এসএসসি: বাড়তি ফি ফেরত না দিলে স্কুলকমিটি বাতিল

06-01-15-Motijheel Ideal School And College-3

দৈনিকবার্তা-ঢাকা, ৬ জানুয়ারি: এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণে নেয়া অতিরিক্ত ফি আগামী ২০ জানুয়ারির মধ্যে ফেরত দিতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট৷ মঙ্গলবার বিচারপতি রেজা-উল হক ও বিচারপতি আবু তাহের মোহাম্মদ সাইফুর রহমাননের বেঞ্চ এ আদেশ দেয়৷ফরম পূরণে বাড়তি ফি আদায়ের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে হাইকোর্টের তলবে রাজধানীর স্কুলগুলোর প্রধান ও সভাপতিরা হাজির হলে আদালত এ আদেশ দেয়৷এতে বলা হয়, যেসব বিদ্যালয় সরকার নির্ধারিত ফির বাইরে বাড়তি ফি আদায় করেছে তা ফেরত দিতে শিক্ষা সচিব ও ১০ বোর্ডের চেয়ারম্যান আদেশ জারি করবে৷ তা না হলে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটি বাতিল বলে গণ্য হবে৷ওইসব ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যরা পরবর্তী ৩ বছরের জন্য কমিটি ও গভর্নিং কমিটির নির্বাচনের জন্য অযোগ্য বিবেচিত হবে বলেও জানায় আদালত৷

তা ফেরত না দিলে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটি বাতিল বলে গণ্য হবে বলেও বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমানের বেঞ্চের আদেশে বলা হয়েছে৷

মঙ্গলবার দেওয়া এই আদেশে বলা হয়, সচিব ও ১০ বোর্ডের চেয়ারম্যান এই মর্মে আদেশ জারি করবে যে, সমগ্র বাংলাদেশে যে সব বিদ্যালয় সরকার নির্ধারিত এসএসসি পরীক্ষার ফি এবং আইনগতভাবে আদায়যোগ্য ফি বহির্ভূত কোনো বাড়তি ফি আদায় করেছে, সেসব ফি আগামী ২০ জানুয়ারির মধ্যে শিক্ষার্থীদের ফেরত দেবে৷ তা না হলে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটি বাতিল বলে গণ্য হবে৷ওইসব ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যরা পরবর্তী তিন বছরের জন্য ব্যবস্থাপনা কমিটি ও গভর্নিং কমিটির নির্বাচনের জন্য অযোগ্য বিবেচিত হবেন৷ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের একটি প্রতিবেদন দেখার পর গত ডিসেম্বর মাসে হাই কোর্টে রাজধানীর অতিরিক্ত ফি গ্রহণকারী ২৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানকে তলবের আদেশ দিয়েছিল৷

এই প্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত ফি নিয়েছে বলে ঢাকা বোর্ডের তদন্তে ধরা পড়ে৷ পরে প্রকাশিত আদালতের লিখিত আদেশে দেখা যায়, ফি ফেরত দেওয়া ছয়টি প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ও সভাপতিকে বাদ দেওয়া হয়৷বাকি ২০টি স্কুলের অধিকাংশ বিবাদীরা আদালতে হাজির ছিলেন৷ শুনানি শেষে আদালত বিবাদীদেরকে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দেয়৷ভিকারুননিসা নুন স্কুল ও মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, উদয়ন স্কুলের সভাপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, রাজউক স্কুল অ্যান্ড কলেজের চেয়ারম্যান শিক্ষা সচিব নজরুল ইসলাম খান আদালতে উপস্থিত ছিলেন৷

শুনানিতে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিশ্বজিত্‍ রায়কে উদ্দেশ্যে করে আদালত বলে, সরকারের পক্ষ থেকে সবার জবাব দেননি কেন?জবাবে বিশ্বজিত্‍ রায় বলেন, জবাবের সব অনুলিপি পাইনি৷ যেগুলো পেয়েছি সেগুলো দিয়েছি৷ কেউ কেউ সরাসরি আদালতে দাখিল করেছে৷

মন্ত্রী রাশেদ খান মেননের কাছে আদালত জানতে চায়,সরকারের আইন এভাবে কি লঙ্ঘন করা উচিত? এখন তো দেখছি সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হয়ে গেছে৷ মেননের পক্ষের আইনজীবী শ ম রেজাউল করিম বলেন, নিয়মিত ক্লাসের বাইরে কোচিং ক্লাস নেওয়া হয়৷ এই জন্য অতিরিক্ত অর্থ নিতে পারবে বলে বোর্ডের সার্কুলারে বলা আছে৷ সেভাবেই নেওয়া হচ্ছে৷

আদালত বলে, কত নিতে পারবেন, সর্বোচ্চ ১২০০ টাকা৷ এর থেকে বেশি তো না৷ আমাদের সময় তো কোন কোচিং ছিল না৷ কেউ টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলে শিক্ষকরা পাগলপ্রায় হয়ে যেত৷ বাড়িতে গিয়ে পড়াত৷রেজাউল বলেন, ঠিক৷ কিন্তু এখনকার পরিস্থিতি ভিন্ন৷ যাই হোক, বোর্ড নোটিস দেওয়ার পর অতিরিক্ত অর্থ ফেরত দেওয়া হয়েছে৷

আদালত বলে, এখানে শুধু ২০টি স্কুলের প্রেক্ষাপট৷ আমরা অতিরিক্ত ফি নেওয়ার ব্যাপারে সারা দেশের সব শিক্ষা বোর্ডের ব্যাপারে আদেশ দিয়েছিলাম৷ ঢাকা ও বরিশাল শিক্ষা বোর্ড জবাব দিয়েছে৷বিশ্বজিত্‍ রায় বলেন, ঢাকা শহরের এমনও স্কুল আছে, যেখানে এক একজন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ১৮ হাজার টাকা করে নিয়েছে৷ এটা পত্রিকায় আসেনি৷ অভিভাবকরা আমাদের জানিয়েছেন৷

এরপর আদালত শিক্ষা সচিবকে উদ্দেশ্য করে বলে, ১৯৬১ সালের আইন অনুসারে সব ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে শিক্ষা বোর্ডকে৷ কিন্তু আপনারা শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে শিক্ষা বোর্ডকে পাশ কাটিয়ে একের পর এক প্রজ্ঞাপন জারি করে থাকেন৷ এ ধরনের বহু নজির আছে৷ কেন এটা করেন?

শিক্ষা সচিব বলেন, আমি দায়িত্ব পেয়েছি তিন মাস৷ এভাবে বললে তো আমি বলতে পারব না৷ সুনির্দিষ্টভাবে বলতে হয়ত জবাব দিতে পারব৷আদালত বলে, সৃজনশীল ব্যবস্থা প্রবর্তন করে আপনারা আদেশ জারি করেছেন৷ এটা করার আপনারা কে? কাজটা তো বোর্ডের৷তখন সচিব বলেন, সৃজনশীল ব্যবস্থাটা একটা রাষ্ট্রীয় নীতির বিষয়৷ এটা সরকারি সিদ্ধান্ত৷

আদালত বলে, আপনি তো শিক্ষা সচিব, আপনি কোন কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতি? আমরা যতটুকু বলেন, রাজউক ও রেসিডেন্সিয়ালের সভাপতি৷তখন সচিব বলেন, আমি ঠিকই সভাপতি, তবে বেশি ফি নেওয়ার বিষয়টি আমি জানি না৷

আদালত বলে, বেশিরভাগ স্কুলই গ্রাম অঞ্চলের৷ সেখানকার শিক্ষার্থীদের অধিকাংশ অভিভাবকই অস্বচ্ছল৷ এভাবে ফি নিলে সেটা তাদের জন্য অসহনীয় হয়৷সচিব বলেন, সব কিছু মন্ত্রণালয় থেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না৷ সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা বিবেচনার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে৷

আদালত বলে, আমরা আগে আদেশ দিয়েছি যে, কেউ বর্ধিত ফি দিতে না পারলে তাকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখা যাবে না৷ কোচিংয়ের নামে বাড়তি টাকা নেওয়া হচ্ছে৷ এরপরে বাইরে কোচিং সেন্টার কেন?

শিক্ষা সচিব বলেন, বৃটেনের মতো দেশেও কোচিংয়ের ব্যবস্থা আছে৷ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা তাদের মতো উন্নত হলে হয়ত আমরা কোচিং ব্যবস্থা না রাখার পক্ষে বলতে পারতাম৷আদালত তখন জানতে চায়, বাংলাদেশের কমিউনিটি স্কুলের শিক্ষার রেটিং সারা বিশ্বের মধ্যে কততম?উত্তরে সচিব বলেন, আমি জানি না৷আদালত তখন বলে, বাংলাদেশের অবস্থান ওপরের দিকে৷শুনানির এক পর্যায়ে রেজাউল করিম বলেন, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার কথা বলেছেন, এখানে একটা ইউনিভার্সিটির চারজন ভিসি৷ হাই কোর্ট থেকেই চারজন পৃথকভাবে আদেশ নিয়ে সমানতালে সনদ বিক্রি করছেন৷

আদালত বলে, বিশ্ববিদ্যালয় করার জন্য লোভ কেন? স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটিতে থাকার এত আগ্রহ কেন?চিব বলেন, টাকা পয়সা আছে৷আদালত বলে, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান আদালতের নির্দেশ মানছে না৷ কিন্তু মন্ত্রণালয় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন না কেন? কেউ মান্য না করলে শাস্তি কী ?সচিব বলেন, আইনে কোনো শাস্তি নেই৷ সুনির্দিষ্ট একটি আইন করা উচিত৷