minister-porished

দৈনিকবার্তা-ঢাকা, ২ ফেব্রুয়ারি: বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মোবাইলে গোপন কথোপকথন নিয়ে মন্ত্রিসভায় তোলপাড় হয়েছে৷ সোমবার মন্ত্রিসভার নিয়মিত এই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ওই ফোনালাপগুলো শোনানো হয় জানিয়েছেন একাধিক মন্ত্রী৷ ওই ফোনালাপ শুনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সত্যি সত্যিই তো উনি (খালেদা জিয়া) নাশকতার নির্দেশ দিয়েছেন, বলেন এক মন্ত্রী৷

সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে খালেদা জিয়ার বেশ কয়েকটি মোবাইলে গোপন কথোপকথনের অডিও বার্তা শোনানো হয়৷এক অডিওতে খালেদা জিয়া মোবাইলে চট্টগ্রামের এক নেতাকে বলেন, আপনার এটা করেন, খসরুর বাধা শোনবেন না৷ বাধা দিলে তাকে বের করে দেবো৷ এ অডিও রেকর্ডসহ খালেদা জিয়ার আরো কিছু দিকনির্দেশনামূলক মোবাইল কথোপকথন মন্ত্রিসভায় বাজিয়ে শোনানো হয়৷

তবে খালেদা জিয়ার এসব কথোপকথন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোনো মন্তব্য না করলেও, মন্ত্রিসভার অনেক সদস্যই বলেছেন- এটি চিহ্নিত করা উচিত্‍৷অপর এক অডিও বার্তায় খালেদা জিয়াকে বলতে শোনা যায়, রাজধানীতে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে কেন লোক হয় না? এ বিষয়ে খালেদা জিয়া বিভিন্ন নেতাকর্মীদের কাছে তা জানতেও চেয়েছেন৷

এক বিশ্বস্ত সূত্র মন্ত্রিসভায় খালেদা জিয়ার কথোপকথন নিয়ে আলোচনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন৷ বৈঠকের নির্ধারিত আলোচ্যসূচি শেষ হওয়ার পর সেখানে বসেই খালেদা জিয়ার ফোনালাপের অডিওগুলো শোনেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মন্ত্রিপরিষদের উপস্থিত সদস্যরা৷

উল্লেখ্য, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয় ও তার আশপাশে বর্তমানে মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে৷ সেই সঙ্গে কার্যালয়ে থাকা টেলিফোন লাইনটিও বিচ্ছিন্ন৷নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই মন্ত্রী বলেন,বৈঠকের আলোচ্যসূচি শেষ হওয়ার পর অনির্ধারিত আলোচনার সময় সভাকক্ষে বসেই ফোনালাপের অডিওগুলো শোনেন শেখ হাসিনা৷

চার বছর আগে ঢাকায় বিএনপির একটি সমাবেশের সময় দলের কয়েকজন নেতার সঙ্গে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কয়েকটি টেলিফোন সংলাপের অডিও টেপ ঘুরছে ইউটিউবে, যাতে তাকে নেতাদের নানা নির্দেশ দিতে শোনা যায়৷বাংলা লিকস নামের একটি একাউন্ট থেকে আপলোড করা এসব কথোপকথন সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে৷ খালেদার এসব নির্দেশ নাশকতা ঘটনোর উদ্দেশ্যেই-এমন কথা রয়েছে অডিও ফাইলগুলোর শিরোনামে৷

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন মন্ত্রী বলেন,মন্ত্রিসভার বৈঠকে সিনিয়র মন্ত্রীদের পাশাপাশিপ্রতিমন্ত্রীরাও খালেদা জিয়ার নির্দেশে ওই সময় যারা নাশকতায় অংশ নিয়েছিল, তাদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান৷ তবে প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে আর কিছু বলেননি৷

২০১১ সালের ১৮ ডিসেম্বর ঢাকায় মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশে সারাদেশ থেকে জনসমাগমের প্রস্তুতি নিয়েছিল বিএনপি৷ অনুষ্ঠানস্থল ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে সকালে আগতদের পুলিশ লাঠিপেটা করে বের করে দিলে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ বাঁধে এবং তা ছড়িয়ে পড়ে অন্য জেলাগুলোতেও৷ঢাকায় বোমা বিস্ফোরণে একজন মারা যায়, পোড়ানো হয় কয়েকটি গাড়ি৷ সিলেটে বাসে আগুন দেওয়া হলে পুড়ে মারা যান এক যাত্রী৷বাংলা লিকস খালেদার যে পাঁচটি অডিও টেপ প্রকাশ করেছে, তার চারটিই ওই সমাবেশ শুরুর আগে কয়েকজন নেতার সঙ্গে তার কথোপকথন৷

প্রথম টেপটিতে অন্য প্রান্ত থেকে খালেদা জিয়ার কাছে জানতে চাওয়া হয়- ম্যাডাম, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রোগ্রামটা কি অন থাকবে?তখন খালেদাকে বলতে শোনা যায়- এখন পর্যন্ত অন থাকবে৷ কিন্তু ওখানে কেউ থাকবে না৷ ছেলে- পেলেরা সব রাস্তায় থাকবে৷ ভেতরে কাউকে আমি দেখতে চাই না৷ ছেলেরা সব রাস্তায় যাবে৷ঢাকা মহানগর বিএনপির তত্‍কালীন আহ্বায়ক সাদেক হোসেন খোকা ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সালামকে লোক নামানোর নির্দেশও দিতে শোনা যায় খালেদাকে৷ খোকা আর সালামকে বলে দেন, বেশি করে লোক নামাতে৷ ওরা যদি লোক নামাতে না পারে, দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিক৷ আমি রাস্তায় লোক দেখতে চাই৷

এরপর খালেদাকে বলতে শোনা যায়- আপনি কি ওদের সঙ্গে কথা বলেছেন৷অন্য প্রান্ত থেকে যখন জি্ব বলে আরও কিছু বলা শুরু হয়, তখন তাকে থামিয়ে দেন বিএনপি চেয়ারপারসন৷ না না, ওই যে, অন্যদের, আপনি যাদের সঙ্গে কথা বলেন৷ ওরা এখনো নামেনি কেন?…আরও নামাতে বলেন৷আমাদের লোকজনদের বল, সব প্রেস ক্লাব ও ইঞ্জিনিয়ার (ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশন) ছেড়ে রাস্তায় চলে যাও৷ কাউকে আমি ওখানে দেখতে চাই না৷ ওখানে শুধু মুক্তিযোদ্ধা যেগুলো আসছে, ওগুলো থাকবে৷ আর সব রাস্তায়৷

দ্বিতীয় কথোপকথনে তত্‍কালীন মহানগর বিএনপি সাধারণ সম্পাদক আবদুস সালামকে খালেদা বলেন, তাড়াতাড়ি করে যত পার পাঠাও ােক৷ দেরি করো না, দেরি করলে অসুবিধা হয়ে যাবে৷ বুঝছ৷তৃতীয় কথোপকথনে বিএনপির জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামীকে সক্রিয় করতে একজনকে নির্দেশ দেন খালেদা৷

জামায়াতকে বলেন, ওদের লোকজন নামাই দিতে বলেন৷ শুধু ঢাকায় না, সব জায়গায়৷… আর মৃদুলকে বলেন যে ও ওর জায়গাটা ভাল করে করতে৷চতুর্থ কথোপকথনটি খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাদেক হোসেন খোকার৷খালেদা বলেন, আপনার কমিশনারদের বলুন, যার যার এলাকায় নিয়ে যাক৷ রাস্তাগুলো ব্লক করে দিক আর কী৷…এলাকা ভিত্তিক৷

পঞ্চমটিতে চট্টগ্রামের গোলাম আকবর খন্দকারের সঙ্গে চট্টগ্রাম মহানগর কমিটি নিয়ে কথা বলেন, যাতে নগর বিএনপির সভাপতি আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত হোসেনের নাম এসেছে৷ ডা. শাহাদাত দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছেলে ও বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত৷

খালেদাকে বলতে শোনা যায়, শাহাদাতকে বলেছি, একটা কাজের দায়িত্ব দিয়েছি৷ খসরু যেন কোনো কাজে বাধা না দেয়,তাকে এই মেসেজ দেন৷অন্য ট্রান্ত থেকে কিছু বলতে চাইলে খালেদা বেশ জোরের সঙ্গে বলেন, সে বাধা দিচ্ছে, আপনি তাকে বলে দেন৷ বলে দেন যে কোনো কাজে বাধা দেবে না৷ বাধা দিলে আমি ইমিডিয়েটলি রিমুভ করব তাকে৷এক পর্যায়ে অন্য প্রান্তের ব্যক্তির ওপর বিরক্ত হয়ে খালেদা বলেন, আপনি ডিপ্লোমেট ( গোলাম আকবর খন্দকার খালেদার শাসনামলে ওমানের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন) ছিলেন, বাট ইউ ডোন্ট নো হাউ টু টক৷আপনি ইমিডিয়েটলি খসরুকে বলেন, কোনো বাধা দেবে না, বুঝছেন কি না৷

খালেদা ছাড়াও বিএনপি নেতা আমানউল্লাহ আমান,সাদেক হোসেন খোকা,মারুফ কামাল খান ও খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের দুজন কর্মচারীকেও টেলিফোনের অন্যপ্রান্তে নাশকতা চালানোর নির্দেশ দেওয়া সম্বলিত কথোপকথন পাওয়া যাচ্ছে ইউটিউবটির ওই একাউন্টে৷এর আগেও একাউন্টটিতে যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, শমসের মবিন চৌধুরী-তারেক রহমান,এম কে আনোয়ার, জয়নাল আবদীন ফারুকের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক আলাপের অডিও টেপ আপলোড করা হয়৷