ফাগুনের আগুনে ঋতুরাজ বসন্তকে বরণ

শীতের মৌনতা ভেঙ্গে বাংলার প্রকৃতিতে আজ এসেছে বসন্ত। পৌষ আর মাঘের শীতার্ত দিনগুলোর পরে ফ্লাগুন মাসের প্রথম দিনে বাঙালি বরণ করে নেয় তাদের প্রিয় বসন্তকে।বাঙালি ললনার পরনে হলুদ রঙের শাড়ীতে লাল পাড় আর তরুণ-যুবাদের হলুদ পাঞ্চাবী, কোর্তা গায়ে দিয়ে বসন্তের প্রথম দিন জমজমাট ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির চত্বর, শাহবাগ আর রমনার সবুজ প্রান্তর। ঋতুরাজ বসন্ত উদযাপন চলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায়। উত্তুরে হিমেল হাওয়া থেমে গেল; দখিনা বাতাসে ঘুচে গেল পাতা ঝরার রিক্ত-বেদনা, নগরে এল বসন্ত।ফাগুনের প্রথম প্রহরে ষড়ঋতুর শেষ ঋতুটিকে বরণ করে নিতে কত আয়োজন রঙ! হাজারো প্রাণের কল্লোলে নগর এখন সবুজ-শ্যামল প্রকৃতির জয়গানে মুখর।বাসন্তী রাঙা বসন আর ফুলের শোভায় সেজে মানুষ ছুটছে উৎসবের আঙ্গিনায়। ফাল্গুনের প্রথম দিনে বসন্তের দোলা তাদের হৃদয়েও।প্রতি বছরের মত এবারও রাজধানীতে জাতীয় বসন্ত উদযাপন পরিষৎ আয়োজন করেছে বসন্ত উৎসবের। মঙ্গলবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় ছিল এ আয়োজন।সকাল ৭টায় দীপন সরকারের গিটারে রাগ বসন্ত বিহারের মূর্চ্ছনায় শুরু হয় উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। গান, কবিতা আর সম্মেলক নৃত্যে শুরু হয় নাগরিক বসন্ত উদযাপন।

দীপন সরকারের পর পারভেজ-সুশান্ত পরিবেশন করেন রাগ আহির ভৈরব। প্রভাতী রাগের আলাপ, গৎ- এর সঙ্গে বাদ্যযন্ত্রের ধুনে ভোরের উৎসব পায় অন্য মাত্রা। ততক্ষণে বকুলতলার আনাচেকানাচে বসন্তের স্তুতি-গানে মেতে উঠেছেন নগরবাসী।কণ্ঠে কণ্ঠে তখন সেই গান- বসন্ত বাতাসে সই গো, বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ আমার বাড়ি আসে।এরপর ধ্র“পদী নৃত্য নিয়ে মঞ্চে আসেন প্রিয়াঙ্কা প্যারিস গোমেজ। বসন্তের কবিতা আবৃত্তি করেন সৈয়দ হাসান ইমাম ও ভাস্বর বন্দোপাধ্যায়। নার্গিস চৌধুরী পরিবেশন করেন ‘আমি পথভোলা পথিক এসেছি’ গানটি। রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী লাইসা আহমেদ লিসা শোনান দুটি গান।সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী সম্মেলক কণ্ঠে গেয়ে শোনান অতুল প্রসাদের ‘আয়রে বসন্ত’ গানটি। ‘দোল ফাগুনের দোল লেগেছে’ গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করেন শর্মিলা বন্দোপাধ্যায় ও তার দল নৃত্যনন্দন।পরে সামিনা হোসেন প্রেমা তার দল ভাবনাকে নিয়ে ‘আজি দখিন দুয়ার’ গানের সঙ্গে মঞ্চে পরিবেশন করেন একটি সম্মেলক নৃত্য। মণিপুরি নৃত্য নিয়ে মঞ্চে আসেন তামান্না রহমান ও তার দল নৃত্যম। গৌড়ীয় নৃত্য পরিবেশন করেন র‌্যাচেল প্রিয়াংকা প্যারিস।

বসন্ত উপলক্ষে চারুকলা সাজ বাসন্তী সাজে। বাসন্তী সাজে সজ্জিত বিভিন্ন বয়সী মানুষের পদচারণায় মুখর বকুলতলার চারিপাশ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর অনেকে বিভিন্ন রঙ নিয়ে উৎসবে মেতেছেন। লাল, হলুদ, বাসন্তীসহ নানা রঙের পাঞ্জাবি আর ফতুয়া পড়েছেন ছেলেরা। আর মেয়েরা এসেছেন লাল-হলুদ-বাসন্তী শাড়ি পড়ে, সঙ্গে খোঁপায় গাঁদা ফুল। বসন্ত উৎসবের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হবে বিকেল সাড়ে ৩টায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বকুলতলা, বাহাদুর শাহ পার্ক, ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবর মঞ্চে একযোগে অনুষ্ঠান চলে।উৎসব কেমন লাগছে জানতে চাইলে তরুণী নূর-ই-নিগার বলেন, খুব ভালো লাগছে। আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলাম তখন থেকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান খুব পছন্দ করি। পহেলা ফাল্গুন, পহেলা বৈশাখ এসব উৎসব আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির অংশ। এসব উৎসব আমাদের সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশও বটে। এর মধ্য দিয়ে আমরা সবাই একত্র হওয়ার সুযোগ পাই। বসন্ত উৎসবে আসা জাপান প্রবাসী সুজন রহমান বলেন, ‘আমি জাপানেও দেখেছি তারা এসব উৎসব পালন করে। আমরা বাঙালি, আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি আছে। এসব উৎসব আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা আসলে বাঙালি।

এদিকে, কোকিলের কুহু সুর আর গাঁদা ফুলের পাপড়িতে ভর করে নগরে নেমেছে বসন্ত। নগরী আজ খোঁপায় গোঁজা ফুল আর বাসন্তী পোশাক পরা তরুণ-তরুণীর। সে ছোঁয়া অমর একুশে গ্রন্থমেলায়ও। বইমেলা প্রাঙ্গণ আজ মুখরিত বাসন্তী রঙের পোশাকিদের পদচারণায়।১ ফাল্গুনে অমর একুশে গ্রন্থমেলার দ্বার খোলে বিকেল ৩টায়। শুরু থেকেই নগরীর বিভিন্ন প্রান্তের তরুণ-তরুণীসহ সব বয়সী মানুষ গ্রন্থমেলায় ভিড় জমায় বাসন্তী সাজে। এসময় কেউ ঘুরেছেন একা, কেউ পরিবার বা বন্ধুদের নিয়ে, আবার কেউ প্রিয় মানুষটি আঙুলে আঙুল জড়িয়ে। মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, এদিন প্রায় সব তরুণীই নিজেদের রাঙিয়েছে লাল, হলুদ অথবা বাসন্তী কোনো শাড়িতে। খোঁপায় ফুলের মুকুট, হাতভর্তি রেশমি চুড়ি। তরুণরাও হলুদ-বাসন্তী পাঞ্জাবিতে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে বেশ। অনেকেই নিজের ছোট্ট সোনামণিটাকে সাজিয়েছেন প্রকৃতির সঙ্গে মিল রেখে।বাসন্তী সাজে তরুণীরাপ্রাঙ্গণ ঘুরে কথা হয় সদ্য বিবাহিত আরিফুর রহমানের সঙ্গে। স্ত্রীকে নিয়ে বসন্তবরণে বইমেলা এসেছেন তিনি। জানালেন, বিয়ের পর এটাই প্রথম ফাল্গুন। কথা হলে বলেন, সকাল থেকই দু’জনে সারা শহর ঘুরে বেড়াচ্ছি। দুপুরের খাবারটাও হয়েছে বাইরে। এরপর সোজা বইমেলা। ফাল্গুনের এ বিকেলে দু’জন স্টল ঘুরে ঘুরে অনেকগুলো বই কেনার ইচ্ছে আজ।তাহমিনা রহমান এসেছেন ছোট্ট মেয়েকে সঙ্গে করে। বললেন, সবার সাজগোজ আর বাইরে আসা দেখে মেয়ে বায়না ধরেছে।তার শখ পূরণেই চলে এলাম বইমেলায়। একটু ঘোরাঘুরি করে সন্ধ্যার দিকে কিছু বই কিনে ঘরে ফিরবো। শুধু পাঠকই নয়, আজ বসন্তের ছোঁয়া লেগেছে বইমেলার প্রায় প্রতিটি স্টলে। বিকেলে প্রায় সব স্টলের বিক্রেতাদেরই দেখা গেছে ফাগুনের সাজ শরীরে নিয়ে বই বিকিকিনি করতে। কথা হয় সাহিত্য বিলাস প্রকাশনীর বিক্রয়কর্মী সানজিদা আফরিনের সঙ্গে। মেলায় ঘুরে বেড়াতে না পারলেও হলুদ শাড়ি, বসন্তের প্রথম দিনে অমর একুশে গ্রন্থমেলা জমজমাট পাঠক-দর্শনার্থীদের ভিড়ে। আর ভিড় থেকেই মেলা জমে উঠবে বলে আশা প্রকাশ করছেন প্রকাশকরা।