ICU

দৈনিকবার্তা-ময়মনসিংহ, ১ ফেব্রুয়ারি: দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট-আইসিইউ) একরকম সোনার হরিণ’। রাজধানী ঢাকায় হাতে গোনা কয়েকটি হাসপাতালে আইসিইউ থাকলেও বেশির ভাগ জেলা হাসপাতালে নেই। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে তো কল্পনাও করা যায় না। ফলে মুমূর্ষু রোগীদের নিয়ে স্বজনদের ছুটতে হয় দূর-দূরান্তে, যেখানে আইসিইউ রয়েছে এমন হাসপাতালে। তবে সেখানে গেলেই শয্যা খালি বা ভালো চিকিৎসাসেবা পাওয়া যাবে এমন নয়। অনেক ক্ষেত্রেই সেখানে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক বা সেবিকা না পাওয়া, ওষুধ আনতে ও রোগ নির্ণয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় যত্রতত্র দৌড়াদৌড়ি, রোগীর পাশে বসে স্বজনদের রোগীর খবর রাখা-এ রকম নানা ঝক্কি পোহাতে হয়। কিন্তু একেবারে উল্টো চিত্র ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে। সেবা নিতে এসো, মানবতার সেবা দিতে যাও’-এ স্লোগান নিয়ে গত ১ জানুয়ারি থেকে আন্তর্জাতিক মানের এ ইউনিট যাত্রা শুরু করার পর ব্যতিক্রমী, সেবাধর্মী ও আধুনিক চিকিৎসাসেবা দিয়ে চলেছে এ অঞ্চলের মুমূর্ষু রোগীদের।

সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা জানান, ১০ শয্যার এ ইউনিটের অন্যতম সুযোগ-সুবিধা হলো অত্যাধুনিক লাইফ সাপোর্ট যন্ত্র ও সরঞ্জাম, সংকটাপন্ন রোগীদের ব্লাডগ্যাস অ্যানালিসিস, ইলেকট্রোলাইটস, হরমোনসহ সব প্যাথলজিক্যাল ও বায়োকেমিক্যাল রিপোর্ট, এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাম, ব্রংকোসকপি, ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রাফি, অপথালমোসকপিসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, রোগীদের একক ও কেন্দ্রীয় মনিটরিং ব্যবস্থা। ডিজিটাল প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারও রয়েছে এখানে। যেমন, ডিজিটাল ওয়ার্কিং স্টেশন, আইপি (ইন্টারনেট প্রটোকল) ক্যামেরার মাধ্যমে হাসপাতালের বাইরে থেকে সার্বিক কার্যক্রম মনিটরিং, ওয়েবসাইটের মাধ্যমে হাসপাতালের বাইরে থেকে রোগীদের সব তথ্য পর্যালোচনা ও চিকিৎসাপত্র সংযোজন বা বিয়োজন করা, ফেসবুক পাতায় ও খুদে বার্তার (এসএমএস) মাধ্যমে রোগীর সংকটমাত্রা জানা যায়। এ ছাড়া বহির্বিশ্বের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে টেলিমেডিসিন ও টেলিকনফারেন্সিং করা যায়। রোগ নিয়ে গবেষণারও সুযোগ রয়েছে এখানে। রয়েছে চিকিৎসক, নার্সদের জন্য সর্বাধুনিক পাঠক্রমে (কারিকুলাম) প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা।

জানা গেছে, এ ইউনিটের মূল দায়িত্বে রয়েছেন অধ্যাপক ডা. এ এন এম ফজলুল হক পাঠান। ইউনিটে প্রতি শিফটে একজন করে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক থাকেন। নার্সিং অফিসার রয়েছেন ১১ জন। এ ছাড়া ইন্টার্ন নার্স পাঁচজন করে দায়িত্বে থাকেন। গত ১৩ জানুয়ারি পর্যন্ত এ ইউনিটে ১৬ জন রোগী ভর্তি হয়। এর মধ্যে চারজন মারা গেছে। ওয়ার্ড ইনচার্জ মো. সাজেদুল আলম বলেন,প্রত্যেক রোগীকেই ওয়ার্ডে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হয়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, আইসিইউ হাসপাতালের নতুন ভবনের পাঁচতলায়। ইউনিটে প্রবেশের শুরুতেই রয়েছে রোগীর স্বজনদের জন্য বসার স্থান। রোগী এলে তা ইউনিট থেকেই দেখা যায়। অথবা একবার ফটকের কলিং বেলের সুইচ টিপলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এসে রোগীকে নিয়ে যাচ্ছেন। রোগীর স্বজনদের ইউনিটের ভেতরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। চিকিৎসক-নার্সরাই প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন। রোগীর স্বজনরা শুধু বাইরে বসে রোগীর খবর নিচ্ছে। আবার খবর নিতে গিয়েও কারো সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজন পড়ছে না। স্বজনদের বসার জায়গাতেই রয়েছে স্কোর কার্ড। এটি দেখেই তারা রোগীর অবস্থা জানতে পারছে। চিকিৎসাসেবা নিয়ে অভিযোগ, পরামর্শ বা মতামত রেজিস্টারে জানানোর সুযোগ রয়েছে। কোনো রোগীর স্বজনকে প্রয়োজন হলে মাইকে ডেকে নিচ্ছে কর্তৃপক্ষ। রোগীর স্বজনদের জন্য রাত যাপনের ব্যবস্থাও রয়েছে এখানে। রয়েছে পরিচ্ছন্ন টয়লেট ও বাথরুম। মুক্তিযোদ্ধা রোগীকে বিশেষ সম্মান দেওয়া হয় এ আইসিইউতে। এ ছাড়া গরিব রোগীদের জন্য রয়েছে বিনা মূল্যে চিকিৎসা সুবিধা। সাধারণ রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য কোনো টাকা দিতে হয় না। হাসপাতালে সরবরাহ করা সব ওষুধই চিকিৎসক-নার্সরা সংগ্রহ করে রোগীদের দিয়ে থাকেন।

এ ইউনিটে আত্মীয়র চিকিৎসা করাতে এসেছেন শহরের খাগডহর এলাকার জামেলা খাতুন (৫০)। তিনি বলেন, এই হানে এত সুবিধা এইডা চিন্তাই করণ যায় না। ডাক্তার, নার্স সকলেই খুব ভালা।ডা. এ এন এম ফজলুল হক পাঠান বলেন, রোগীর সুচিকিৎসায় প্রয়োজন চিকিৎসকসহ আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি, উপযুক্ত পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা। এ ইউনিটে সব কিছুই রয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক মানের ইউনিট। এ অঞ্চলের মুমূর্ষু রোগীদের জন্য এটি বড় ধরনের আশীর্বাদ।

তিনি হাসপাতালে এ ইউনিট চালু ও সর্বাধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ করার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. দীন মোহাম্মদ নূরুল হক ও পরিচালক অধ্যাপক ডা. আব্দুল হান্নানের প্রতি কৃতজ্ঞতাও জানান।