nirob-burigonga-08-12-15

দৈনিকবার্তা-ঢাকা, ০৯ ডিসেম্বর ২০১৫: ইসমাইল হোসেন ওরফে নিরব পানিতে পড়ার আধা ঘণ্টা বা ৩০ মিনিটের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়েছে। বুধবার সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিরবের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য বলা হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে ফরেনসিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান কাজী আবু সামা সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেন।তিনি আরো বলেন, পানিতে ডুবেই মৃত্যু হয়েছে শরীরে গভীর কোনো ক্ষতের চিহ্ন নেই। শুধু রোলিংয়ের (গড়ানো) কারণে পেট, কপালে ও মুখে কিছু জখম রয়েছে। এ চিকিৎসক জানান, নীরবের পাকস্থলিতে যে খাবার পাওয়া গেছে, তা পরীক্ষা করে মনে হয়েছে মৃত্যুর ঘণ্টাখানেক আগে খেয়েছিল শিশুটি।

এছাড়া পেটে নর্দমার কিছু পানিও পাওয়া গেছে।এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, দুপুরে খাওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যে মারা গেছে এটা আমরা বলতে পারি। ম্যানহোলের ভেতরে কোনো খালি জায়গা ছিল কি না, সেখানে তার ভেসে থাকার সুযোগ ছিল কি না- তা তো নিশ্চিত করে বলা যায় না।নীরবের বাবা রেজাউল করিম বলেন, মাদারিপুরের কালকিনী উপজেলার বনগ্রামে তাদের গ্রামের বাড়িতে দাফন হবে তার ছেলের।কদমতলীর শ্যামপুর পালপাড়ায় মঙ্গলবার বিকাল ৪টার দিকে বন্ধুদের সঙ্গে খেলার সময় নীরব ড্রেনে পড়ে যায় বলে পুলিশ ও স্বজনরা জানান।

খবর পেয়ে ঘটনাস্থল ও আশপাশের নালায় নেমে তল্লাশি শুরু করেন ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিরা। প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা পর বুড়িগঙ্গার তীরে আরেক নালার তারের জালে আটকে থাকা অবস্থায় অচেতন নীরবকে খুঁজে পান এক উদ্ধারকর্মী।এরপর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক রাত ৯টার দিকে শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন।নিরবের জন্ম মাদারিপুরে। জন্মের পরই রাজধানীর শ্যামপুরের পালপাড়ায় বরইতলায় চলে আসে নিরবের পরিবার। এখানে নিরবের বেড়ে ওঠা। খেলার সঙ্গী-স্থানীয় শিশুরা। বাসার আশপাশেই খেলা করত সে। দূরে কোথাও যেত না। গতকাল মঙ্গলবার পৌনে চারটার দিকে নিবর বাসা থেকে বের হয়। বের হওয়ার ১০ মিনিটের মধ্যেই পরিবারের লোকজন নিরবের নালায় পড়ে যাওয়ার খবর পায়।

শ্যামপুরের পালপাড়ায় বরইতলায় সবুজ নামের একজন কাছ থেকে টিনশেডের একটি ঘর এক বছর আগে ভাড়া নেয় নিরবের বাবা রেজাউল ইসলাম ও মা নাজমা বেগম। তাদের বাড়ি থেকে ৫০০ গজ দূরে ওই নালা।ইসমাইল হোসেন নিরবের চাচা সোহরাব আলী বলেন, এ ঘটনায় কোনো মামলা করা হবে না। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকেই সরাসরি নিরবের মরদেহ মাদারীপুরে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হবে।

ম্যানহোলের গর্তে পড়ে মঙ্গলবার মারা যাওয়া ছয় বছরের শিশু ইসমাইল হোসেন নীরবের বাবা এ ঘটনার জন্য কাউকে দায়ী না করে বলেছেন, তিনি মামলা করবেন না। বুধবার সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নীরবের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য আনা হলে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।নীরবের বাবা রেজাউল বলেন,আমি আমার ছেলের মৃত্যুর জন্য কাউকে দায়ী করছি না এবং এ ব্যাপারে মামলাও করব না। তবে আমার ছেলের মতো যেন আর কোনো বাবা-মা সন্তান না হারায়। তবে তিনি শ্যামপুর এলাকায় খোলা ম্যানগুলোর ওপর সরকারি নজরদারির প্রসঙ্গ টেনে বলেন, আমি সরকারের কাছে আবেদন করি,ওই এলাকার সমস্ত খোলা ম্যানহোলের প্রতি যেন তারা দৃষ্টি দেয়।

বুধবার সকালে ঢামেকের ফরেনসিক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় প্রধান ডা. কাজী মো. আবু সামা, সহকারী অধ্যাপক ডা. একেএম শফিউজ্জামান, প্রভাষক ডা. প্রদীপ বিশ্বাস ও ডা. খবির সোহেলকে নিয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ড নীরবের ময়নাতদন্ত করেন। ময়নাতদন্ত শেষে ডা. কাজী মো. আবু সামা সাংবাদিকদের বলেন, শিশুটি ম্যানহোলে পড়ার ১০ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যেই শ্বাসরোধ হয়ে মারা গেছে। পানির স্রোতের সাথে গিয়ে বিভিন্ন স্থানে লাগা আঁচড়ের দাগ পাওয়া গেছে।এর আগে মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে রাজধানীর কদমতলী থানার শ্যামপুরে বড়ইতলা জাগরণী মাঠের পশ্চিম দিকের পালপাড়া রোডের সুয়ারেজ লাইনে পড়ে যায় শিশুটি। প্রায় চার ঘণ্টা পর রাত ৮টা ২০ নিমিটের দিকে ঘটনাস্থলে থেকে এক কিলোমিটার দূরে শ্যামপুর লঞ্চ ঘাট এলাকায় মৃত অবস্থায় নীরবকে উদ্ধার করা হয়।

বিকেলে সুয়ারেজ লাইনে নীরবের পড়ে যাওয়ার খবর পেয়েই সেখানে লাফিয়ে পড়েন তার মা নাজমা বেগম। কিছুক্ষণ চেষ্টা করে তিনি ব্যর্থ হলে স্থানীয়রাও চেষ্টা করেন। এরইমধ্যে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় ফায়ার সার্ভিস। পানির তলদেশে দেখার জন্য এই বাহিনীর কাছে বিশেষ আলোর ব্যবস্থা থাকলেও ওই সুয়ারেজ লাইনের শিল্প-কারখানার বর্জ্য মিশ্রিত কালো পানির জন্য তাদের যন্ত্র কাজে আসছিল না। ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, তারা ঘটনাস্থল থেকে এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তাদের অভিযান চালাচ্ছিলেন। মূলত সুয়ারেজ লাইনের প্রত্যেকটা পিক ধরে ধরে এগোচ্ছিলেন তারা। ওই সুয়ারেজ লাইনের তীব্র স্রোতে শিশু নীরব ভেসে বুড়িগঙ্গায়ও চলে যেতে পারে- তাকে জীবিত উদ্ধারের আশা নিয়ে এমন আশঙ্কাও ছিল ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের।

সে আশঙ্কার কথা মাথায় রেখে বুড়িগঙ্গা স্লুইস গেটেও নজর রাখছিলেন তারা। সেই আশঙ্কা সত্যি করেই রাত সাড়ে ৮টার কিছু আগে ঘটনাস্থলে থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে শ্যামপুর লঞ্চ ঘাট এলাকা থেকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় নীরবকে।আজ থেকে প্রায় এক বছর আগে অর্থাৎ ২০১৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর রাজধানীর শাহজাহানপুরের রেলওয়ে মাঠসংলগ্ন পরিত্যক্ত পানির পাম্পের ৩শ ফুট গভীর পাইপে পড়ে যায় ৪ বছরের শিশু জিহাদ। ২৩ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস নাটকীয়তার পর শিশু জিহাদকে মৃত অবস্থায় ওয়াসার গভীর নলকূপের পাইপ থেকে বের করে আনে স্বেচ্ছাসেবী ও ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীরা। ওই ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার ক্ষমতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে।