বাংলাদেশে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ চায় জাপান

index66দৈনিকবার্তা-ঢাকা, ৬সেপ্টেম্বর: জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবেবাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে জাপানি উদ্যোক্তাদের উত্‍সাহিত করবে জাপান সরকার৷শনিবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এ কথা বলেন৷জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে জাপান এঙ্টার্নাল ট্রেড অরগানাইজেশন(জেট্রো)এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে৷ অনুষ্ঠানের সহ-আয়োজক বিনিয়োগ বোর্ড ও বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন (এফবিসিসিআই)৷

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু৷বিশেষ অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান৷এ ছায়া বিজনেস অধিবেশনে বাংলাদেশের দুজন ও জাপানের আটজন ব্যবসায়ী পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনের মাধ্যমে উভয় দেশের পণ্য ও বিনিয়োগ সম্ভাবনার চিত্র তুলে ধরেন৷

শিনজো বলেন,জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণে যে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ, সেই উদ্যোগকে জাপান স্বাগত জানায়৷ বিগ-বি ( বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট) হিসেবে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন শিনজো৷বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত মে মাসে জাপান সফর করেন৷ বিষয়টি উল্লেখ করে শিনজো বলেন, ওই সময় তাঁকে পাঁচ-ছয় বছরের মধ্যে ৬০০ কোটি ডলারের সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল৷ ইতিমধ্যে ১২০ কোটি ডলারের চুক্তি হয়েছে৷

বাংলাদেশের বিনিযয়োগ পরিবেশকে আরও উন্নত করার আহ্বান জানিয়ে শিনজো বলেন, তিনি তাঁর দেশের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে উত্‍সাহিত করবেন৷বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান বিনিয়োগক্ষেত্র৷ এই দেশে জাপানি বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির তাগিদ দিয়েছেন জাপানের সফররত প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে৷

বৈঠকে আবে বলেন, এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম শীর্ষ বিনিয়োগক্ষেত্র৷ জাপান এখানে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী, তবে বিনিয়োগ বাড়াতে পরিবেশকে আরও ব্যবসাবন্ধব করতে হবে৷ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের ভূমিকায় দু’দেশের আলোচনার মধ্য দিয়ে আরও উন্নয়ন সম্ভব বলে উল্লেখ জাপানি প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ৫ বছরে জাপানে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি ২০ গুণ বেড়েছে৷ কারণ, তিন বছর আগে জাপান সরকার বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যে শুল্ক সুবিধা দেয়৷ জাপান ও বাংলাদেশ যৌথভাবে কাজ করে যাচ্ছে৷ ভৌগলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ এ অঞ্চল ও জাপানের অর্থনীতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে আবে বলেন, এজন্যই তিনি বাংলাদেশ সফর বরছেন৷

জাপানি কোম্পানিগুলো এদেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামোগত উন্নয়নে কাজ করছে৷সোনারগাঁও হোটেলেও জাপানি কোম্পানি অবদান আছে৷ আজকে এখানে জাপানের প্রতিনিধিত্বশীল ২২টি বেসরকারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত আছেন৷ তারা অবকাঠামো, ফাইন্যান্স, মেডিকেল, নিরাপদ খাদ্য, নিরাপদ পানি প্রভৃতি খাতে কাজ করতে আগ্রহী৷ব্যবসায়ীদের উন্নয়নের মূল কাণ্ডারি উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুই দেশের ব্যবসায়ীরাই উন্নয়নে মূল ভূমিকা পালন করছে৷ বিকাল ৩টায় সোনারগাঁও হোটেলের বলরুমে জাপান-বাংলাদেশ ইকোনমিক ফোরামের সঙ্গে বৈঠক করেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী৷

সফরের প্রথম বক্তৃতায় জাপানকে এগিয়ে নিতে নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাংলাদেশের গুরুত্বের কথা তুলে ধরলেন শিনজো আবে৷শনিবার দুপুরে ঢাকায় পৌঁছনোর পর জাতীয় স্মৃতিসৌধ ও বঙ্গবন্ধু জাদুঘর ঘুরে সোনারগাঁও হোটেলে বাংলাদেশ-জাপান বিজনেস ফোরামের অনুষ্ঠানে যোগ দেন জাপানি প্রধানমন্ত্রী৷১৪ বছর পর জাপানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঢাকায় আসা আবে জাপানের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে তার নীতি তুলে ধরেন বক্তৃতায়৷

নিজের নীতির সফল প্রয়োগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ভারতের মধ্যবর্তী দেশ বাংলাদেশের গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী৷জাপানের অর্থনীতিকে চাঙা করতে আমি আবেনমিসের প্রয়োগ ঘটাচ্ছি৷ এজন্য জাপানের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ খুব গুরুত্বপূর্ণ৷ তাই আমি আজ বাংলাদেশ সফর করছি৷

জাপান ও বাংলাদেশের সম্পর্ককে ভাই- বোনের সম্পর্ক হিসেবে অভিহিত করে দুই দেশের উন্নয়নে উভয় দেশের ব্যবসায়ীদের সহায়তা প্রত্যাশা করেন তিনি৷দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে একযোগে কাজ করার গুরুত্ব দিয়ে এক্ষেত্রে নিজের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি৷

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে শনিবার দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে জাপানের প্রধানমন্ত্রী ১৫০ জনের প্রতিনিধি দল নিয়ে একটি বিশেষ বিমানে ঢাকায় অবতরণ করেন৷ বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে স্বাগত জানান৷ এ সময় জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়৷জাপানের প্রধানমন্ত্রী, তাঁর স্ত্রী ও তাঁদের সফরসঙ্গীদের বহনকারী একটি বিশেষ বিমান আজ বেলা ১২টা ৫০ মিনিটে হযরত শাহজালাল আনত্মর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে৷

বিশেষ বিমান থেকে বিমানবন্দরের ভিভিআইপি টারমাকে পেঁৗছালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিনজো অ্যাবে ও তার স্ত্রী আকি অ্যাবেকে স্বাগত জানান৷ এ সময় দু’টি শিশু তাঁদের ফুলের তোড়া উপহার দেয়৷

তিন বাহিনীর একটি চৌকস দল শিনজো অ্যাবেকে গার্ড-অব-অনার এবং রাষ্ট্রীয় অভিবাদন জানায়৷ সুসজ্জিত মঞ্চে শেখ হাসিনাকে সাথে নিয়ে অ্যাবে সালাম গ্রহণ করেন৷ এ সময় দুদেশের জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হয়৷ পরে উভয় প্রধানমন্ত্রী গার্ড পরিদর্শন করেন৷প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত মন্ত্রিসভার সদস্য ও অন্য উচ্চপদস্থদের সঙ্গে শিনজো অ্যাবের পরিচয় করিয়ে দেন৷ জাপানের প্রধানমন্ত্রীও তাঁর সফর সঙ্গীদের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পরিচয় করিয়ে দেন৷

বিমানবন্দরে জাপানী প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে আরো উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবুল মুহিত, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম শাহরিয়ার আলম৷এছাড়া মন্ত্রিপরিষদ সচিব এম মোশাররফ হোসেন ভূইয়া, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবদুস সোবহান সিকদার, তিন বাহিনী প্রধানগণ, পুলিশের মহাপরিদর্শক, কূটনৈতিক কোরের প্রধানসহ উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ এ সময় উপস্থিত ছিলেন৷

বিমানবন্দরে উষ্ণ অভর্্যথনা শেষে জাপানী প্রধানমন্ত্রী সোজা সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে যান এবং পুষ্পসত্মবক অর্পণের মাধ্যমে স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান৷ তিনি সেখানে পরিদর্শন বইতে স্বাক্ষর করেন৷পরে শিনজো অ্যাবে ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে যান এবং সেখানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন৷

এর আগে ২০০০ সালে জাপানী প্রধানমন্ত্রী ইয়োশিরো মোরি বাংলাদেশ সফর করেন৷ দীর্ঘ ১৪ বছর পর জাপানের কোন প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে এলেন৷চলতি বছর মে মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি পর্যায়ে জাপান সফরের পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই শিনজো অ্যাবে ফিরতি সফরে বাংলাদেশে এলেন৷ জাপানে গত ২৫-২৮ মে সফরকালে শেখ হাসিনা শিনজো অ্যাবেকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান৷জাপান সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৬ মে শিনজো অ্যাবের সঙ্গে বৈঠক করেন৷ তখন জাপান বাংলাদেশকে আগামী ৫ বছরের জন্য ৬শ’ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তার অঙ্গীকার করে৷

সফরকালে জাপানের প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতি এম আবদুর হামিদ ও সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদের সঙ্গে সাৰাত্‍ করবেন৷এ ছাড়া অ্যাবে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশ বিনিয়োগ বোর্ড (বিওআই), ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) ও জাপান এঙ্টার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেটিআরও) আয়োজিত বাংলাদেশ-জাপান ইকোনমিক ফোরামে বক্তব্য রাখবেন৷জাপানের প্রধানমন্ত্রী রোববার সকাল সাড়ে ১০টায় শ্রীলংকার উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবেন৷