হাসিনা সরকারকে উত্‍খাতে যুক্তরাষ্ট্র তত্‍পর

usa president

দৈনিকবার্তা-ঢাকা,০৪ সেপ্টেম্বর: বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারকে সরিয়ে দিতে মার্কিনিদের অর্থ ব্যয়ের তথ্য পাওয়ার দাবি করেছেন ভারতের গোয়েন্দারা৷সেই সঙ্গে ত্রিপুরার বামপন্থি সরকারকেও মার্কিনিরা দুর্বল করার তত্‍পরতা চালাচ্ছে বলে গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন৷ এেিদক, বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারকে সরিয়ে দিতে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর চেষ্টার খবর অস্বীকার করেছে ঢাকার যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস৷

মার্কিনিদের এই তত্‍পরতার বিষয়ে ভারতের একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে, যাতে এই পরিকল্পনায় পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের সংশ্লিষ্টতা দেখা গেছে৷ পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারকে হটাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পেয়েছিল বলে মনে করা হয়৷

এই তৃণমূল কংগ্রেসই এখন বাংলাদেশে তাদের সমমনা মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোকে কয়েক মিলিয়ন ডলার দিয়েছে বলে ভারতের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের দাবি৷প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজ্যসভায় তৃণমূলের এমপি আহমেদ হাসান ইমরান এবং টেকনাফ থেকে ভারতে পাড়ি জমানো মাওলানা আসিফ খান গত ছয় মাস ধরে খালেদা জিয়া নেতৃত্বাধীন বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাঠাচ্ছেন৷

ভারতের ঊধর্্বতন এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব ও তাদের কর্মীদের হত্যা এবং জন অসন্তোষের মাধ্যমে বাংলাদেশে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিই মূল পরিকল্পনা৷বিএনপি ও জামায়াত নেতারা বাংলাদেশে নতুন নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনের হুমকি দিচ্ছেন৷ আর যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাবও নতুন নির্বাচনের পক্ষে৷

মার্কিনিদের এই তত্‍পরতার সঙ্গে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও জড়িত রয়েছে বলে এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা দাবি করেছেন৷ গোয়েন্দারা বলছেন, তৃণমূলের এমপি মুনমুন সেন পাকিস্তানের তেহরিক-ই ইনসাফ নেতা ইমরান খানের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রেখে চলেন৷

ইমরান ক্রিকেটার থাকার সময় সুচিত্রাকন্যা মুনমুনের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে বেশ আলোচনা ছিল৷ রাজনীতিক বনে যাওয়া ইমরান বর্তমানে তার দেশে নওয়াজ শরীফের সরকার হটানোর আন্দোলনে রয়েছেন৷ইমরান-মুনমুনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগকে ব্যবহার করেই সমপ্রতি কলকাতায় পাকিস্তানি হাইকমিশনারের সফরের ব্যবস্থা করা হয়৷পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতার সঙ্গে পাকিস্তান হাইকমিশনারের বৈঠকের পর কলকাতার একদল সাংবাদিকের পাকিস্তান সফরের ব্যবস্থাও হয়৷

ওই সময় পাকিস্তানি হাইকমিশনার পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের পাকিস্তানি ভিসা পাওয়া সহজ করতে কলকাতায় ডেপুটি হাইকমিশন খোলার প্রস্তাব জানান মমতার কাছে৷ ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তারা অবশ্য ওই দাবি নাকচ করে দেন৷

গোয়েন্দারা মনে করেন, কলকাতার উর্দুভাষীদের ভোট নিশ্চিত করতেই পাকিস্তানি কূটনীতিকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছেন মমতা৷পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম ভোটারদের ভোট বরাবরই কংগ্রেস ও সিপিএম পেয়ে আসছিল৷ এই বছরের পার্লামেন্ট নির্বাচনে তৃণমূলের জয়জয়কার হলেও মুসলিম ভোটের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম দেখা যায়নি৷

কলকাতার উর্দুভাষী মুসলিমরা সবসময়ই মৌলবাদীদের সমর্থন করে থাকে৷ বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সভা-সমাবেশেও তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ দেখা যায়৷একটি সূত্র জানিয়েছে, ভারতীয় একটি পত্রিকার সম্পাদক, যিনি নিজেও উর্দুভাষী, বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির জন্য এখন ঢাকায় অবস্থান করছেন৷

ওই সম্পাদক কিছুদিন আগে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন বলে জানিয়েছে সূত্রটি৷ভারতে বর্তমানে ক্ষমতাসীন বিজেপির সঙ্গে বিএনপির যোগাযোগ স্থাপনে ওই সম্পাদককে সহায়তা করছেন এক ব্যবসায়ী, যার বিরুদ্ধে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং-‘র’ এর হয়ে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে৷

তবে বিজেপির জ্যেষ্ঠ অনেক নেতাই দলভুক্ত ওই সম্পাদকের তত্‍পরতায় নাখোশ হয়েছেন৷ তারা বলছেন, দলে নিজের গোষ্ঠীর মধ্যে তিনি বিএনপির একটি লবি তৈরি করছেন৷পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির এক শীর্ষ নেতা বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী, কিন্তু মনে হচ্ছে এই মুসলিম সম্পাদক বিএনপি-বিজেপি শক্তিশালী সম্পর্ক তৈরির কাজটি নিজের কাঁধেই নিয়েছেন৷

মমতার মনোনয়নে রাজ্যসভার সদস্য হওয়া আহমেদ হাসান ইমরান সম্পর্কে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি নিষিদ্ধ স্টুডেন্টস ইসলামিক মুভমেন্ট অফ ইন্ডিয়ার (সিমা) নেতা ছিলেন৷প্রতিবেদনে সংগঠনটির সঙ্গে মুসলিম সন্ত্রাসী দলগুলোর সম্পর্ক থাকার পাশাপাশি এমপি ইমরান কিভাবে সীমান্তপথে টাকা পাঠাচ্ছেন তারও বিবরণ রয়েছে৷

ইমরান বাংলাদেশের দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করেছেন যে সংবাদপত্রটি জামায়াতঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত৷একাত্তরের যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী,দণ্ডিত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এবং মীর কাসেম আলীর সঙ্গে ইমরানের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে৷

ভারতীয়গোয়েন্দারা বলছেন,বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার বন্ধে সৌদি আরবের মতো শক্তিশালী ইসলামী দেশগুলোর সঙ্গে মিলে একাত্তরে পরাজিত পাকিস্তানও চেষ্টা চালাচ্ছে৷প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূলত ক্ষমতায় গেলে সেইন্ট মার্টিন দ্বীপে নৌঘাঁটি স্থাপনে অনুমতির প্রতিশ্রুতি েেদওয়ায় বিএনপি-জামায়াতকে সমর্থন দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র৷

ভারতের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জেনেছেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছেলে বর্তমানে লন্ডনে থাকা তারেক রহমানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বৈঠকও করেছেন৷

মিয়ানমারের রাখাইন অধু্যষিত এলাকা কাইয়ুকপিউতে চীনের বন্দর অবকাঠামো নির্মাণ এবং বাংলাদেশের প্রস্তাবিত সোনাদিয়া বন্দরের ওপর নজর রাখতেই এই নৌঘাঁটি স্থাপন করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র৷ গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গের পর এখন বাংলাদেশ লাগোয়া ত্রিপুরার মানিক সরকার নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকারকে দুর্বল করে দিতে চায় যুক্তরাষ্ট্র৷ এমনকি সম্ভব হলে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে সম্পর্কে আগ্রহী ভারতের ওই রাজ্য সরকারকে উত্‍খাতের পরিকল্পনাও বাদ দিচ্ছে না৷

এদিকে,বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারকে সরিয়ে দিতে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর চেষ্টার খবর অস্বীকার করেছে ঢাকার যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস৷দূতাবাসের মুখপাত্র মনিকা শাই বৃহস্পতিবার বলেন, ভারতীয় গোয়েন্দাদের উদ্ধৃত করে প্রকাশিত হাসিনাকে উত্‍খাতে মার্কিন তত্‍পরতা শিরোনামের প্রতিবেদনটি নিয়ে তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছেন৷এক ইমেইলে তিনি বলেন, ওই খবরের কোনো সত্যতা নেই৷

মনিকা বলেন, আপনারা জানেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দৃঢ় বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক রয়েছে৷ উগ্র মৌলবাদ প্রতিরোধ, বাণিজ্য সম্পকের্র উন্নয়নের পাশাপাশি, শ্রম পরিবেশের উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততার মতো বিষয়গুলো এগিয়ে নিতে দুই দেশ ঘনিষ্টভাবে কাজ করছে৷

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে যুক্তরাষ্ট্র কোস্ট গার্ডের জাহাজ রাশ দেয়ার প্রস্তাবের বিষয়টিও তুলে ধরেন দূতাবাসের মুখপাত্র৷তিনি বলেন, চলতি সপ্তাহেই মার্কিন কোস্ট গার্ডের জাহাজ ইউএসসিজিএস রাশকে বাংলাদেশকে উপহার দেয়ার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবের কথা ঘোষণা করতে পেরে আমরা গর্বিত৷

দূতাবাস বলছে, রাশ বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজ সমুদ্রজয়ের সঙ্গে কাজ করতে পারবে, যে জাহাজটি গত বছর বাংলাদেশকে হস্তান্তর করে যুক্তরাষ্ট্র৷মনিকা শাই বলেন, আগামী অক্টোবরে ওয়াশিংটনে আমাদের বার্ষিক পার্টনারশিপ ডায়ালগের মধ্য দিয়ে দ্বিপক্ষীয় এই সম্পর্ককে আরো এগিয়ে নেয়া সম্ভব হবে বলে আমরা আশা করছি৷