পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শিশুরা প্রহার ও যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে

0
132

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শিশুদের অবৈধভাবে কর্মে নিয়োগ করা হচ্ছে।সারা দিন কাজ করিয়ে মাত্র ১৩ টাকা পারিশ্রমিক দিয়ে বিদায় করার মতো ঘটনা ঘটছে কক্সবাজারে।অনেক ক্ষেত্রে শারীরিক নির্যাতন, মেয়েশিশুদের জোরপূবর্ক বিয়ে ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে।ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রান্ট’ (আইওএম)-এর বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।রয়টার্সের পক্ষ থেকে বেশ কিছু শিশু ও তাদের পরিবারের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। সেখানেও শিশু ও তাদের পরিবারের সদস্যরা এসব ঘটনা স্বীকার করে। রোহিঙ্গা শিশু মুহাম্মদ যুবায়েরের বয়স ১২ বছর। সে বলে, ‘আমাকে দিনে ২৫০ টাকা করে দেয়া হবে বলে সড়ক নির্মাণের কাজে নেয়া হয়। কিন্তু ৩৮ দিন কাজ করার পর আমাকে ৫০০ টাকা দিয়ে বিদায় করে (দিনে ১৩ টাকা) দেয়।শিশুটি আরও বলে, আমি যখন টাকা চাইলাম তখন আমাকে অশ্লীল ভাষায় গালি দিয়ে বের করে দেয়।তবে ওই সড়ক নির্মাণের ঠিকাদারের নাম বা কোথায় কাজ করেছে ভয়ে তা প্রকাশ করতে রাজি হয়নি যুবায়ের।এর পর এ শিশুটি একটি চায়ের দোকানে কাজ নেয়। সেখানে চার ঘণ্টার বিরতি দিয়ে আট ঘণ্টা করে দুই দফায় ১৬ ঘণ্টা কাজ করতে হয় তাকে।যুবায়ের জানায়, এ দোকানে এক মাস কাজ করার পর তাকে কোনো টাকা দেয়া হয়নি। দোকানটির মালিক দোকানের বাইরে যেতে দিত না। পরে যুবায়ের পালিয়ে শরণার্থী ক্যাম্পে চলে যায়।
যুবায়ের বলে, আমাকে যখন কোনো টাকা দেয়নি তখন আমি পালিয়ে ক্যাম্পে চলে যাই। আমি খুবই ভয় পাচ্ছিলাম। কারণ দোকান মালিক এসে আমাকে আবার ধরে নিয়ে যেতে পারে।মাত্র ১১ বছরের একটি মেয়েশিশুকে জোর করে বিয়ে দেয়া হয়েছে বলে আইওএমের কাছ থেকে তথ্য পেয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে এর সত্যতা পাওয়ার কথা জানায় রয়টার্স।শিশুটিকে বিয়ে দেয়ার কথা স্বীকার করে তার বাবা-মা রয়টার্সকে বলেন, যাদের কাছে বিয়ে দেয়া হয়েছে, তারা আমাদের এখানে থাকার জন্য সুযোগ-সুবিধা দেবে। আর্থিকভাবেও সুবিধা দেবে তারা।মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া ৬ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার মধ্যে ৫৫ শতাংশ শিশু, যার পরিমাণ সাড়ে ৪ লাখের ওপরে।এ বিষয়ে কক্সবাজার সহকারী পুলিশ সুপার আফজুরুল হক টুটুল রয়টার্সকে জানান, ক্যাম্পের আশপাশের ১১টি চেক পয়েন্ট স্থাপন করা হয়েছে। ফলে শিশুদের ক্যাম্প থেকে বাইরে যাওয়া বন্ধ করা সম্ভব হবে।তিনি বলেন, যদি কোনো রোহিঙ্গা শিশুকে কোথাও কাজ করতে দেখা যায়, তা হলে সেই প্রতিষ্ঠানের মালিকের শাস্তি হবে।বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শিশুদের অনেকেই বাংলাদেশ এসেছে মারাত্মক প্রহার ও যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। তাদের অনেককেই এই বয়সেই বাজে পরিবেশে কাজ সহ নানা ধরনের নিগ্রহের শিকার হতে হচ্ছে। বাংলাদেশে শরণার্থী শিবিরে হয়রানি ও পাচারের বিষয়টি তদন্ত করতে গিয়েই রোহিঙ্গা শিশুদের এমন অবস্থার চিত্র উঠে এসেছে আইওএম’র কাছে। আইওএম’র এসব তথ্য যাচাই করে তার সত্যতা পাওয়া গেছে বলে জানাচ্ছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। কক্সবাজারের সহকারী পুলিশ সুপার আফজুররু হক টুটুল রয়টার্সকে বলেছেন, শিশুরা যাতে ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে না পড়ে সেজন্য তারা এগারটি চেকপোস্ট বসিয়েছেন। রাখাইনে সেনাবাহিনী বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া, হত্যা, ধর্ষণসহ নানা ধরনের নির্যাতন চালানোর প্রেক্ষাপটে পরিবারসহ কিংবা পরিবার ছাড়া অন্যদের সাথে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা শিশুর মোট সংখ্যা এখন প্রায় সাড়ে চার লাখ। যা মোট শরণার্থীর ৫৫ শতাংশ। আইওএম বলছে রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য শরণার্থী ক্যাম্পের জীবন যে রাখাইনের চেয়ে খুব বেশি ভালো তা নয়। চরম দরিদ্রতা আর অপুষ্টিতো রয়েছেই, সাথে আছে এসব শিশুদের দিয়ে বিভিন্ন ধরনের কাজ করানোর জন্য দালালদের তৎপরতা। সাত বছর বয়সী রোহিঙ্গা ছেলে ও মেয়ে শিশুদের বাইরে গিয়ে কাজ করার ব্যবস্থা করারও কিছু তথ্য প্রমাণাদি পাওয়া গেছে। আইওএম ও রোহিঙ্গা অধিবাসীদের অনেকেই জানিয়েছেন অল্প বয়সী বাচ্চাদের অনেকে ফার্ম, নির্মাণ কাজ, মাছ ধরা, চায়ের দোকান চালানো কিংবা রিকশা চালানোর খবর পাওয়া যাচ্ছে। তবে মেয়ে শিশুরা গৃহপরিচারিকার কাজেই বেশি যাচ্ছে। একজন রোহিঙ্গা শিশুর অভিভাবক জানিয়েছেন, তার ১৪ বছর বয়সী কন্যা চট্রগ্রামে এক বাসায় কাজ করেছে এবং পরে পালিয়ে গেছে। এরপর সে যখন ক্যাম্পে ফিরে আসলো তখন সে এমনকি হাটতেও পারছিলোনা। তার মায়ের দাবি, বাংলাদেশী যাদের কাছে মেয়েটি ছিলো তারা তাকে শারীরিক ও যৌন নির্যাতন করেছে।তিনি বলেন, সেই বাসার মহিলার স্বামী ছিলো মদ্যপ এবং সে রাতে আমার মেয়েকে ধর্ষণ করতো। তারা আমাদের কোন কিছুই দেয়নি, কিছুইনা।এমন অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ সূত্র দিয়ে যাচাই করা যায়নি তবে রয়টার্স বলছে একই ধরনের তথ্য আইওএম এর হাতেও এসেছে। রয়টার্সের দাবি আইওএম বলছে, রোহিঙ্গা নারীদের যাদের সাক্ষাতকার নেয়া হয়েছে তাদের অনেকেই যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ ও ধর্ষণের পরে জোর করে বিয়ের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। শরণার্থী শিবিরগুলোতে শিশুদের কাদামাটির মধ্যে একা ও উদ্দেশ্যহীন ঘুরাঘুরি, বা তাঁবুর বাইরে বসে থাকতে দেখা গেছে। অনেককে সড়কের পাশে ভিক্ষা করতেও দেখা যাচ্ছে। জাতিসংঘ সংস্থাগুলোর কার্যক্রমের পর্যবেক্ষক ইন্টার সেকশন কো-অর্ডিনেশন গ্রুপ বলছ তারা এ মাসে প্রায় আড়াই হাজার শিশুকে পেয়েছে ক্যাম্পে যারা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে এবং এর প্রকৃত সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। রয়টার্সের সাথে কথা বলেছে এমন সাতটি রোহিঙ্গা পরিবার জানিয়েছে তারা তাদের শিশুদের কাজে দিয়েছে এবং তারা অল্প বেতনে বাজে পরিবেশে কাজ করছে, নানা ধরনের হয়রানিরও শিকার হচ্ছে। মোহাম্মদ জুবায়ের নামে ১২ বছর বয়সী একটি শিশু জানায় তাকে প্রথমে বলা হয়েছিলো দিনে ২৫০ টাকা দেয়া হবে কিন্তু সড়ক নির্মাণের কাজে ৩৮ দিন থাকার পর তাকে মাত্র ৫০০ টাকা দেয়া হয়েছে। কুতুপালং ক্যাম্পের এই শিশুটির অভিযোগ যে টাকা চাওয়ায় তাকে নির্যাতন সইতে হয়েছে যদিও অভিযুক্তদের পরিচয় প্রকাশ করেনি এই শিশুটি। পরে জুবায়ের একটি চায়ের দোকানে কাজ নেয় এবং সকাল থেকে মধ্যরাত অবধি কাজ করতে হয় তাকে। একই সাথে তাকে বলা হয়েছিলো কোন ভাবেই যেনো দোকানের বাইরে সে না যায়। শুধু ফোনে অভিভাবকদের সাথে কথা বলার সুযোগ মিলতো তার। “কিন্তু যখন আমাকে টাকা দেয়া হলোনা তখন আমি পালিয়ে আসি। আমি ভয় পাচ্ছিলাম যে তারা যদি আবার এসে আমাকে নিয়ে যায়”। আবার আইওএম এর তদন্তে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী অনেক রোহিঙ্গা অভিভাবক নিজেরাই তাদের কন্যাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে বিয়েতে রাজী হওয়ার জন্য। এদের মধ্যে অনেকেই আসলে পরিণত হয় দ্বিতীয় স্ত্রীতে। এসব দ্বিতীয় স্ত্রীদের প্রায়শই আবার তালাক দেয়া হয়। কোন অর্থনৈতিক সহায়তা ছাড়াই তারা পরিত্যক্তা হয়ে পড়ে। আইওএম এর একজন পাচার বিরোধী বিশেষজ্ঞ ক্যাটেরাইনা আরদানিয়ান রয়টার্সকে বলেন এ ধরনের নিগ্রহ শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে একটি স্বাভাবিক চিত্র। রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশুদের সুরক্ষায় জরুরি সহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তবে ইউনিসেফ ইতোধ্যেই জানিয়েছে যে রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য কিছু কার্যক্রম তারা শুরু করেছে। কক্সবাজারের শিবিরগুলোতে ইউনিসেফ অবশ্য ২২৮টি লার্নিং সেন্টার করে ইংরেজি ও বার্মিজ ভাষায় রোহিঙ্গা শিশুদেরকে অনানুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা দিচ্ছে। এ ধরনের লার্নিং সেন্টার বাড়িয়ে দেড় হাজার করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে সংস্থাটি। আর সেটা হলে হয়তো বেশীরভাগ রোহিঙ্গা শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা পাওয়ার বিষয়টি হয়তো নিশ্চিত হবে। বাংলাদেশ সরকারও জানিয়েছে স্বাস্থ্য ঝুঁকি এড়াতে জরুরী প্রয়োজনীয় টিকা কার্যক্রম চালানো হয়েছে শিবিরগুলোতে।