৮ ফেব্র“য়ারি বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলার রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সতর্ক অবস্থানে আইনশৃঙ্খলা-রক্ষাকারী বাহিনী।রায়কে ঘিরে যেকোনও ধরনের নাশকতা এড়াতে বুধবার থেকে আগামী তিনদিন পুলিশের পাশাপাশি মাঠে থাকবে সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।বুধ, বৃহস্পতি ও শুক্রÑ এই তিনদিনকে বিশেষ ব্যবস্থার আওতায় নিয়েছে রাষ্ট্রের অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা। তাদের সঙ্গে সক্রিয় থাকবে গোয়েন্দারাও।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কায় রাজধানীসহ সারা দেশে নিরাপত্তাবলয় তৈরি করা হয়েছে। রেলপথ, সড়কপথ ও নৌপথসহ সবখানে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। ইতিমধ্যে রাজধানীতে কাল সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করেছে পুলিশ।রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠন এবং জামায়াতের নেতা-কর্মীদের ধরপাকড় চলছেই। তবে পুলিশ বলছে, নাশকতার আশঙ্কায় এবং বিভিন্ন মামলায় তাদের ধরা হচ্ছে।

আগামীকাল বৃহস্পতিবার বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলার রায়কে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠন এবং জামায়াতের নেতা-কর্মীদের ধরপাকড় চলছেই। তবে পুলিশ বলছে, নাশকতায় আশঙ্কায় এবং বিভিন্ন মামলায় তাদের ধরা হচ্ছে।ঢাকার বাইরে মাদারীপুর, বাগেরহাট, রাজবাড়ী, টাঙ্গাইল, নাওগাঁ, পিরোজপুর ও প গড়ে নতুন করে ১৮৯ বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীকে আটক ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার থেকে ও বুধবার দুপুর ২টা পর্যন্ত তাদের ধরা হয়। সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সূত্রে এ খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে।আটকদের মধ্যে মাদারীপুরে ১০, বাগেরহাটে ৫০, রাজবাড়ীর ৩, টাঙ্গাইলে ৪৫, নওগাঁয় ৫৫, প গড়ে ১৪ ও পিরোজপুরে ১২ জন রয়েছেন। এছাড়া সোমবার রাত থেকে সারা দেশে যানবাহন, মেস ও আবাসিক হোটেলগুলোতে অভিযান চলছে।

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলার রায় ঘিরে উত্তেজনার মধ্যে রাজধানীর প্রবেশপথগুলোতে তল্লাশির পাশাপাশি মহাসড়কে কড়া নজরদারি শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।বৃহস্পতিবার রায় বিপক্ষে গেলে বিএনপি সমর্থকরা ঢাকায় জড়ো হয়ে যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, সেজন্য মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে যানবাহনে ব্যাপক তল্লাশির পাশাপাশি রাজধানীতে নিরাপত্তা চৌকির সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। ঢাকা মহানগরী এলাকায় বৃহস্পতিবার ভোর থেকে সব ধরনের মিছিল জমায়েত নিষিদ্ধ করার কথা মঙ্গলবারই জানিয়েছিল পুলিশ।চট্টগ্রামের পুলিশও একই ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে । বৃহস্পতিবার ভোর থেকে বন্দরনগরীতে সব ধরনের দেশীয় অস্ত্র বহনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পাশাপাশি চট্টগ্রামের সিমেন্ট ক্রসিং থেকে পতেঙ্গার ১১ নম্বর ঘাট পর্যন্ত সড়কে বুধবার বিকাল ৪টা থেকে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।গাজীপুর ও নরায়ণগঞ্জেও বাড়তি সতর্কতা নিয়েছে পুলিশ, সন্দেহ হলেই যানবাহনে চালানো হচ্ছে তল্লাশি।

ঢাকার প ম বিশেষ জজ আদালতে বৃহস্পতিবার জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় ঘোষণার তারিখ রয়েছে। দোষী সাব্যস্ত হলে এ মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন সাজা হতে পারে।বিএনপির অভিযোগ, সরকার বিএনপি নেত্রীকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতেই ‘মিথ্যা’ এই মামলাকে রায় পর্যন্ত টেনে এনেছে। রায় বিপক্ষে গেলে রাজপথে নামার হুঁশিয়ারিও তারা দিয়ে রেখেছে।অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারাও রায়ের দিন মাঠে থাকার ঘোষণা দেওয়ায় তৈরি হয়েছে উত্তেজনা।এসএসসি পরীক্ষার মধ্যে দুই প্রধান দলের নেতাদের পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারিতে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা চলছে সাধারণ মানুষের মনে।

পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, রায়কে কেন্দ্র করে আমরা সতর্ক রয়েছি। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই আমরা নেব।পুলিশের নতুন মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী মঙ্গলবারই ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিয়েছেন।র‌্যাবও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে তল্লাশি অভিযান, টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়েছে বলে এ বাহিনীর মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান জানিয়েছেন।তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের স্বস্তি যাতে নষ্ট না হয়, তাদের মধ্যে যেন আতঙ্ক তৈরি হতে না পারে, সে চেষ্টা আমরা করছি।

আইনশৃঙ্খলা অভয় দেওয়ার চেষ্টা করলেও ২০১৫ সালের প্রথম তিন মাসে বিএনপি-জামায়াত জোটের টানা অবরোধ-হরতালে নাশকতার কথা মনে করে উৎকণ্ঠা কাজ করছে পরিবহন খাতের মালিক শ্রমিকদের মধ্যেও।পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের সরকারসমর্থক সংগঠনগুলো যে কোনো পরিস্থিতিতে মাঠে থাকার ঘোষণা দিলেও সাধারণ চালকরা বলছেন, রাস্তায় ঝামেলা হলে যানবাহনেরই ক্ষতি হয় বেশি। ফলে বৃহস্পতিবার গাড়ি বের করা নিয়ে অনেকেই ভাবতে শুরু করেছেন।আর বিএনপির কর্মসূচি ঠেকাতে অতীতে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে বিশেষ বিশেষ দিনে বাস চলাচল বন্ধ রাখতে বলার কথাও মনে করিয়ে দেন কয়েকজন চালক।

বঙ্গবন্ধু সেতু বা আরিচা হয়ে উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের যেসব বাস ঢাকার পথে আসে, সেগুলোর বেশিরভাগই রাজধানীতে ঢোকে গাবতলী হয়ে।দারুস সালাম থানার ওসি সেলিমুজ্জামান বলেন, রায় ঘিরে তারা গাবতলী এলাকায় বাড়তি জনবল নিয়োজিত করেছেন। সন্দেহ হলে যে কোনো বাস, ট্রাক বা পথচারীদের তল্লাশি করা হচ্ছে।টাঙ্গাইল, গাজীপুর থেকে ময়মনসিংহ রোড হয়ে রাজধানীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশ পথ উত্তরা। সেখানেও কড়া নজরদারি শুরু হয়েছে বলে উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি মো. আলী হোসেন খান জানিয়েছেন।তিনি বলেন, আবদুল্লাাহপুর এলাকার দুটি চেকপোস্টে জনবল বৃদ্ধি ছাড়াও পুলিশ সদস্যদের সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে।একই ধরনের কথা বলেছেন ডেমরা থানার ওসি এস এম কাওছার।নারায়ণগঞ্জ ছাড়াও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক হয়ে রাজধানীতে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশ পথ ওই এলাকা। র‌্যাব-১১ এর মুন্সিগঞ্জ ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার মো. নাহিদ হাসান জনি জানান, তারা রাজধানীর সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথ ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের নিরাপত্তা জোরদার করেছেন। চেক পোস্টে তল্লাশির পাশাপাশি বাড়ানো হয়েছে টহল।রাজধানীর আশপাশের জেলাগুলোতে আবাসিক হোটেল, বোর্ডিং হাউস আর মেস বাড়িগুলোর দিকেও নজর রাখতে বলা হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। সহকারী মহাপুলিশ পরিদর্শক (মিডিয়া) সহেলী ফেরদৌস বলেন, যে সব এলাকায় সিসি ক্যামেরা রয়েছে সেগুলোকে সচল রাখার পাশপাশি সব বিষয়ে সতর্ক থাকার জন্য পুলিশ সদস্যদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশপাশি আবাসিক হোটেলগুলোতে নিয়মিত তল্লাশি চালাতে বলা হয়েছে।গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ বলেন, তার এলাকায় বৃহস্পতিবার সব ধরনের সভাসমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাঁচ জনের বেশি একসঙ্গে চলাফেরা না করতে বলা হয়েছে। এছাড়া যানবাহনেও তল্লাশি চালানো হচ্ছে।রায়কে কেন্দ্র করে যে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খখলা ঠেকাতে প্রস্তুত থাকার কথা বলেছেন নরায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মোহাম্মদ মতিয়ার রহমানও।রাজশাহীর পুলিশ কমিশনার মো. মাহাবুবর রহমান জানান, তারা সভা সমাবেশ নিষিদ্ধ না করলেও সর্তক রয়েছেন এবং সময় বুঝে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন।

ভিডিও কন্ফারেন্স পুলিশ প্রধান কী কী নির্দেশনা দিয়েছেন জানতে চাইলে বরিশালের পুলিশ কমিশনার রুহুল আমীন সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে চাননি। তিনি বলেন, নির্দেশনার বিষয়টি ‘গোপনীয়’। তা বলা ‘ঠিক হবে না।তবে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বিভিন্ন রেঞ্জের ডিআইজি, প্রত্যেক জেলার পুলিশ সুপার এবং মহানগর পুলিশ কমিশনারদের কাছে যে নির্দেশনার চিঠি গত সপ্তাহে গেছে, সেখানে রায় ঘিরে ‘অস্থিতিশীল পরিবেশ’ সৃষ্টির চেষ্টা হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো, পুলিশ বা অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলা, গণপরিবহনে হামলা-অগ্নিসংযোগ, সরকারি- বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও রেলপথেও হামলার বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে পুলিশ বাহিনীকে।

বিশেষ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় কর্মরত সব সংস্থার সদস্যদের ছুটি আজ থেকে (বুধবার) বাতিল করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত তা বলবৎ থাকবে। রাষ্ট্রের একটি প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।ওই গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রের দাবি, রায় পরবর্তী সহিংসতা হতে পারে এমনটি বিবেচনায় রেখে সম্ভাব্য প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। যেসব জায়গায় সহিংসতা হতে পারে সেগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি কারা এগুলো ঘটাতে পারে তাদেরও একটি সম্ভাব্য তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। ওই তালিকা আইন প্রয়োগকারী প্রতিটি সংস্থার কাছে পাঠানো হয়েছে।সূত্র জানায়, নাশকতা হতে পারে এমন সম্ভাব্য স্পটগুলোতে আগে থেকেই পোশাকে ও সাদা পোশাকে পুলিশ সদস্যরা উপস্থিত থাকবেন। তারা গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।বিগত কয়েকদিনে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ অন্যান্য সিনিয়র নেতাকর্মীদের বক্তব্যে রায়কে ঘিরে বিএনপির কোনও ধরনের সহিংস কর্মসূচির আভাস পাওয়া যায়নি। তবু রায়ের পর তাৎক্ষণিক যেকোনও ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় এই তিনদিনকে বিশেষ ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে, বলে জানায় গোয়েন্দা সূত্রটি। এ কারণেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সবগুলো রাষ্ট্র্রীয় সংস্থাকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রাখা হযেছে। রাজধানী ঘিরে নেওয়া হয়েছে নিñিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

এরইমধ্যে মঙ্গলবার রাত থেকে রাজধানীর প্রতিটি প্রবেশমুখে বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা। যানবাহনে চালানো হচ্ছে তল্লাশি। মেট্রোপলিটন এলাকার বিভিন্ন পয়েন্টে বসানো হয়েছে চেকপোস্ট। সেখানেও রয়েছে কড়াকড়ি। নগরীতে বাড়তি নিরাপত্তার জন্য মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ।এছাড়া চেকপোস্ট বসানোর পাশাপাশি টহলও জোরদার করেছে র‌্যাব। সারা শহরে সার্বক্ষণিক টহলের ব্যবস্থা করেছে সংস্থাটি।সচিবালয়ের চারপাশের পর্যবেক্ষণ টাওয়ারগুলোকেও আধুনিক করা হয়েছে। গত ২/৩ দিন ধরে সেখানে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের সদস্যরা।এদিকে, ৮ ফেব্র“য়ারি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দুর্নীতি মামলার রায়ের দিন ঢাকার রাস্তায় দাঁড়িয়ে বা বসে কোনও ধরনের মিছিল করা যাবে না বলে ৬ ফেব্রয়ারি ঘোষণা দিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। রাজধানীতে সব ধরনের লাঠি, ছুরি, চাকু বা ধারালো অস্ত্র, বিস্ফোরক দ্রব্য ও দাহ্য পদার্থ বহন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।