Ejtema

দৈনিকবার্তা-গাজীপুর, ১৮ জানুয়ারি: টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে দুনিয়া ও আখেরাতের শানত্মি লাভের আশায় মহান আলস্নাহ তায়ালার দরবারে অশ্রম্নসিক্ত নয়নে দুই হাত তুলে লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমানের আমিন, আলস্নাহুমা আমিন, ছুম্মা আমিন ধ্বনিতে মুখরিত আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে এবারের ৫০তম বিশ্ব এজতেমা রবিবার শেষ হয়েছে৷ মোনাজাতে লাখ লাখ মুসলিস্ন নিজের কৃতকর্মের জন্য ৰমা প্রার্থনা করেন এবং কেঁদে বুক ভাসান৷ মোনাজাতে মুসলিম উম্মাহর শানত্মি, সমৃদ্ধি ও কামনা করা হয়৷ মোনাজাতে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, শান্তি, সমৃদ্ধি, অগ্রগতি, ইহলৌকিক ও পরলৌকিক মুক্তি এবং দ্বীনের দাওয়াত পেঁৗছে দেয়ার তৌফিক কামনা করা হয়৷
রবিবার বেলা ১১টা ২২ মিনিট থেকে ১১টা ৫৪ মিনিট পর্যনত্ম ৩২ মিনিট স্থায়ী মোনাজাত পরিচালনা করেন বিশ্ব তাবলিগ জামাতের শীর্ষ মুরবি্ব দিলস্নীর হজরত মাওলানা সা’দ আহমেদ৷ তাত্‍পর্যপূর্ণ এই আখেরি মোনাজাতে জীবনের সব পাপ-তাপ থেকে মুক্তি, আত্মশুদ্ধি ও নিজ নিজ গুনাহ মাফের জন্য মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে রহমত প্রার্থনা করা হয়৷
মোনাজাত চলাকালে পুরো এজতেমা ময়দান ও আশেপাশের এলাকায় পিন পতন নীরবতা নেমে আসে৷ এ সময় এজতেমা ময়দান এলাকায় সমবেত বিশাল জনসমুদ্রে এক অভূতপর্ব ভাবাবেগের সৃষ্টি হয়৷ সর্বত্র এক পূন্যময় পরিবেশ বিরাজ করতে থাকে৷ এজতেমার ২য় পর্বে আখেরি মোনাজাতে লাখ লাখ মুসলিস্নর সঙ্গে সংসদ সদস্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবর্গ ও বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের কুটনৈতিক বৃন্দ শরিক হন৷ এ ছাড়া পদস্থ সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাসহ দলমত শ্রেণীপেশা নির্বিশেষে সর্বসত্মরের ধর্মপ্রাণ মুসলমান আখেরি মোনাজাতে অংশ নেন৷
বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের ডাকা হরতাল ও লাগাতার অবরোধের কারনে এবারের এজতেমায় মুসলস্নীদের উপস্থিতি অনেক কম হলেও আখেরি মোনাজাত উপলৰে রবিবার এজতেমাস্থলের চারপাশের ৩-৪ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না৷ আখেরি মোনাজাতের জন্য রবিবার আশে-পাশের শিৰা প্রতিষ্ঠান, কলকারখানাসহ বিভিন্ন অফিস-আদালতে ছিল ছুটি৷ কোন কোন প্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা না করলেও কর্মকর্তাদের মোনাজাতে অংশ নিতে বাধা ছিল না৷ নানা বয়সী ও পেশার মানুষ এমনকি মহিলারাও ভিড় ঠেলে মোনাজাতে অংশ নিতে রোববার সকালেই টঙ্গী এলাকায় পেঁৗছেন৷
আখেরি মোনাজাতের পূর্বে তাবলিগ জামাতের শীর্ষ মুরম্নবি্বরা হেদায়ী ও সংৰিপ্ত বয়ানে বলেন, প্রত্যেক মুসলমানকে দিনের বেলায় মেহনত রাতের বেলায় ইবাদত-বন্দেগী করতে হবে৷ দুটির একটি করলে ফয়দা হবেনা৷ মেহনত ও ইবাদতের মধ্য দিয়ে মুসলমানের মৃতু্য পর্যনত্ম দ্বীনের রাসত্মায় অনড় থাকতে হবে৷ আখেরি মোনাজাতের দিন গতকাল (রবিবার) সূর্য উঠার শুরম্ন থেকে উত্তরা বিমান বন্দর, আব্দুলস্নাপুর, টঙ্গী কালীগঞ্জ সড়কে আশুলিয়া-সাভার সড়কে ও ঢাকা-ময়মসসিংহ সড়ক পথে ধনী দরিদ্র যুবক বৃদ্ধ নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে৷ পায়েহেঁটে মুসলিস্নরা ধাবিত হয় এজতেমা ময়দানে৷
এদিকে এজতেমাস্থলে স্থান সংকুলান না হওয়ায় অগণিত মানুষ ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, টঙ্গী-কালীগঞ্জ সড়ক, আশুলিয়া-সাভার সড়ক এবং উত্তরা মডেল টাউনসহ আশেপাশের এলাকা থেকে অগণিত মুসুলিস্ন মোনাজাতে অংশ নেন৷এ ছাড়া অসংখ্য মুুসলিস্ন স্থানাভাবে এজতেমাস্থলের খালি জায়গা, মিলকারখানার অভ্যনত্মর ও ছাদে, ঘরবাড়ি, বেড়িবাধ, বিভিন্ন যানবাহনে উঠে এবং নৌকায় বসে মোনাজাতে শরিক হন৷ অনেকেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে মোনাজাতে শরিক হন৷ এজতেমা ময়দানের বাইরে পর্যাপ্ত মাইক না থাকায় বহু ধর্মপ্রাণ মুসলমান সময়মতো আখেরি মোনাজাতে শামিল হতে গিয়ে বিভ্রানত্মিতে পড়েন৷ শনিবার রাতে ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কে ও টঙ্গী আশুলিয়া সড়কে যানবাহন চলাচলে বিধি নিষেধ থাকায় ওই সড়কে যাতায়তকারী সাধারণ মানুষ ও মুসলিস্নদের দূর্ভোগে পড়তে হয়েছে৷
গত ৯ জানুয়ারি শুরম্ন হয় তাবলীগের মিলনমেলা এবারের ৫০তম বিশ্ব এজতেমা৷ দু’টি পর্বের মাধ্যমে ১৮ জানুয়ারি তা শেষ হয়৷

হেদায়াতি বয়ান \\ মোনাজাতের আগে চলে হেদায়তি বয়ান৷ রবিবার সকাল থেকে আখেরি মোনাজাতের আগ পর্যনত্ম হেদায়েতি (দাওয়াতি কাজের পদ্ধতি) বয়ান করেন বিশ্ব তাবলিগ জামাতের শীর্ষ মুরবি্ব দিলস্নীর হজরত মাওলানা সা’দ আহমেদ৷ এসময় তার বয়ানের বাংলায় অনুবাদ করেন বাংলাদেশের মাওলানা নুরম্নর রহমান৷

বয়ানে যা বলা হয়েছে \\ বয়ানে শীর্ষ মুরবি্ব দিলস্নীর হজরত মাওলানা সা’দ আহমেদ বলেন, আলস্নাহর গজবের বড় স্থান হচ্ছে জাহান্নাম৷ তিনি আলস্নাহর রাসত্মায় তাবলীগে দাওয়াতি কাজে পায়ে হেঁটে মানুষের কাছে দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার পরামর্শ দেন৷ কারণ পায়ে হেঁটে বেশি মানুষকে দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া সম্ভব হবে৷ এতে পায়ে যে ধূলাবালি লাগবে তা জাহান্নামের আগুনকে ঠান্ডা করে দেয়৷ তিনি তাবলিগের দাওয়াতি কাজে গিয়ে মানুষের কাছে ইহজগতের জন্য ছওয়াল করতে বারণ করে বলেন, যে জামাত ছওয়াল করে আল্লাহর সাহায্যের দরজা তাদের জন্য বন্ধ হয়ে যায়৷ ছওয়াল করলে দিলে শয়তান স্থান পায়৷ দাওয়াতি কাজে সবচেয়ে বড় কাজ হলো নিজের নিয়তকে সহি করা এবং অন্যের কাছে ছওয়াল না করা৷
হেদায়েতি বয়ানে আরো বলা হয়, যে ব্যক্তি দ্বীন ইসলামের বিধান আনুসারে চলবে এবং হযরত মোহাম্মদ (সাং) এর জীবনাদর্শ অনুসরন করবে, সে দুনিয়া ও আখেরাতে কামিয়াব অর্জন করবে৷ মোনাজাতের পূর্বে সংৰিপ্ত বয়ানে হযরত মাওলানা যোবায়েরম্নল হাসান বলেন, নামাজের আগে আামদের দিলে একিন বা ঈমান পয়দা করতে হবে৷ তা না হলে নামাজের ফজিলত পাওয়া যাবেনা৷ মাওলানা সাদ তার প্রদত্ত বয়ানে হেদায়েতি সম্পর্কে সবিসত্মারে আলোচনা করেন৷

ভিআইপিদের মোনাজাতে অংশ গ্রহণ \\ আখেরী মোনাজাতে সংসদ সদস্য, বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের কূটনীতিক বৃন্দ, বিভিন্ন রাজনেতিক দলের নেতৃবর্গ শরিক হন৷ এ ছাড়া পদস্থ সামরিক, বেসামরিক কর্মকর্তাসহ দল-মত, শ্রেণী-পেশা নির্বিশেষে সর্বসত্মরের ধর্মপ্রাণ মুসলমান আখেরী মোনাজাতে অংশ নেন৷

এজতেমায় বিদেশি মুসলিস্ন \\ এবারের বিশ্ব এজতেমায় বিশ্বের প্রায় ১৫০টি দেশ অংশ নেয় বলে আয়োজকদের সূত্রে জানা গেছে৷ এর মধ্যে এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ অংশগ্রহনকারী দেশের তাবলিগ জামাতের প্রায় ২৫ হাজার বিদেশি মেহমান এবারের এজতেমায় অংশগ্রহণ করেছেন৷ এদের মধ্যে ভারত, পাকিস্থান থেকে সর্বোচ্চ সংখ্যক বিদেশি মেহমান আগমন করেন৷ তবে পুলিশ প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ইবোলা ভাইরাস জনিত কারনে ৬টি দেশের মুসুলিস্নদের বাংলাদেশে আগমনের ব্যাপারে এজতেমার মুরম্নবি্বদের আপত্তির কারনে ওই ৬ টি দেশ সমূহের মুসুলিস্নরা এবার বাংলাদেশে আসতে পারেন নি৷ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তাবলিগের কাজে বের হওয়ার জন্য এবার এজতেমা স্থলে দ্বিতীয় পর্বে প্রায় ৫ হাজার জামাত তৈরি হয়েছে বলে এজতেমার আয়োজক সূত্রে জানাগেছে৷ আগামী ১৫-২০ দিনের মধ্যে এসব জামাত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়বে বলে জানিয়েছে তাবলিগ সূত্র৷ বিভিন্ন ভাষা-ভাষী ও মহাদেশ অনুসারে এজতেমা ময়দানে নির্মিত মোট ৩টি বিদেশী নিবাসে এসব বিদেশী মেহমানগণ অবস্থান করেন৷ সেখানে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে৷

১০ কি.মি. এলাকা জুড়ে মানব বলয় \\ বিশ্ব এজতেমা দ্বিতীয় দফায় তিন দিনব্যাপি এই দ্বিতীয় বৃহত্তম জমায়েতের শেষ দিন রবিবার ভোর থেকেই আখেরি মোনাজাতে শামিল হতে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা রাজধানী ঢাকা ছাড়াও পাশর্্ববতর্ী এলাকাগুলো থেকে ট্রেন, বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস, জীপ, কার, রিকশা-ভ্যান এবং নৌকাসহ নানা ধরনের যানবাহনে এবং পায়ে হেঁটে এজতেমা ময়দানে পৌঁছেন ধর্মপ্রাণ মুসল্লীরা৷ এছাড়া ভোর থেকেই এজতেমা ময়দানের দক্ষিণে খিলক্ষেত, বিশ্বরোড থেকে এবং উত্তরে গাজীপুরের ভোগড়া বাইপাস চৌরাসত্মা, পূর্বে পূবাইল মীরের বাজার, পঁশ্চিমে আশুলিয়া পর্যনত্ম রিকসাসহ সকল ধরনের যান চলাচল বন্ধ রাখার ফলে সকাল থেকেই দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে ইজতেমা অভিমুখে ছুটতে থাকে মুসলস্নীদের কাফেলা৷ এতে তুরাগের তীরকে কেন্দ্র করে কয়েক বর্গকিলোমিটার জুড়ে ধর্মপ্রাণ মানুষের বিশাল মানব বলয় সৃষ্টি হয়৷ মোনাজাত শুরম্নর আগেই সকাল ১০টার মধ্যে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় তুরাগ তীরের পুরো ইজতেমাস্থল ও চারপাশের বিসত্মীর্ণ এলাকা৷ এতে এলাকা পরিণত হয় এক বিশাল জনসমুদ্রে৷

এজতেমা আয়োজক কমিটির বক্তব্য \\ বিশ্ব তাবলীগ জামাতের মুরম্নব্বীরা জানান, সারা বিশ্বে তাবলীগের দাওয়াত পৌঁছে যাওয়ায় পর্যায়ক্রমে এজতেমায় শরীক হওয়া মুসল্লীদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে৷ বর্তমানে বিশ্ব এজতেমা অনুষ্ঠানের সময় টঙ্গী তুরাগ তীরের এ বিশাল ময়দানেও স্থান সংকুলান হচ্ছে না৷ আগত মুসল্লীদের যাতায়াতেও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে৷ তাই বিশ্ব এজতেমায় অংশগ্রহণকারীদের অসুবিধা ও দুর্ভোগের কথা চিনত্মা করে ২০১১ সাল থেকে দুই দফায় ইজতেমা অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হয়েছে৷ যাঁরা প্রথম দফায় (পর্বে) বিশ্ব ইজতেমায় যোগ দিবেন তাঁরা দ্বিতীয় পর্বে অংশ নিতে পারবেন না৷ প্রথম পর্বের আখেরী মোনাজাত শেষে মুসল্লীরা ময়দান ছেড়ে দেওয়ার পর দ্বিতীয় পর্বে জেলা ওয়ারি (খিত্তা বিশেষ) মুসল্লীরা ময়দানে এসে অবস্থান নেন, বয়ান শুনেন এবং দ্বিতীয় পর্বের আখেরী মোনাজাতে অংশ নেন৷ এবারের বিশ্ব এজতেমায় সর্বাধিক মুসলিস্ন এসেছেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত থেকে৷

টেলিভিশন-মুঠোফোন ও ওয়্যারলেস সেটে মোনাজাত \\ এজতেমা মাঠে না এসেও মোনাজাতের সময় হাত তুলেছেন অসংখ্য মানুষ৷ টঙ্গীর এজতেমাস্থল থেকে প্রায় ১৫ কিমি দূরে কনফারেন্সের মাধ্যমে গাজীপুরের চান্দনা চৌরাসত্মায় মসজিদের মাইকে আখেরী মোনাজাত সম্প্রচার করা হয়৷ এখানে কয়েক হাজার নারী পুরম্নষ ঈদগাহ মাঠে এবং পাশর্্ববর্তী সড়কে ও ভবন গুলোতে জড়ো হয়ে মোনাজাতে অংশ নেন৷ এছাড়াও জেলার বিভিন্ন এলাকায় টেলিভিশন, ওয়্যালেস সেট ও মুঠোফোনের মাধ্যমে মোনাজাত প্রচার করা হয়৷ এসব স্থানেও পুরম্নষদের পাশাপাশি নারীদের ব্যাপক উপস্থিতি ছিল৷ আবার টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে সরাসরি সম্প্রচার করার কারনে অনেকে বাসায় বসে মোনাজাতে অংশ নিয়েছে৷ আবার দেশ বিদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অনেকে এজতেমাস্থলে অবস্থানকারীর সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করেও মোনাজাতে শরীক হয়েছেন৷

থ্রিজি মোবাইলে দেশ বিদেশে আখেরী মোনাজাত \\ টঙ্গীর বিশ্ব এজতেমা ময়দানে মোবাইল ফোনে থ্রিজি মোবাইল ব্যবহারকারীরা নিজের ছবিসহ ময়দানের পুরো দৃশ্য নিয়ে নিকট আত্মীয়স্বজনদের সাথে মোনাজাতে অংশগ্রহণ করেছেন৷ থ্রিজি মোবাইল ব্যবহারকারীরা দেশ বিদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকা তাদের প্রিয় মানুষদের সঙ্গে একত্রে মোনাজাতে অংশ নিতে পেরে খুবই আনন্দিত হয়েছেন৷ মোবাইল ফোনে একে অপরকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সরাসরি দেখাদেখি করে ৩২ মিনিটের মোনাজাতে অংশ নেন হাজার হাজার মানুষ৷ মোবাইল ফোনের বিভিন্ন অপারেটরের থ্রিজি মোবাইল ব্যবহার কারীরা এ সুবিধা ভোগ করতে পেরেছেন গতকালকের আখেরী মোনাজাতে৷ তবে নেটওয়ার্ক সমস্যা বা স্বল্পতার কারনে সে সুযোগ পেতে নানা কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে৷

এজতেমার উিউটি করতে পুলিশ কন্সটেবলের মৃতু্য \\ বিশ্ব এজতেমায় দায়িত্ব পালন (ডিউটি) করতে গাজীপুরে এসে শনিবার রাতে ওয়াজেদ আলী (৪৫) নামের নরসিংদীর জেলার ট্রাফিক পুলিশের এক কনস্টেবল হৃদরোগে আক্রানত্ম হয়ে মারা গেছেন৷ এজতেমায় দায়িত্ব পালন করতে সম্প্রতি তিনি নরসিংদী থেকে গাজীপুরে আসেন৷ গাজীপুর মহানগরের মীরের বাজার এলাকায় ঢাকা-বাইপাস সড়কে দায়িত্বপালনকালে শনিবার রাত ৯টা ৫০মিনিটের দিকে হঠাত্‍ বুকে ব্যাথা অনুভব করেন কনস্টেবল ওয়াহেদ আলী৷ আশংকাজনক অবস্থায় টঙ্গীর শিলমুন এলাকাস্থিত ক্যাথারসিস হাসপাতালে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিত্‍সক তাকে মৃত ঘোষণা করেন৷ তার লাশ রাতেই গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইল জেলায় পাঠানো হয়েছে৷

ট্রেনে কাটা পড়ে মুসলিস্নর মৃতু্য \\ রবিবার সকালে কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় পারাবত ট্রেনের নীচে কাটা পড়ে দুই মুসলস্নী ঘটনাস্থলেই নিহত ও অপর ৩ জন আহত হয়েছে৷ হতাহতরা আখেরী মোনাজাতে অংশ নিতে পারাবত এঙ্প্রেস ট্রেনে চড়ে টঙ্গী যাওয়ার পথে এঘটনা ঘটে৷ এছাড়া এবার বিশ্ব এজতেমা ময়দানে এসে প্রথম পর্বে ১১ জন এবং দ্বিতীয় পর্বে ৭ মুসলস্নী হৃদরোগ ও বার্ধক্যজনিত রোগে মারা গেছেন৷

মোনাজাতে অংশ নিতে মানুষের ঢল \\ আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে রবিবার ভোর থেকেই টঙ্গীর এজতেমা অভিমুখে শুরম্ন হয় মানুষের ঢল৷ টঙ্গীর পথে শনিবার মধ্যরাত থেকেই ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে মোটর গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়৷ ফলে মোনাজাতে অংশ নিতে চার দিক থেকে লাখ লাখ মুসুলস্নী পায়ে হেঁটেই এজতেমাস্থলে পেঁৗছেন৷ সকাল ১০টার আগেই এজতেমা মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে মুসুলস্নীরা মাঠের আশে-পাশের রাসত্মা,অলি-গলিতে অবস্থান নেন৷ এজতেমাস্থলে পোঁছুতে না পেরে কয়েক লাখ মানুষ ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে মোনাজাতের জন্য পুরানা খবরের কাগজ, পাটি, সিমেন্টের বস্তা ও পলিথিন বিছিয়ে বসে পড়েন৷ এছাড়াও পাশর্্ববর্তী বাসা-বাড়ি-কলকারখানা-অফিস-দোকানের ছাঁদে, যানবাহনের ছাঁদে ও তুরাগ নদীতে নৌকায় মুসুল্লীরা অবস্থান নেন৷ যে দিকেই চোখ যায় সেদিকেই দেখা যায় শুধু টুপি-পাঞ্জাবি পড়া মানুষ৷ সবাই অপেক্ষায় আছেন কখন শুরম্ন হবে সেই কাঙ্খিত আখেরি মোনাজাত৷ এজতেমাস্থলের চারপাশের ৩-৪ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না৷ আখেরি মোনাজাতের জন্য রবিবার আশে-পাশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কলকারখানাসহ বিভিন্ন অফিস-আদালতে ছিল ছুটি৷ কোন কোন প্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা না করলেও কর্মকর্তাদের মোনাজাতে অংশ নিতে বাধা ছিল না৷ নানা বয়সী ও পেশার মানুষ এমনকি মহিলারাও ভিড় ঠেলে মোনাজাতে অংশ নিতে রোববার সকালেই টঙ্গী এলাকায় পেঁৗছেন৷

মুসলিস্নদের চিকিত্‍সা \\ টঙ্গী হাসপাতাল ও সিভিল সার্জনের তত্ত্ববধানে ক্যাম্প ও হাসপাতালসহ এজতেমা ময়দান এলাকায় স্থাপিত বিভিন্ন ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প গুলোতে গত তিন দিনে বিভিন্ন রোগে আক্রানত্ম প্রায় ২০ সহস্রাধিক মুসলিস্ন চিকিত্‍সা নিয়েছেন৷ এদের মধ্যে বেশ কয়েক জনকে ঢাকায় রেফার্ড করা হয়েছে এবং কয়েকজনকে টঙ্গী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে৷ এবারের বিশ্ব এজতেমায় হামদর্দ ফ্রি-মেডিক্যাল ক্যাম্প, গাজীপুর সিভিল সার্জন, টঙ্গী ঔষধ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতিসহ প্রায় ৫০টি স্বেচ্ছাসেবী, সরকারি ও বেসরকারী সংস্থা আগত মুসুলিস্নদের স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করেছে৷ সংশিস্নষ্টরা জানান, চিকিত্‍সা নিতে আসা মুসলিস্নদের অধিকাংশই জ্বর, ঠান্ডা, পেটের পীড়া জনিত রোগে আক্রানত্ম ছিল৷

মুসলিস্ন্লদের দুর্ভোগ \\ এজতেমা ময়দানের প্যান্ডেলের বাইরে পর্যাপ্ত মাইক সংযোজন ব্যবস্থা না নেয়ায় অনেক মুসলিস্ন্ল ক্ষোভ প্রকাশ করেন৷ বিশ্ব ইজতেমা মাঠে মহিলাদের কোন প্রকার সুযোগ সুবিধা না থাকলেও মোনাজাতে শরিক হতে হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মহিলা টঙ্গীর আশপাশে আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে অবস্থান নিয়ে মোনাজাতে অংশ নেয়৷ আবার অনেকে নদীর পাড়ে বা আশপাশে খোলা আকাশের নীচে অবস্থান নেন তারা৷ অজু, গোসল, খাওয়া-দাওয়াসহ ভোগানত্মির শেষ ছিল না তাদের৷

মোনাজাত শেষে যানজট \\ মোনাজাত শেষ হওয়ার পরপরই বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেয়া মানুষ একযোগে নিজ নিজ গনত্মব্যে ফেরার চেষ্টা করেন৷ এতে টঙ্গীর আশে-পাশের সড়ক-মহাসড়ক গুলোতে সৃষ্টি হয় জনজট ও যানজট৷ ফলে আবারো পায়ে হেটে রওনা দেয় মুসুলস্নীরা৷ আর পাঁয়ে হাঁটা মুসুলস্নীদের চাপে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা মুসুলস্নীদের যানবাহন রবিবার সন্ধ্যা পর্যনত্ম থেমে থাকে এজতেমা মাঠের আশে-পাশের এলাকায়৷

মোনাজাতে মহিলাদের অংশগ্রহণ \\ আখেরী মোনাজাতে অংশ নিতে বিভিন্ন এলাকা থেকে কয়েক হাজার মহিলা মুসলিস্ন্লও আগের দিন রাত থেকে এজতেমা ময়দানের আশেপাশে, বিভিন্ন মিলকারখানা, বাসা-বাড়িতে ও বিভিন্ন ভবনের ছাদে বসে আখেরী মোনাজাতে অংশ নেন৷

দ্বিতীয় পর্বে ২ হাজার জামাত তৈরী \\ বিভিন্ন দেশে তাবলীগের কাজে বের হতে এবার এজতেমা স্থলে দ্বিতীয় পর্বে প্রায় ২ হাজার জামাত তৈরী হয়েছে বলে এজতেমা আয়োজক সূত্রে জানা গেছে৷ এজতেমা ময়দানের উত্তর প্রানত্মে করা হয়েছে তাশকিলের কামরা৷ ময়দানের খিত্তাগুলো থেকে চিলস্ন্লায় নাম লেখানো ধর্মপ্রাণ মুসলস্ন্লীদের জামাতবন্দী করে তাশকিলের কামরায় জায়গা করে দেওয়া হয়েছে৷ আখেরী মোনাজাত শেষে এসব মুসলস্ন্লীগণ জামাতবন্দী হয়ে ঢাকার কাকরাইল মসজিদে গিয়ে রিপোর্ট করবেন৷ পরে তাবলীগের মুরম্নব্বীদের দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী তারা জামাতবন্দী হয়ে দ্বীনের দাওয়াতী মেহনতে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়বেন৷ এসব জামাতে কেউ কেউ তিন চিলস্না, এমনকি আজীবন চিলস্নার জন্য প্রস্তুত হয়েছেন৷ এ ছাড়া এক’শটির মতো বিদেশী জামাত তৈরী হয়েছে৷ প্রথম পর্বে প্রায় আড়াই হাজার জামাত তৈরী হয়েছে৷ আগামি ১৫-২০ দিনে মধ্যে এসব জামাত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়বে বলে সূত্র জানায়৷

নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও র্যাবের হেলিকপ্টার টহল \\ এবারের বিশ্ব এজতেমায় নজীরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে৷ পাঁচ সত্মরের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ১০ হাজারের অধিক পুলিশ ও র্যাবের পাশাপাশি রয়েছে ৩ হাজার সাদা পোষাকী গোয়েন্দা পুলিশ৷ আকাশ ও নৌ-পথের পাশাপাশি সড়ক পথগুলোতে খালি চোখ ছাড়াও ওয়াচ টাওয়ারের মাধ্যমে বাইনোকুলার দিয়ে মুসলস্ন্লীসহ সকলের চলার পথ ও কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে৷ এজতেমা চলাকালে গত কয়েকদিন ধরে র্যাবের নদী পথে স্পীডবোট ও আকাশ পথে হেলিকপ্টার সার্বৰণিক টহল অব্যাহত ছিল৷ এছাড়া এবার গাজীপুর জেলা পুলিশ ছাড়াও ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন রেঞ্জ থেকে কর্মকর্তাসহ ফোর্স এবং সারাদেশ থেকে র্যাব ইউনিটের কর্মকর্তাসহ ফোর্স এজতেমাস্থলে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রায় ১২ হাজার সদস্য নিয়োজিত ছিল৷ এসব কার্যক্রম অস্থায়ীভাবে এজতেমাস্থলে স্থাপিত পুলিশ ও র্যাবের পৃথক নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে মনিটরিং করা হয়েছে৷

পকেটমার আটক \\ টঙ্গী থানার ওসি ইসমাইল হোসেন জানান, বিশ্ব এজতেমা মাঠ ও আশপাশের এলাকা থেকে মুসলিস্নদের ব্যাগ টানা, পকেটকাটাসহ বিভিন্ন অপরাধে রবিবার পর্যনত্ম বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে৷

্এজতেমার ইতিহাস \\ এজতেমার আয়োজকসহ বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ১৯১০সালে ভারতের মাওলানা ইলিয়াস (রাঃ) তাবলীগ জামাতের প্রচলন শুরম্ন করেন মাওয়াত এলাকা থেকে৷ একটানা ১৯৪৪সাল পর্যনত্ম তিনি এই তাবলীগ জামাতের কার্যক্রম পরিচালনা করেন৷ তার ইনত্মেকালের পর তার একমাত্র ছেলে মাওলানা মোঃ ইউসুফ তাবলীগের দায়িত্ব গ্রহণ করেন৷ এর পর থেকে তাবলীগের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সমাবেশের আয়োজন করা হয়৷ এ বছর টঙ্গীতে ৪৯তম বিশ্ব এজতেমা অনুষ্ঠিত হলেও সর্ব প্রথম বাংলাদেশে এজতেমা অনুষ্ঠিত হয় ১৯৬৬সালে তাবলীগের প্রধান কেন্দ্র কাকরাইল মসজিদে৷ এর পর ১৯৪৮সালে দ্বিতীয় এজতেমা অনুষ্ঠিত হয় চট্টগ্রামের হাজী ক্যাম্পে৷ পরবর্তীতে এজতেমা অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫৮সালে নারায়নগঞ্জ জেলার সিদ্দিরগঞ্জে৷ এসব এজতেমা তখন সীমিত আকারে অনুষ্ঠিত হতো বলে সেগুলো তখনো বিশ্ব এজতেমার মর্যাদা লাভ করেনি৷
১৯৬৬সালে টঙ্গীর রেল স্টেশনের পাশে পাগাড় নামক স্থানে অনুষ্ঠিত এজতেমায় সর্বপ্রথম বাংলাদেশ ছাড়াও বিদেশী বেশ কয়েকটি দেশের মুসুলস্নীগণ অংশ গ্রহণ করেন৷ ফলে এটি সে বছর থেকেই বিশ্ব এজতেমার মর্যাদা লাভ করে৷ সে বছর টঙ্গীর পাগাড়ে এজতেমা বৃহত্‍ পরিসরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল৷ ফলে সেখানে এজতেমায় অংশগ্রহণকারী মুসুলস্নীদের স্থান সংকুলান অত্যানত্ম দূরহ হয়ে পড়ে৷ ফলে পরের বছর অর্থাত্‍ ১৯৬৭সালে এজতেমা অনুষ্ঠিত হয় টঙ্গীর কহরদরিয়া বা তুরাগনদীর পূর্ব তীরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পশ্চিম পাশে৷ বিশাল পরিসরের এ খোলা ভূমি ছিল রাজউজের হুকুম দখলকৃত জমি৷ এর পর থেকে টঙ্গীর পাগারের এক বছর নিয়ে ও তুরাগের পাড়ে ১৬০ একর জায়গায় ১৯৬৭ সাল থেকে দীর্ঘ ৫০ বছর যাবত্‍ বিশ্ব এজতেমা একই স্থানে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে৷ একই স্থানে মুসুলস্নীদের স্থান সংকুলান না হওয়ায় এবং দূর্ভোগ লাঘবের লৰে এবার ৫ম বারের মতো ৫০তম বিশ্ব এজতেমা দুই পর্বে অনুষ্ঠিত হচ্ছে৷ উলেস্নখ্য ১৯৯৬ সালে একই বছর দুইবার বিশ্ব এজতেমা অনুষ্ঠিত হয়েছিল৷