১১৮টি গ্রামে অবরুদ্ধ রোহিঙ্গারা: ক্যাম্পে নানা রোগের ঝুঁকিতে শিশুরা

0
75

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের ১১৮টি রোহিঙ্গা গ্রামে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে অবরুদ্ধ হয়ে আছেন রোহিঙ্গারা। উত্তর রাখাইনের ৪৭৯ গ্রাম যখন সেনাবাহিনী ও রাখাইন মগদের সহিংসতার আগুনে পুড়ছিলো এবং জাতিগত নিধন ও গণহত্যার শিকার হচ্ছিলো, তখনও দক্ষিণ রাখাইনের এ ১১৮ গ্রাম ছিলো তুলনামূলক শান্ত ও কম ক্ষতিগ্রস্ত।এসব গ্রামের ধনী রোহিঙ্গারা তাদের গ্রামগুলো রক্ষা করতে কোটি কোটি টাকা সেনাবাহিনীর পেছনে ব্যয় করেও শেষ রক্ষা করতে পারছেন না। মাসাধিক সময় ধরে উগ্র বৌদ্ধদের হাতে অবরুদ্ধ থেকে এখন তারা বাংলাদেশের পথ ধরছেন রাতের আঁধারে।

এদিকে,মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নির্যাতন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। এইচআইভি ও এইডস, যক্ষ্মা, হাম, পোলিও, কলেরা ও ডায়রিয়াসহ অজ্ঞাত নানা রোগ ও জীবাণুতে তাদের আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ কারণে আগে থেকেই এসব রোগ প্রতিরোধে টিকা ও চিকিৎসা দেওয়া শুরু করেছে সরকার।ওই এলাকা থেকে গত এক সপ্তাহে ৫০ হাজারের মতো মানুষ বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা বলছে, এসব এলাকার প্রায় তিন লাখ মানুষ এখন বাংলাদেশে পালিয়ে আসার অপেক্ষায় আছেন। অনেকেই ১২ থেকে ১৪ দিন টানা হেঁটে বাংলাদেশ সীমান্তে এসে সীতা পাহাড়, নাইক্ষ্যংদিয়ার দ্বীপ ও পাশের অন্যান্য সমুদ্র পাড়ে জমায়েত হচ্ছেন। কিন্তু নৌযানের অভাবে তারা বাংলাদেশে আসতে পারছেন না।দক্ষিণ রাখাইনের সেন্ডওয়ে, রাথেডং ও বুথেডংসহ ১২টি টাউনশিপ এলাকায় অক্টোবরের শুরু থেকে নতুন করে সহিংসতা শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্র“প। এ অঞ্চলের ৩ লাখের মতো মানুষ এক মাস ধরে নিজ বাড়িতে বন্দি অবস্থায় আতংকের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। বাড়িতে থাকা নিত্যপণ্যের মজুদ শেষ হওয়ায় অমানবিক জীবন যাপনে বাধ্য হচ্ছেন।জাতিসংঘ বলছে, এসব এলাকায় বড় ধরনের সহিংসতার খবর না থাকলেও রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসা থেমে নেই। রাখাইন থেকে প্রাণ বাঁচাতে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পালিয়ে আসা থামছে না।এ পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া রাজ্যটি থেকে বাংলাদেশে আরও বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার ঢল নামতে পারে।জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় দপ্তরের (ওসিএইচএ) আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল মার্ক লোকক ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মুখপাত্র জোয়েল মিলম্যান জানিয়েছেন, রাখাইন থেকে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছেন। তবে কোনোকেনো দিন এ সংখ্যা ১০ হাজারও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। রাথেডংয়ের সাবেক চেয়ারম্যান হাজি ওসমান টেলিফোনে বলেন, প্রায় দুই মাস ধরে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচিকে (ডব্লিউএফপি) গ্রামটিতে খাবার সরবরাহ করতে দেওয়া হচ্ছে না। ফলে খাবারের সংকটে ওই এলাকার লোকজনের বাংলাদেশে চলে যাওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন, কেবল খাবার সরবরাহ বন্ধই নয়, রোহিঙ্গাদের বাড়ির বাইরে যেতেও দেওয়া হচ্ছে না। আবার প্রতিরাতে বাড়িতে এসে জোয়ান মেয়েদের ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। প্রতিটি গ্রাম থেকে সেনাবাহিনী আটক করে নিয়ে যাচ্ছে ২/৪ জন যুবককে। এ অবস্থায় সবাই রাতের আঁধারে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু মাসাধিককাল ধরে অনাহারে, অর্ধাহারে থাকা মানুষগুলো শারীরিক ও মানসিকভাবে এতোটাই দুর্বল হয়ে পড়েছেন যে, ১২/ ১৪ দিনের টানা হাঁটার পথ পাড়ি দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনেকেই রাস্তায় মারা যাচ্ছেন বলেও খবর মিলছে।গত মঙ্গলবারই মিয়ানমারের মংডু নুরুল্যাপাড়া থেকে বাংলাদেশে আসা কেফায়েত উল্লাহ বলেন, আমরা এখন আর মিয়ানমারে থাকতে পারছিনা। মাসেরও বেশি সময় ধরে আমাদের গ্রামগুলো মগরা অবরুদ্ধ করে রেখেছে। দিনের বেলায় তারাই অস্ত্র হাতে গ্রামে টহল দিচ্ছে।এদিকে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্র“প বলছে, ২০১২ সাল থেকে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের নামে রাখাইন যুবকদের সশস্ত্র করার যে পরিকল্পনা মিয়ানমার সরকার করেছিল তা ছিলো দীর্ঘ পরিকল্পনার ফল। এবারের সহিংসতায় সেটাকে কাজে লাগিয়েছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। প্রতিটি গ্রামে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, গণহত্যা ও গণধর্ষণে নেতৃত্ব দিয়েছে মগ যুবকদের নিয়ে গঠন করা এ কমিউনটি পুলিশের সশস্ত্র মগ যুবকরা। মিয়ানমারের একজন রাজনৈতিক নেতা জাফর আলম বলেন, দক্ষিণ রাখাইনের মানুষ অবরুদ্ধ অবস্থায় না খেয়ে মরছে। আবার বাংলাদেশে আসার সময় তারা মরছে সাগরে ডুবে। এটাই এখন রোহিঙ্গাদের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।মিয়ানামারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা শুরুর পর এখন পর্যন্ত সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয়ের জন্য বাংলাদেশে এসেছে সাড়ে পাঁচ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। তাদের জন্য কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে নির্ধারিত জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে অস্থায়ী আশ্রয় ক্যাম্প। তবে এই রোহিঙ্গারা রয়েছেন চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে ইতোমধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে ১৯ জন এইচআইভি পজেটিভ ব্যক্তি। তাদের পৃথক করে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে সম্প্রতি একজনের মৃত্যুও হয়েছে।স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা চিন্তা করে এবং বিপন্ন মানুষের মাঝে চিকিৎসা সেবা দিতে সরকারি ও বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এসেছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বিভিন্ন স্থানে গড়ে তোলা হয়েছে চিকিৎসা ক্যাম্প। এসব চিকিৎসা ক্যাম্পে চিকিৎসা সেবা নিচ্ছে রোহিঙ্গারা। এইচআইভি ছাড়াও হাম, যক্ষ্মা, পোলিও, কলেরা ও ডায়রিয়ার জীবাণু প্রতিরোধে টিকা ও চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার (১০ অক্টোবর) থেকে কলেরা প্রতিরোধে ৯ লাখ রোহিঙ্গাকে টিকা খাওয়ানোর কাজ শুরু হয়েছে।উখিয়ার বালুখালীর জুমের ছরা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের একটি মেডিক্যাল সেন্টারে চিকিৎসা নিতে আসা মরিয়ম, সলিম উল্লাহ ও আব্দুল খালেক জানান, দীর্ঘদিন ধরে কারও শরীরে জ্বর, কারও মাথা ব্যাথা ও কেউ বা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা করাতে আসছেন। ক্যাম্পে ফ্রি চিকিৎসা পেয়ে তারা মহাখুশি।উখিয়া কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কয়েকটি মেডিক্যাল সেন্টারে গিয়ে দেখা যায়, সারিবদ্ধভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশুরা। বিশেষ করে কলেরা প্রতিরোধ ও মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে সরকারের শুরু করা কর্মসূচির টিকা খেতে আসেন হাজার হাজার রোহিঙ্গা। তাদের অনেকেই জানান, জীবনে এই প্রথম কোনও রোগের জন্য টিকা খাচ্ছেন। তাও বাংলাদেশে।

কক্সবাজার সিভিল সার্জন ডা. আব্দুস সালাম বলেন, ‘ইতোমধ্যে রোহিঙ্গাদের মাঝে হাম, পোলিও, যক্ষ্মাসহ নানা রোগের টিকা ও চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়েছে। এই পর্যন্ত প্রায় দুই লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা শিশুকে টিকা খাওয়ানো হয়েছে। এছাড়া স্যানিটেশন, সুপেয় পানি সরবরাহ খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে করা হয়েছে।স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক প্রফেসর আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘রোহিঙ্গা ক্যাম্পে স্যানিটেশন ব্যবস্থা এখনও পুরোদমে তৈরি হয়নি। আস্তে-ধীরে সব রোহিঙ্গা ক্যাম্পে স্যানিটেশন সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। এতে করে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পাবে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে রোহিঙ্গারা। তবে না খেয়ে ও চিকিৎসা সেবা না পেয়ে কোনও রোহিঙ্গা মারা গেছে এরকম কোনও খবর এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালিক ‘এইচআইভি’ আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্তের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গারা চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে আছে। ইতোমধ্যে ১৯জন ‘এইচআইভি’ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে। তাদের আলাদা করে চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছে সরকার। এরমধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে। বিভিন্ন রোগের পাশাপাশি কলেরা রোগের ঝুঁকিতেও রয়েছে রোহিঙ্গারা। কারণ কলেরা রোগ একটি মহামারি আকারের সংক্রামক রোগ। এই রোগ দেখা দিলে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। তাই, আগে থেকেই এই রোগের টিকা কার্যক্রম শুরু করে সরকার। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে ছয় লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গাকে কলেরা রোগের টিকা খাওয়ানো হবে। এরপর আগামী নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আরও দুই লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গাকে এই টিকা খাওয়ানো হবে।