বনানী হত্যাকাণ্ডের জট খুলছে

53

হত্যাকাণ্ড

দৈনিকবার্তা-ঢাকা : নিজের ও স্বজনের নিরাপত্তায় রাখা অত্যাধুনিক দামি বিদেশি পিস্তলটি দিয়েই শেষ পর্যন্ত নিজের স্ত্রীকে গুলি করে হত্যার পর নিজে আত্মহত্যা করেন আফসার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শিল্পপতি আবদুর রব। হত্যা ও আত্মহত্যার ঘটনায় ব্যবহৃত পয়েন্ট ৩২ বোরের ৭৫৬৫ এমএম মডেলের অত্যাধুনিক পিস্তলটি ছিলো ইতালির তৈরি। ঘটনার পরপরই ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পুলিশ সাত রাউন্ড গুলিসহ অস্ত্রটি জব্দ করেছে।

এদিকে এ হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে পুলিশ। নিহত দম্পতির ছেলে ও স্বজনরা পুলিশকে জানিয়েছেন, ব্যবসায়িক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় হতাশ ছিলেন আব্দুর রব। এরই মধ্যে একটি জমি বিক্রি নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে মারাত্মক দ্বন্দ্ব ও কলহ ঘটে তার। স্বজনদের ধারণা, জমি বিক্রিতে সম্মত না হওয়াতেই প্রচণ্ড ক্ষোভে স্ত্রী রোকসানা পারভীনকে পরপর চারবার গুলি করেন আব্দুর রব। স্ত্রীর মৃত্যু হওয়ার পর তিনি নিজেও মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে আত্মহত্যা করেন।

বনানীর ডিওএইচএসের ৫ নম্বর রোডের ৬০/এ নম্বর বাড়ির চার/এ নম্বর ফ্ল্যাটের বাসিন্দা শিল্পপতি দম্পতি নিহতের ঘটনায় ক্যান্টনমেন্ট থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেছেন নিহতের ছেলে নাফিস আহমেদ নাইম। মামলাটির তদন্ত করছেন ওই থানায় কর্মরত এসআই সাখাওয়াত হোসেন। আবদুর রব ও তার স্ত্রীর লাশের সুরতহাল প্রতিবেদনও তৈরি করেন তিনি।

দৈনিকবার্তা কে এসআই সাখাওয়াত জানান, স্ত্রী রোকসানা পারভীনকে (৪৯) গুলি করে হত্যার পর আবদুর রব (৫৩) নিজের মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেন। স্ত্রীকে হত্যার জন্য আবদুর রব চার রাউন্ড গুলি করেন। এসব গুলি রোকসানার শরীরের বিভিন্নস্থানে বিদ্ধ হয়। পরে নিজের মাথার ডান পাশে কানের ওপর পিস্তল ঠেকিয়ে এক রাউন্ড গুলি করে আত্মহত্যা করেন আবদুর রব। এই গুলিটি তার মাথা ভেদ করে বাম পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। গুলিবিদ্ধ হওয়ার স্থানগুলোতে ছিলো জমাটবাঁধা রক্ত।

রোকসানা পারভীনের শরীরে চারটি গুলি বিদ্ধ হয়। এরমধ্যে বুকের ডানদিকে একটি, পিঠের ডান পাশে দু’টি ও বাম পাশে একটি গুলি বিদ্ধ হওয়ার আলামত পেয়েছে পুলিশ। ময়নাতদন্তের সময় তার পেট থেকে একটি গুলি বের করা হয়। বাকি তিনটি গুলি এক পাশ দিয়ে ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বের হয়ে যায় বলে পুলিশের ধারণা। খুব কাছ থেকে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয় বলেও ময়নাতদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান।

এসআই সাখাওয়াত হোসেন জানান, ব্যবসায়িক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ঋণী হয়ে পড়েন আফসার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুর রব। এই হতাশা থেকেই সোমবার রাতে স্ত্রীকে হত্যার পর নিজে আত্মহত্যা করেন। এ ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা হলেও আবদুর রবের ব্যবসায়িক বিষয়, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং ব্যক্তিগত শত্রুতাসহ আরও কিছু বিষয় আমলে নিয়ে তদন্ত করছেন বলে জানান তিনি। ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহকৃত আলামত পুলিশের বিশেষ টিম পরীক্ষা করে দেখছে। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে মামলাটি তদন্ত করা হচ্ছে।

মঙ্গলবার সকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে দু’জনের লাশের ময়নাতদন্ত শেষে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বিকালে বনানী কবরস্থানে তাদের দু’জনকে দাফন করা হয়। আবদুর রবের ছেলে নাফিস আহমেদও একই কথা বলেন। তিনি জানান, একটি জমি বিক্রি নিয়ে মায়ের সঙ্গে তার বাবার দ্বন্দ্ব ও ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে হতাশার কারণে এ ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। নাফিসের চাচাতো ভাই শাহাবুদ্দিন জানান, জমি বিক্রি নিয়ে তার চাচা-চাচির মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিলো। এ নিয়েও এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটতে পারে বলে তার ধারণা।

ময়নাতদন্তকারী কর্মকর্তা ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কাজী আবু সামা সাংবাদিকের বলেন, গুলিতেই দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। এর বাইরে তিনি এ হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে আর কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি। ময়নাতদন্ত শেষে শিল্পপতি দম্পতির লাশ আবদুর রবের ছেলে রাজীব আহমেদ গ্রহণ করেন। নিহত দম্পতির তিন ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।

সোমবার রাতে ঘটনাস্থল থেকে লাশ উদ্ধার ও সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির সময় ঘটনাস্থলে পুলিশ আমানত, বাবুল হোসেন, শাহাবুদ্দিন ও নাজির আহমেদ নামের চারজনকে সাক্ষী রাখে পুলিশ।