সাপ্তাহিক ছুটির দিনে জমজমাট বাণিজ্য মেলা

2_59754

দৈনিকবার্তা-ঢাকা ৯ জানুয়ারি: শুক্রবার বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দশনার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় মেলা প্রাঙ্গণ৷ ব্যস্ত নাগরিক জীবনে একটু বিনোদন পেতে সাপ্তাহিক ছুটির দিনটিতে মেলায় ছুটে এসেছে রাজধানীবাসী৷প্রতি বছরের মতো এবারও ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা বেশ জমে উঠবে বলে আশা করছেন বিক্রেতারা৷শুক্রবার মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায় এসব চিত্র৷

টিকিট কাউন্টারের সামনে দীর্ঘ লাইন৷ মেলায় আগত নারী দর্শনার্থীদের টিকিট সংগ্রহে ভোগান্তিতে পড়তে দেখা যায়৷ টিকিট কাউন্টারে দাঁড়িয়ে থাকা শান্তা ইসলাম জানান, প্রায় ২০ মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে আছি৷ লাইন শেষ হয়ে কাউন্টারে পৌঁছুতে মনে হয় আরও ১০ মিনিট লাগবে৷ তবুও বাচ্চাদের মেলা দেখানোর জন্য নিয়ে এসেছি৷ এখন তো আর ফিরে যাওয়া যায় না৷ মেলার ভেতরেও লক্ষ্য করা গেছে জনস্রোত৷ সদ্য বিবাহিত স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে মিরপুর থেকে এসেছেন মো. শাওন আশরাফ৷ তিনি জানান, বিনোদনের জন্য স্ত্রীর ইচ্ছায় তাকে নিয়ে মেলায় ঘুরতে এসেছেন৷ মেলা থেকে বিশেষ মূল্য ছাড়ের অফার পেয়ে সংসারের প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র কেনেন এই নবদম্পত্তি৷

ছুটির অবসরকে কাজে লাগিয়ে মো. আসিফ, হায়দার আলীসহ এমন আরও কয়েকজন চাকরিজীবী এসেছেন পরিবার সঙ্গে নিয়ে মেলা ঘুরে দেখতে৷বাড্ডা থেকে আসা মেলার আরেকজন দশর্নার্থী সনিয়া রহমান বলেন, ছেলেকে নিয়ে এসেছি মোটর সাইকেল কিনতে৷ একটা পছন্দও হয়েছে৷ তবে দামে মিলছে না৷ পরের সপ্তাহে কিনে দেওয়ার চিন্তা করেছি৷

শান্তা, নিতু, লিপি তিন বান্ধবী এসেছেন ফামর্গেট এলাকা থেকে৷ জানান, মেলার বিভিন্ন স্টলে সুন্দর সুন্দর পাকিস্তানি পোশাক ওঠার কথা শুনেছি আরেক বান্ধবীর কাছ থেকে৷ তাই আজ আমরাও এসেছি কিনতে৷এদিকে দশর্নার্থীদের পদচারণায় মেলা যখন জমজমাট তখন বিক্রেতাদের মুখেও দেখা যাচ্ছে তৃপ্তির ছাপ৷ ক্রেতাদের কাছে নিজ স্টলের আকর্ষণ উপস্থাপন করতেই ব্যস্ত তারা৷ ভিড় বাড়ার সঙ্গে বিক্রিও বেড়েছে প্যাভিলিয়ন ও স্টলগুলোতে৷

কে-জেড গ্রুপের জুয়েলারি দোকানে একজন বিক্রেতা জানান, শুরু থেকেই মেলায় দশর্নার্থীদের পদচারণা ছিলো৷ কিন্তু মাঝখানে অবরোধের কারণে কমতে শুরু করেছিলো ক্রেতার সংখ্যা৷ তবে আজ বেচাকেনা ভালো হবে বলেই আশা করা যাচ্ছে৷

ক্রেতাদের ভিড় দেখা গেলো বঙ্গবন্ধু প্যাভিলিয়নেও৷ বিভিন্ন স্যান্ডেল, পোশাক, কারুশিল্পের স্টলসহ খাবারের স্টলগুলোতেও খালি চেয়ার নেই বললেই চলে৷ কথা হলো মারটেঙ্ নামের এক পোশাক প্যাভিলিয়নের ইনচার্জ আশরাফের সঙ্গে৷ তিনি জানান, এ সপ্তাহের মধ্যে আজকেই একটু ক্রেতাদের ভিড় দেখা যাচ্ছে৷ তবে আগামী দিনে আরও ভালো হওয়ার আশা প্রকাশ করেন তিনি৷এছাড়াও গত বছরের তুলানায় এ বছর মেলায় দর্শনার্থীদের ভিড় বেড়েছে বলেও মন্তব্য করছেন বিভিন্ন স্টল ও প্যাভিলিয়নে দায়িত্বরত কর্মকর্তারা৷

এ সম্পর্কে রপ্তানি উন্নয়ন বু্যরোর (ইপিবি) সচিব এ এফ এম মনজুর কাদির বলেন, এবারের মেলায় সব ধরনের আয়োজন যত্ন সহকারে করা হয়েছে৷ তাছাড়া মেলার পরিসরও ভালো৷ শুরু থেকে গত কদিনের মধ্যে আজকে মেলায় ভিড় বেশি৷তিনি বলেন, বিক্রেতারাও অপেক্ষা করে থাকেন এ দিনটির জন্য৷ আশা করছি আগামী দিনগুলোতে দর্শনার্থী র সংখ্যা আরও বাড়বে৷এর আগে বাণিজ্য মেলার বাইরে উদ্বেগ, উত্‍কন্ঠা আর আতঙ্ক৷ ভেতরে নিরুত্তাপ আর ক্রেতাশূন্য৷ অলস সময় পার করছেন বিক্রয়কর্মীরা৷ স্টল মালিকদের চোখে-মুখে হতাশা আর ক্ষোভের ছায়া৷

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের ডাকা অনির্দিষ্টকালের অবরোধের তৃতীয় দিন চলছে৷ আর এই অবরোধের প্রভাবে মেলায় ক্রেতা দর্শনার্থীর উপস্থিতি ছিল শূন্যের কোঠায়৷ এভাবে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা অব্যাহত থাকলে গতবারের মত এবারও বিপুল ক্ষতির আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা৷

কথা হয় ইরানি পণ্য সম্ভার প্যাভিলিয়নের ম্যানেজার মোশাররফ হোসেনের সাথে৷ তিনি বলেন, অবরোধের কারণে মেলায় বেচাকেনায় ধস নেমেছে৷ প্রতিদিন যা বেচাকেনা হচ্ছে তা দিয়ে স্টাফদের খাওয়া খরচও হচ্ছে না৷স্কয়ার ইলেক্ট্রনিক লিমিটেডের সিনিয়র ম্যানেজার জাহিদ হোসাইন জিলু জানান, বেচাকেনা নেই বললেই চলে৷ এবারের মেলায় বড় ধরনের ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানান তিনি৷

কথা হয় নাভানা ফার্নিচারের বিক্রয় প্রতিনিধি আরিফুল ইসলামের সাথে৷ তিনি বলেন, বেচাকেনা একেবারে শূন্যের কোঠায়৷ মেলার ৭ থেকে ৮ দিন পেরিয়ে গেলেও বেচাবিক্রি ভাল নয়৷ রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভাল না হওয়া পর্যন্ত মেলা জমবে না বলেও জানান তিনি৷

বেঙ্ িফেব্রিঙ্রে বিক্রয় প্রতিনিধি কবির হোসেনের মুখেও হতাশার বাণী৷ তিনি বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতায় মেলায় ক্রেতা-দর্শনার্থী আসছে না৷ এ সময় তিনি মেলার সময়সীমা ১ মাস থেকে আরো কিছুদিন বাড়ানোর দাবিও জানান৷খুলনা থেকে বাণিজ্য মেলায় এসেছেন গৃহিনী নাদিয়া আক্তার৷ তিনি বলেন, জীবনের প্রথম বাণিজ্য মেলায় এসেছি৷ উত্‍সাহ নিয়ে মেলায় আসলেও অনেকটা নিরুত্তাপ মনে হচ্ছে বাণিজ্য মেলাকে৷ এছাড়া যাত্রাপথে আতঙ্ক তো রয়েছেই৷

এ বিষয়ে মেলার পরিচালক ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ড. এ এফএম মনজুর কাদির বলেন, এবারের মেলা শুরুর দিন থেকেই ছিল ক্রেতা-দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখরিত৷ তাছাড়া মেলার পঞ্চম দিনের মধ্যে তিন দিনই ছিল সরকারি ছুটি৷ এটা এ ধরনের মেলার জন্য বড় একটা পাওয়া৷ কিন্তু তাতে অনেকটা ভাটা ফেলে দিয়েছে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা৷ রাজনৈতিক সৃষ্ট সমস্যা সমাধান হোক সমঝোতায়৷ এটি যদি সহিংস আন্দোলনে রূপ নেয় তাহলে তা শুধু বাণিজ্য মেলারই নয়৷ বরং দেশের সার্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিকে হুমকির মুখে ফেলবে৷

উল্লেখ্য, রফতানিমুখী পণ্যের গুণগত মান ক্রেতাদের সামনে তুলে ধরা এবং এর প্রসার বাড়ানোর লক্ষ্যে বছরের শুরুতে এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে৷ এবারের মেলায় স্টল ও প্যাভিলিয়ন রয়েছে ৫১৬টি৷ চার মহাদেশের ১৪টি দেশ এবারের মেলায় অংশগ্রহণ করছে৷ প্রথম বারের মতো অংশ নেয়া অস্ট্রেলিয়া-ব্রিটেন ও জার্মানির জন্য চারটি প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ রয়েছে৷