ফেনী শহরতলীর রানীরহাট এলাকায় বৃহত্তর পরিসরে নির্মিত হচ্ছে অত্যাধুনিক জেলা কারাগার। দ্রুত এগিয়ে চলছে এর নির্মাণ কাজ। এরই মধ্যে প্রায় ৮০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। চলতি বছরের মে মাসের মধ্যেই শেষ হবে নির্মাণ কাজ। শত বছরের পুরানো জরাজীর্ণ জেলা কারাগারটি জুন মাসেই সেখানে স্থানান্তর করা হবে। এতে করে পুরাতন কারাগারে থাকা ধারন ক্ষমতার কয়েকগুণ অতিরিক্ত বন্দির এবং কারা কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘব হবে বলে আশা করছেন কারা কর্তৃপক্ষ।

ফেনী জেলা কারাগার সূত্রে জানা যায়, ১৯১৫ সালে শহরের মাস্টার পাড়ায় মাত্র দেড় একর জায়গার ওপর প্রথমে উপ-কারাগার (সাব-জেল) হিসেবে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। বন্দী ধারন ক্ষমতা মাত্র দুইজন মহিলা ও ১৭০ জন পুরুষ মিলে মোট ১৭২ জন। ১৯৯৮ সালে উপ-কারাগার থেকে এটি জেলা কারাগারে উন্নীত হয়। তবে জেলা কারাগারে উন্নীত হলেও বাড়েনি কোনো সুযোগ-সুবিধা। একদিকে শত বছরের পুরানো অবকাঠামো, অন্যদিকে অপ্রতুল জায়গায় ধারণ ক্ষমতার তিন-চারগুণ বেশি বন্দী নিয়ে কারা কর্তৃপক্ষকে প্রতিনিয়তই চরম ঝামেলা পোহাতে হয়। পালাক্রমে গাদাগাদি করে শোয়া, থাকা-খাওয়া, গোসল, প্র¯্রাব-পায়খানাসহ নানা সমস্যায় বন্দিদেরও দুর্ভোগের যেন নেই শেষ। বন্দিদের চিকিৎসায় কারাগারে নেই হাসপাতালও।এসব সমস্যা নিরসনে ১৯৯৬ সালে বর্তমান সরকারের প্রথম মেয়াদে কারাগারটি বড় পরিসরে নতুন জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জেলা কারগার নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় শহরের অদূরে রানীরহাট এলাকায় সোনাপুর ও মালিপুর দুই মৌজায় নতুন কারাগার নির্মাণের জন্য সাড়ে সাত একর জায়গাও অধিগ্রহণ করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে সরকার পরিবর্তন হলে প্রকল্পের কাজ থেমে যায়। ২০০৮ সালে বর্তমান সরকার দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসলে প্রকল্পের নির্মাণ কাজ পুনরায় শুরু হয়। জেলা গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে প্রায় ৩৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন এই জেলা কারাগারের নির্মাণকাজ এখন শেষ পর্যায়ে। চলতি বছরের মে মাসে নির্মাণকাজ শেষ হবে এবং জুন মাসের মধ্যেই শত বছরের পুরানো কারাগারটি নতুন জায়গায় স্থানান্তর হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করছেন।
নবনির্মিত জেলা কারাগারটি হবে সম্পূর্ণ সিসিটিভি ক্যামেরা নিয়ন্ত্রিত। ৩৫০ জন বন্দী ধারণক্ষমতা সম্পন্ন অত্যাধুনিক এই কারাগারে বন্দী ও কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য থাকছে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা। এরমধ্যে রয়েছে, একটি দ্বিতলা বিশিষ্ট আধুনিক হাসপাতাল, বন্দীদেরকে কাউন্সিলিং এবং তাদের মাঝে কর্মস্পৃহা সৃষ্টি ও কর্মসংস্থানে বিভিন্ন ওয়ার্ক শেড, খেলার মাঠ, পুকুর, উদ্যান, স্টাফ কোয়ার্টারসহ বিভিন্ন স্থাপনা। এছাড়া কারাগারের পরিধি বিস্তৃত করতে আরো তিন একর জায়গা অধিগ্রহণের কাজ চলমান রয়েছে।কারাবন্দি দর্শনার্থী হেদায়েত উল্যাহ জানান, পুরোনো কারাগারে বন্দীদের সাথে কথা বলতে কষ্ট হয়। দুই-চারজন কথা বললে একে অপরের পারস্পরিক কথা বুঝতে পারে না। ঠিকমত বসার জায়গাও এখানে নেই।মনির হোসেন নামে এক কারাবন্দী জানান, তিনি এক মামলায় আসামী হিসেবে দুই বছর জেল খাটার পর ফেনী কারগার থেকে সম্প্রতি মুক্ত পেয়েছেন। তিনি বলেন, ওখানে থাকা ও শোয়া খুবই কষ্টকর।জেল সুপার মো. রফিকুল কাদের বলেন, আগামী জুন মাসে নতুন কারাগারে শিফ্ট করতে পারবে। পুরোনো কারাগারে বন্দীদের থাকাসহ বিভিন্ন সমস্যা মিটিয়ে নতুন কারাগারে প্রায় তিনগুণ বন্দী থাকতে পারবে। কারাবন্দীদের দুর্ভোঘ লাঘব হবে।অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত নবনির্মিত এই কারাগার বন্দিদের বন্দিজীবনকে নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক এবং বন্দিরে পরিশুদ্ধ জীবন গড়তে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।গণপূর্ত অধিদপ্তর ফেনীর নির্বাহী প্রকৌশলী কাজী মো. বদরুজ্জামান জানান, আধুনিক সিসিটিভি সম্বলিত নির্মানাধীন জেলা কারাগারে পুরুষ ব্যারাক, মহিলা ব্যারাক, কারারক্ষীদের ব্যারাক, হাসপাতাল, ওয়ার্কসীটসহ বিভিন্ন কর্মকর্তাদের বাসভবন নির্মিত হচ্ছে। জেলা প্রশাসক মনোজ কুমার রায় বলেন, নতুন কারাগারের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। পুরাতন কারাগারে বর্তমানে ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি বন্দিরা রয়েছে। নির্মাণ কাজ শেষ হলে কারাবন্দিদের সমস্যা-সমাধান হবে। আশা করি আগামী জুন মাসে এটি উদ্বোধন করা হবে।