শহরের ৫৪ শতাংশের বেশি নারী সহিংসতার শিকার

0
100

অতীতের তুলনায় বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের পরিমাণ ও মাত্রা বেড়েছে জানিয়ে জাতীয় নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ফোরাম বলেছে, শহরাঞ্চলের নারী ও কন্যা শিশুরা সহিংসতার শিকার হচ্ছে বেশি।আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ (২৫ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর) পালনের অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলন করে এ তথ্য জানায় জাতীয় নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ফোরাম।সারা দেশে নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতন বন্ধের দাবিতে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ব্র্যাক, একশনএইড, আইন ও সালিশ কেন্দ্র এবং বাংলাদেশ মহিলা পরিষদসহ কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা পরিচালিত জরিপ থেকে নারীর প্রতি সহিংসতার বিভিন্ন পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়।এতে বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ফোরামের সদস্য সচিব মাহমুদা বেগম বলেন, ২০১৭ সালে আগের বছরের তুলনায় বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের পরিমাণ বেড়েছে।

নগরে নারী ও মেয়ে শিশুর প্রতি সহিংসতা বিষয়ক ‘কার শহর’ শীর্ষক একশনএইড পরিচালিত এক গবেষণার বরাত দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের শহর এলাকায় ৫৪ শতাংশের বেশি নারী সহিংসতার শিকার হয়।বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক সং¯’াটির পরিচালিত ওই গবেষণা জরিপে বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতার হার উ”চ দেখা গেছে জানিয়ে সবুজের অভিযান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মাহমুদা বলেন, গবেষণায় ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ।বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের বিচারে দীর্ঘসূত্রতার প্রসঙ্গ তুলে একশনএইড বাংলাদেশের কাশফিয়া ফিরোজ বলেন, “বিচারের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অনেকে বছরের পর বছর ধরে লেগে থাকতে পারে না, মামলা চালিয়ে নেওয়ার মতো আর্থিক অবস্থা থাকে না। যার ফলে নির্যাতিত নারী বা তার পরিবার বিচার পায় না।এসব ক্ষেত্রে একশনএইড ও জাতীয় নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ফোরাম ভুক্তভোগীদের সহযোগিতা করছে জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিচার আদায় করতেও সক্ষম হয়েছে।রাজধানীর গুলশানে ব্যবসায়ী লতিফুর রহমানের মেয়ে স্কুলছাত্রী শাজনীন তাসনিম রহমানকে ধর্ষণ ও হত্যার ১৯ বছর পর হত্যাকারী শহীদুল ইসলামের ফাঁসি কার্যকর নিয়ে কথা বলেন নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ফোরামের সভাপতি মমতাজ আরা।শাজনীন হত্যার বিচারের দীর্ঘ সময় পার হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, লতিফুর রহমানের মত প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর মেয়ের ধর্ষণ ও হত্যাকা-ের বিচারের জন্য যদি ১৯ বছর অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে বাংলাদেশে গরীব মানুষরা কতটুকু বিচার পায় তা ধারণা করে নেওয়া যায়।দ্রুততম সময়ে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন সংক্রান্ত সব অভিযোগের বিচার কার্যকর করার দাবি জানান তিনি।সংবাদ সম্মেলন থেকে বাংলাদেশে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সাতটি দাবি তুলে ধরা হয়।এতে অন্যদের মধ্যে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে বিভিন্ন জেলায় কাজ করা ফোরামের নারী অধিকার কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে, বাংলাদেশে শিল্প ও সেবা খাতের চাকরিতে নারীর অংশ গত তিন বছরে কমেছে। ২০১৩ সালে সার্বিকভাবে দেশের ১০০টি কর্মসংস্থানের মধ্যে ৩৩টি ছিল নারীর দখলে, ২০১৬ সালে তা কমে ২৮টিতে দাঁড়িয়েছে।নারীর কর্মসংস্থান নিয়ে ‘শ্রমবাজার পরিস্থিতি ২০০৬ থেকে ২০১৬’ শীর্ষক এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। এ গবেষণাটি করেছেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষক ইকবাল হোসেন। রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে বুধবার শুরু হওয়া ‘বিআইডিএস রিসার্চ অ্যালমানাক’ শীর্ষক সম্মেলনে এ গবেষণাটি উপস্থাপন করা হয়। এতে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মসংস্থান এবং উপজাতি জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান পরিস্থিতি নিয়ে আরও দুটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। এ দুটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইডিএসের গবেষক মিনহাজ মাহমুদ ও কাজী আলী তৌফিক।নারীর কর্মসংস্থানবিষয়ক গবেষণায় বলা হয়, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ অনুযায়ী, গত তিন বছরে বিভিন্ন খাতে নারীর কর্মসংস্থান কমেছে। যেমন ২০১৩ সালে শিল্প খাতে নারীর কর্মসংস্থান ছিল ২৩ দশমিক ৭ শতাংশ, ২০১৬ সালে তা কমে ১৬ শতাংশে নেমে এসেছে। সেবা খাতে ২০১৩ সালে নারীর অংশ ছিল ২৩ শতাংশ, তিন বছর পর তা কমে ২১ শতাংশ হয়েছে।কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশ কমে যাওয়ার ব্যাখ্যায় বলা হয়, ২০১৩ সালে রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর ঠিকা কাজ করা অনেক পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে নারীর কাজের সুযোগ কমে গেছে। আবার মানুষের আয় বাড়ায় অনেক নারী এখন ঘরের বাইরে কাজ করতে চান না। তবে আশার খবর হচ্ছে, আগামী কয়েক বছরে তৈরি পোশাক, চামড়া, তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধ, খেলনার মতো কয়েকটি খাতে নারী কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সুযোগ আছে। তবে এ জন্য বিশেষ দক্ষতা অর্জনে গুরুত্ব দিতে হবে।আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানবিষয়ক গবেষণায় বলা হয়, এ জনগোষ্ঠীর সিংহভাগই যেকোনো একটি কাজে নিয়োজিত থাকার পরও অর্ধেকের বেশি দরিদ্র। এর কারণ হলো আদিবাসীরা অপেক্ষাকৃত কম দক্ষতার ও কম উৎপাদনশীল কাজ বেশি করে। তাদের দক্ষতা বাড়লে দারিদ্র্য কমিয়ে আনা সম্ভব।সম্মেলনের প্রথম দিনের শেষ কর্ম অধিবেশনের বিষয়বস্তু ছিল আর্থিক বাজার ও অন্তর্ভুক্তি। এই অধিবেশনে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের ঝুঁকি ও মুনাফা নিয়ে একটি গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। এ ছাড়া প্রত্যন্ত অঞ্চলের দারিদ্র্য কমাতে ব্যাংক ও মোবাইল ফোনের ভূমিকা নিয়ে দুটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়।