ্রীষ্মকালীন সবজি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে৷জেলা প্রশাসক এম আহসান-ই এলাহী বাসসকে বলেন, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় বন্যায় ক্ষতিগ্রসত্মদের মাঝে বিতরণের জন্য মোট ৫শ’ টন চাল, ১১ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে৷ এদিকে,গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক এহছানে এলাহী গতকাল সাঘাটার হলদিয়া ইউনিয়নের চরাঞ্চলে বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন ও ১ হাজার পরিবারের মাঝে ২০ কেজি করে ২০মে. টন চাউল ও নগদ ২৫ হাজার টাকা বিতরন করেছে৷ তার পরেও ত্রানের জন্য বানভাসি মানুষের মাঝে হাহাকার দেখা গেছে৷ এসময় তার সাথে ছিলেন, সাঘাটা উপজেলা চেয়ারম্যান এ্যাড গোলাম শহীদ রঞ্জু, উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ আব্দুল আউয়াল, ভাইস চেয়ারম্যান মমিতুর রহমান নয়ন, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ও সাঘাটা থানার অফিসার ইনচার্জ রফিকুল ইসলাম, ত্রাণ ও প্রকল্প বাসত্মবায়ন অফিসার বাবুল চন্দ্র রায়, হলদিয়া চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম মন্ডলসহ অনেকে৷  ত্রাণের অপ্রতুলতার প্রশ্নে জেলা প্রশাসক জানান, পর্যাপ্ত পরিমাণে ত্রাণ রয়েছে৷ একটি পরিবারকেও না খেয়ে থাকতে হবেনা৷ আমরা সার্বৰনিক তাদের সেবা দিয়ে যাচ্ছি যাবো৷ভুক্তভোগিরা জানায় বাড়িতে বানের পানি উঠায় রান্না করে খেতে খুব কষ্ট হচ্ছে৷ সে কারনে কোমলমতি শিশুদের যথা সময়ে খেতে দিতে পারেনা৷ আরো অভিযোগ করেন মেম্বররা রিলিফের চালের টোকন তাদের নিজেদের লোকের মাঝে বিতরন করে৷ ফলে এখনো অনেক পরিবার রিলিফ পায়নি৷ জেলা প্রশাসকের সামনেই ইউপি সদস্যগণ তাদের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেন, চাহিদা অনুযায়ী রিলিফ না পাওয়ায় পর্যায়ক্রমে বিতরন করা হচ্ছে৷ জেলা প্রশাসকসহ তারা আশ্বাস দেন সবাই রিলিফ পাবেন৷  চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম মন্ডল জানান, বন্যায় তার এলাকার ৫ হাজার ৫শ পরিবার বন্যায় পস্নাবিত হয়ে ৰতিগ্রসত্ম হয়েছে৷ তাদের মাঝে ২হাজার ৭শ পরিবারকে কমবেশি রিলিফ দেয়া হয়েছে৷

কলাপাড়া: বুক সমান পানি৷ বাবা রফিক মীরের কোলে নিজে এবং মা রেবেকার হাতে পলিথিনে মোড়ানো বইগুলো৷ এভাবেই বুক সমান পানি পেরিয়ে প্রতিদিন স্কুলে আসা-যাওয়া করছে শিশু শিক্ষাথর্ী কেয়া৷ প্রথম শ্রেণীর শিক্ষাথর্ী সে৷ সকাল থেকে দুপুর পর্যনত্ম রেবেকাকে এ সনত্মানের স্কুলে আসা যাওয়ার জন্য সময় দিতে হয়৷ একই দশা দ্বিতীয় শ্রেণীর চাঁদনীর৷ কখনও মায়ের কোলে, আবার কখনও সাতরে স্কুলে আসতে হয়৷ চতুর্থ শ্রেণীর সানাহউলস্নাহ জানায়, সাতার কেটে স্কুল পর্যনত্ম এসে ভেজা লুঙ্গি পাল্টে তাকে ক্লাশে আসতে হয়৷ প্রতিদিন দু’টি লুঙ্গি নিয়ে আসে সানাহউলস্নাহ৷ এভাবেই চারিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তিন শতাধিক শিশু শিক্ষাথর্ীকে এখন স্কুলে আসা-যাওয়া করতে হয়৷ স্কুল টাইমে জোয়ার থাকলে এদের সবাইকে বাবা-মায়ের কোলে, নৌকায়, কলার ভেলায় কিংবা সাতরে স্কুলে আসতে হয়৷ প্রায় আড়াই মাস এমন দুরাবস্থা চলছে৷ জীবন-জীবিকার তো চরম বেহাল দশা৷ সংলগ্ন রামনাবাদ নদীতে মাছ পড়ে না৷ কৃষিকাজ নেই, তাই কামলাও দেয়ার সুযোগ নেই৷ লালুয়ার রামনাবাদ নদীর অস্বাভাবিক জোয়ারে বেড়িবাঁধ বিধ্বসত্ম হওয়ার পর থেকে অনত্মত দেড় হাজার পরিবারের এমন দুর্ভোগ এখন দুর্যোগে পরিণত হয়েছে৷ এদের সনত্মানদেও লেখাপড়া বন্ধের উপক্রম হয়েছে৷

হাইলা-কামলা কিংবা জেলে ও জেলে শ্রমিক হিসাবে জীবন-জীবিকা চালানো এ মানুষগুলো এখন সনত্মানদের বাধ্যতামুলক প্রাথমিক শিৰা শেখানোর সুযোগও হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে৷ ১২ জুলাই অস্বাভাবিক জোয়ারের তান্ডবে চারিপাড়া গ্রামের রিংবেড়িবাঁধটি ভেসে যায়৷ এরপর থেকে প্রতিদিন দুই দফা জোয়ারের পস্নাবনে বাড়িঘর রাসত্মাঘাট ডুবে যায়৷ বাড়িঘর বিল সব কোমর থেকে গলা সমান পানিতে ডুবে যায়৷ বসবাসের ঘর কাদামাটিতে একাকার থাকে৷ জীবন-জীবিকা গেছে বিপর্যসত্ম হয়ে৷ পানিবন্দীদশা চারিপাড়া, চৌধুরীপাড়া, নয়াকাটা, বানাতিপাড়া গ্রামের আংশিক এলাকার শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহনের একমাত্র স্কুল চারিপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়৷ কিন্তু বাঁধ বিধ্বসত্ম হওয়ার পর থেকে কোমলমতি শিশুদের লেখাপড়া ভেঙ্গে পড়েছে৷ স্কুলে উপস্থিতি কমে গেছে এক তৃতীয়াংশ৷ বৃহস্পতিবার দুপুরে গিয়ে দেখা গেছে, পঞ্চম শ্রেণীর ৫০ জনের ০৩ জন, চতুর্থ শ্রেণীর ৪৮ জনের ৬ জন, তৃতীয় শ্রেণীর ৪৯ জনের ৪জন, দ্বিতীয় শ্রেণীর ৬৭ জনের ১৭জন, প্রথম শ্রেণীর ৭৮ জনের ১২ জন এবং শিশু শ্রেণীর ৭০ জনের ১৫ জন স্কুলে আসেনি৷ প্রধান শিৰক জহিরম্নল ইসলাম আশ্বর্েদ জানালেন, দ্বিতীয় সাময়িক পরীৰায় ৩৬২ শিৰাথর্ীর মধ্যে ৬১ জন পরীৰায় পর্যনত্ম অংশ গ্রহণ করতে পারে নি৷ ছোট্ট ছোট্ট ছেলে-মেয়েরা জোয়ারের সময় স্কুলে আসতে পারে না৷ এমনকি রাসত্মাঘাট ভেঙ্গে বেহালদশা হওয়ায় সাঁকো পার হতে না পারায় বহু শিশু রীতিমতো স্কুলে আসতে পারছে না৷ তবে যেদিন স্কুল আসা এবং ছুটির সময় ভাটা থাকে সেদিন উপস্থিতি কিছুটা বাড়ে৷ কুলসুম মোশারফ দম্পতি জানালেন, সাত জনের সংসাওে কামাই রোজগার নেই৷ সনত্মানদেও পেটে দু’বেলা খাবারের যোগান দিতে পারি না৷ যেদিন চাল জোটে তা আবার রান্না করতে হয় মাচার ওপরে৷ লেখাপড়া কী ভাবে করাবেন তা নিয়ে এরা পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেন৷ গ্রামের ৰুদে দোকানি আনিছ খান জানালেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে তাদেও এলাকার প্রায় চার শ’ শিশুর লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে৷ ক্ষব্ধ আনিছ খান জানালেন, তাদের এ সমস্যা সমাধানে জনপ্রতিনিধি থেকে উপজেলা কিংবা জেলা প্রশাসনের কেউ আজ পর্যনত্ম পরিদর্শনে আসেনি৷

লালমনিরহাট ঃলালমনিরহাটে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে তিসত্মা নদীর পানি কমতে শুরম্ন করেছে৷ ফলে নদীর ভাঙ্গন বেড়ে গেছে কয়েকগুন ৷ জেলার পাটগ্রাম উপজেলার বহুল আলোচিত আঙ্গোরপোতা দহগ্রাম ছিটমহলসহ হাতীবান্ধা উপজেলার ১৪ টি, কালীগঞ্চ উপজেলার ৭ টি, আদিতমারী উপজেলার ৩ টি ও সদর উপজেলার ১৩ টি গ্রামে ব্যাপক হারে ভাঙ্গন দেয়া দিয়েছে৷  গত ২৪ ঘন্টায় ওই এলাকার ৩ শতাধিক বসত-বাড়িসহ হাজার হাজার হেক্টর আবাদী জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে৷ নদী ভাঙ্গনের শিকার পরিবার গুলো বিভিন্ন শিৰা প্রতিষ্টানের খেলার মাঠ ও রাসত্মায় আশ্রয় নিয়ে মানবতার সাথে জীবন যাপন করছে৷ জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পৰ থেকে নদী ভাঙ্গনের শিকার পরিবার গুলোর তালিকা তৈরী করা হলেও এখন পর্যনত্ম তাদের পুর্ণবাসনের কোন ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়নি৷ গত ২ দিন ধরে তাদের মাঝে ১০ কেজি করে চাল ছাড়া আর কোন ত্রাণ বিতরণ করতে দেখা যায়নি৷ ফলে তাদের মাঝে খাবার সংকটসহ ৰোভ দেখা দিয়েছে৷  কয়েকজন ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা প্রতিনিয়ন বন্যা ও নদীর ভাঙ্গনের বিষয়টি উপজেলা চেয়ারম্যান ও স্থানীয় সংসদ সদস্যদের অবগত করলেও এখন পর্যনত্ম ভাঙ্গন রোধে তেমন কোন ব্যবস্থা গ্রহন করা হচ্ছে না৷  লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান জানান, পানি বন্দি লোকজনের মাঝে ত্রাণ বিতরণ চলছে৷ এছাড়া নদী ভাঙ্গনের শিকার পরিবার গুলোর পুর্ণবাসনের ব্যবস্থা গ্রহনসহ ভাঙ্গন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করেছে৷ মেঘনার পেটে চর মাদ্রাজ / মেঘনায় খেয়েছে চরমাদ্রাজ

ভোলা: চরফ্যাশন উপজেলার চর মাদ্রাজ ইউনিয়নের হামিদপুর গ্রামের স্লুইজ খাল এবং মেঘনার মিলনস্থলের নতুন স্লুইজ বাজারের ১৪টি দোকান চোখের পলকে স্রোতের গভীরে মেঘনার পেটে হারিয়ে গেছে৷ চর মাদ্রাজ ইউনিয়নের সাড়ে ৪ কিলোমিটার বেড়ীবাধ না থাকায় এবং মেঘনার তীব্র ভাঙ্গনের কবলে পড়ে মোহাম্মদপুর, হামিদপুর, ও চর নিউটন মৌজার বাসিন্দারা আতংকে দিন কাটাচ্ছেন৷ বিগত সপ্তাহে প্রবল স্্েরাতের তোড়ে চর মাদ্রাজ ইউনিয়নের এক তৃতীয়াংশ সামরাজ মত্‍স্য ঘাট, বরফকল, ফসলি জমি, বসতিবাড়ী , মসজিদ, স্থায়ী স্থাপণা সহ নদীর পেটে বিলীন হয়েছে বলে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জসিমউদ্দিন সরমান জানিয়েছেন৷ এছাড়া চলতি বর্ষা মৌসুমে মোট জনবসতির ১৪ আনা অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে৷ ভাঙ্গনের তীব্রতা চলমান থাকলে ৩০ আশ্বিন পযনত্ম চর মাদ্রাজ ইউনিয়ন মূল ভূ খন্ড থেকে হারিয়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে বলেও তিনি দাবী করেন৷ আকষ্মিক এই বিপর্যয়ে কোন প্রাণহানীর ঘটনা না ঘটলেও আতংকে রয়েছেন ইউনিয়নের বাসিন্দারা ৷  নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়া বাজার ব্যবসায়ি সমিতির সহ সভাপতি শাহাদাত্‍ হোসেন আখন জানান, রাত সাড়ে ন’টার দিকে হঠাত্‍ করে বাজারের একটা অংশ নীচের দিকে দেবে যায়৷ কিছু বুঝে উঠার আগেই স্রোতের গভীরে মেঘনার পেটে হারিয়ে গেছে স্থানীয় ২নং ওয়ার্ড আওয়ামীলীগ সাধারন সম্পাদক শাহাদাত্‍ হোসেন আখন, শিক্ষক রফিকুল ইসলাম, সিরাজ রাঢ়ী, মোসত্মফা রাঢ়ী, আব্দুল লতিফ,মিন্টু মিয়া, ইদ্রিস দিদার, নোমান খান এবং ছমেদ সর্দারের ৮টি মুদি দোকান, রফিকুল ইসলামের একটি ইলিশ মাছের আড়ত্‍, আব্দুল কাদের এবং রমিজ তালুকদারের দু’টি কাঁচা মালের দোকান, জীবন দাসের একটি সেলুন এবং তোতা রাঢ়ীর চা দোকান৷ ঘটনার আকষ্মিকতায় ব্যবসায়ীরা তাড়াহুড়ো করে নিজেদের জীবন বাচাঁতে পারলেও দোকানের কোন মালামাল রক্ষা করতে পারেননি৷ ক্ষতিগ্রস্থ ব্যবসায়ী শাহাদত্‍ হোসেন আখন জানান,গত ১২ জুলাই তার মুদি দোকান প্রথম মেঘনার আকষ্মিক ভাঙ্গনে হারিয়ে যায়৷ দ্বিতীয় দফায় মঙ্গলবার রাতে তার দোকানটি প্রায় আড়াই লাখ টাকার মালামালসহ মেঘনার পেটে গেছে৷ একই রাতে প্রায় দেড় লাখ টাকার মজুতকৃত ইলিশ মাছসহ ডুবে গেছে রফিকুল ইসলামের আড়ত্‍৷

এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন কালে দেখা গেছে, বাজারের আরো কমপক্ষে ২৭টি দোকান ভাঙ্গনের তোপের মুখে পড়েছে৷ দোকানগুলোর মধ্যে ১২টি মুদি,৩টি চা,২টি কাপড়,৪টি ফার্মেসী,২টি কম্পিউটার, ২টি সেলুন এবং একটি করে পার্স ও কাঠের দোকান রয়েছে৷ মঙ্গলবার রাতের বিপর্যয়ের পর থেকে তোপের মুখে থাকা ব্যবসায়িরা দোকানগুলো ভেঙ্গে সরিয়ে নিতে শুরু করেছেন৷ইতিপুর্বে চরমাদ্রাজের ৩টি মৌজার ভাঙ্গন কবলিত এলাকায় সরকারী সাহায্যের পাশাপাশি, গ্রামীণফোন , কোষ্টট্রাষ্ট আর্থিক অনুদান প্রদান করেছেন ৷

চরফ্যাশন প্রতিনিধি: মেঘনা নদীর চর কচ্ছপিয়া, ডুবাচর, চর বিশ্বাস, মেম্বারেরচর, পশ্চিম মানিকার চর এলাকায় দক্ষিণ জোন কোষ্টগার্ড চরমানিকা আউটপোষ্ট কমান্ডার, পেটি অফিসার তরিকুল ইসলামের নেতর্ৃত্বে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১২টা পযনত্ম অভিযান চালিয়ে অবৈধ ঘোষিত ৫০ হাজার মিটার কারেন্ট জাল ও ৭০ হাজার মিটার চর ঘেরা জাল আটক করে আগুনে পুড়িয়ে ভস্মিভুত করেছে বলে জানিয়েছেন৷

সিরাজগঞ্জ: জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে৷সকালে সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে যমুনার পানি বিপদসীমার ২৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিলো৷পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, গত ২৪ ঘন্টায় সিরাজগঞ্জে যমুনার পানি ১৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে৷জেলার কাজিপুর, সিরাজগঞ্জ সদর, বেলকুচি, শাহজাদপুর ও চৌহালী উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ বন্যায় পানিবন্দী হয়ে পড়েছে৷ জেলার অনেক স্থানে বিশুদ্ধ খাবার পানির অভাবে ডায়রিয়া ও আমাশয়সহ পেটের পীড়া শুরু হয়েছে৷ বন্যা কবলিত মানুষের হাত ও পায়ের ঘাসহ চুলকানি দেখা দিয়েছে৷ জেলায় অনত্মত ১০ হাজার হেক্টর জমির ফসল এখন পানির নিচে৷ জেলা প্রশাসক বিলস্নাল হোসেন জানান, জেলার বন্যা কবলিতদের মধ্যে এ পর্যনত্ম ২৫০ মেট্রিক টন চাল এবং নগদ ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে৷

মুন্সীগঞ্জ থেকে জানান, জেলার বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে৷ভাগ্যকুল পয়েন্টে পদ্মার পানি এক সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়ে আজ সকাল ৯টায় বিপদসীমার ১৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হ”িছলো৷  জেলার শ্রীনগর, লৌহজং, টঙ্গিবাড়ী ও সদর উপজেলার নিম্নাঞ্চল পস্নাবিত হয়েছে৷ বন্যায় জেলায় প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে৷ ফসলি জমি তলিয়ে গেছে৷লৌহজং উপজেলার কুমারভোগ ও টঙ্গিবাড়ী উপজেলার কামারখাড়ায় পদ্মার ভাঙ্গন ব্যাপক আকার ধারণ করেছে৷ ভাঙ্গনের কারণে টঙ্গিবাড়ী উপজেলার কামারখাড়া বড়াইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিৰা কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে৷জেলা প্রশাসক জানান, বন্যায় পস্নাবিত গ্রামগুলোতে মেডিকেল টিম কাজ করছে৷ বন্যার্তদের জন্য সরকারিভাবে একশ’ টন চাল বরাদ্দ করা হয়েছে৷

সুনামগঞ্জ থেকে জানান, সুনামগঞ্জের সুরমা নদীতে পানি হ্রাস পাওয়ার জেলার সদর উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হয়েছে৷ তবে অপর ৭টি উপজেলায় বন্যা পরিস’িতির অবনতি হয়েছে৷ বন্যা কবলিত নিম্নাঞ্চলে প্রায় ১৭ হাজার ১৫০ পরিবার পানিবন্দী হয়েছে৷ বন্যায় ৮৬ হাজার ৭৫০ জন মানুষ ক্ষতিগ্রসত্ম হয়েছেন৷জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ হিসেবে ১৮২ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে৷কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানায়, বন্যায় জেলায় ১৬ হাজার ৫০২ হেক্টর জমির আমন ধান ক্ষতিগ্রসত্ম হয়েছে৷ এর মধ্যে এক হাজার ৭৮৭ হেক্টর জমির রোপা আমনের বীজতলা ক্ষতিগ্রসত্ম হয়েছে৷ সুনামগঞ্জে নতুন করে জেলার নিম্নাঞ্চলের ১৭ হাজার ১৫০ পরিবার এখনও পানি বন্দি