গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ঃ দলীয় প্রার্থীকে বিজয়ী করতে বড় দু’দলের নানা পরিকল্পনা ও কৌশল

প্রথমদিনে প্রার্থীতা প্রত্যাহার করেন নি কেউ

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনকে ঘিরে রাজনীতির ময়দানে বড় দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামীলীগ ও বিএনপি’র প্রার্থীর সমর্থনে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা নানা পরিকল্পনা ও কৌশল নির্ধারনে ব্যাস্ত হয়ে পড়েছেন। নির্বাচনে নিজ নিজ প্রার্থীকে বিজয়ী করার জন্য তারা এখন থেকেই ভোটের হিসাব নিকাশ শুরু করেছেন। নির্বাচনে বিজয়ী হতে প্রার্থীদের নানা পরিকল্পনা অনেকটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। উভয় দলের কর্মী সমর্থকদের মাঝে চাপা অসন্তোষ ও গ্রুপিং থাকায় প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা তা মিটিয়ে ফেলতে জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সমমনা অন্যান্য মেয়র প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের সঙ্গে দুরত্ব কমিয়ে তাদের আস্থায় এনে সোমবার (২৩ এপ্রিল) মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন পর্যন্ত প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে নিজ দলের মনোনীত প্রার্থীর প্রতি সমর্থন বৃদ্ধির চেষ্টা করছেন আওয়ামীলীগ ও বিএনপি’র অভিজ্ঞ নেতৃবৃন্দ। নির্বাচনী আচরণবিধি না মেনেই ইতোমধ্যে প্রার্থীরা অনানুষ্ঠাণিকভাবে নির্বাচনী গণসংযোগ শুরু করেছেন। তারা বিভিন্ন সংগঠণ ও সামাজিক অনুষ্ঠাণ ও সমাবেশে যোগ দিয়ে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন।

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার রকিব উদ্দিন মন্ডল জানান, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ গ্রহণেচ্ছুক প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র রবিবার ও সোমবার যাচাই বাছাই করা হয়। বাছাই শেষে মেয়র পদে ১০জনের মধ্যে একজনের মনোনয়নপত্র বাতিল ও ৯জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ বলে ঘোষণা করা হয়। এছাড়াও যাচাই বাছাইকালে সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ডে ৩জন ও সাধারণ ওয়ার্ডে ১৯জনসহ মোট ২৩জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। এসময় সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ডে ৮৪জন ও সাধারণ ওয়ার্ডে ২৭৫ জন প্রার্থীসহ মোট ৩৬৮ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়। বাছাইশেষে মেয়র পদের বৈধ প্রার্থীরা হলেন-আওয়ামীলীগের প্রার্থী মো. জাহাঙ্গীর আলম, বিএনপির প্রার্থী মো. হাসান উদ্দিন সরকার, জাসদের রাশেদুল হাসান রানা, ইসলামি ঐক্যজোটের মো. ফজলুর রহমান, ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের নাসির উদ্দিন, ইসলামী ফ্রন্টের মো. জালাল উদ্দিন, কমিউনিস্ট পার্টির গাজী রুহুল আমিন, স্বতন্ত্র প্রার্থী ফারিদ উদ্দিন ও মো. সানাউল্লাহ। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের প্রথম দিনে কোন প্রার্থী তাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেন নি।

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের এবারের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকরা ভোটের হিসেব নিকেশ শুরু করেছেন। বিশেষ করে আওয়ামীলীগ ও বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীকে বিজয়ী করতে প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকরা নানা পরিকল্পনা ও কৌশল তৈরী করছে। বিধি অনুযায়ী এখনো নির্বাচনী প্রচার কার্যক্রম শুরু না হলেও ইতোমধ্যে প্রার্থীরা অনানুষ্ঠাণিকভাবে নির্বাচনী গণসংযোগ শুরু করেছেন। নির্বাচনী আচরণ বিধি ভঙ্গের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশন কঠোর হওয়ায় প্রার্থী ও তাদের কর্মীরা ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে। তারা বিভিন্ন সংগঠণ ও সামাজিক অনুষ্ঠাণ ও সমাবেশে যোগ দিয়ে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন। ভোট ও নির্বাচনী তৎপরতা বাড়াতে প্রার্থীরা কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে এলাকার জন্য কমিটি করছেন। এছাড়াও বড় দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামীলীগ ও বিএনপি’র মেয়র প্রার্থীগণ ভোটার ও বিভিন্ন পেশার লোকজনকে বাসায় ডেকে নিয়ে মতবিনিময় করে কৌশল নির্ধারণ করছেন এবং তাদের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে কাজ করার জন্য নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের নির্বাচনী মিডিয়া সেলের সমন্বয়কারী মোহাম্মদ আলম জানান, আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী মো. জাহাঙ্গীর আলম গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ছয়দানা এলাকার নিজ বাসায় মঙ্গলবার গাজীপুর জেলার ইমাম সমিতির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে মতবিনিময় করেছেন। এসময় তিনি ইমামদের সঙ্গে বিভিন্ন পরামর্শ ও নির্বাচনের কৌশল নিয়ে আলোচনা করেন। সভায় বাংলাদেশ ইমাম সমিতি গাজীপুর মহানগর শাখার সভাপতি মো. মুজিবুর রহমান মাহমুদী, সিনিয়র সহ-সভাপতি আলী হায়দার গাজীপুরী সাধারণ সম্পাদক মো. হারিছুল হোসাইনী প্রমূখ উপস্থিত ছিলেন।

অপরদিকে বিএনপি মনোনীত মেয়র পদপ্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকারের সঙ্গে তার টঙ্গীস্থ বাসভবনে মঙ্গলবার সকালে নির্বাচনী প্রস্ততি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের সাবেক বাসন, কোনাবাড়ি ও কাশিমপুর ইউনিয়ন এলাকার দলীয় কর্মীরা অংশ নেন। এসময় গাজীপুর জেলা বিএনপির সভাপতি একেএম ফজলুল হক মিলন ও সাধারণ সম্পাদক কাজী সাইয়েদুল আলম বাবুল, যুগ্ম সম্পাদক মো. সোহরাব উদ্দিন, সদর থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সুরুজ আহমেদ, সাংগঠনিক সম্পাদক বসির আহমেদ বাচ্চু, জেলা বিএনপির সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক সাবেক কাশিমপুর ইউপি চেয়ারম্যান শওকত হোসেন সরকার, সাংবাদিক ইউনিয়ন গাজীপুর-এর সভাপতি দেলোয়ার হোসেন প্রমুখ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

এবারের গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ৫৭টি সাধারণ ওয়ার্ড ও ১৯টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডের প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডেই কাউন্সিলর পদে আওয়ামীলীগ ও বিএনপি’র একাধিক নেতা প্রার্থী হয়েছেন। কিন্তু ওইসব আসনে কাউন্সিলর পদে গাজীপুর মহানগর আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে দলীয় মনোনয়ন দেয়ার তালিকা সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ হলে স্থানীয় আওয়ামীলীগের নেতা-কর্মীদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এ দলীয় মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত প্রার্থী ও তাদের ক্ষুব্ধ কর্মী-সমর্থকরা এজন্য আওয়ামীলীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থী গাজীপুর মহানগর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমকে দায়ী করছেন। তবে গাজীপুর মহানগর আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে কাউন্সিলর পদে দলীয় সমর্থন দেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট আজমত উল্লাহ খান। দলীয় সমর্থন দেয়ার বিষয়টি তার জানা নেই বলে তিনি জানান। এব্যাপারে দলের সাধারণ নেতা-কর্মীরা মনে করেন, বিষয়টি এখনই সুরাহা না হলে আওয়ামীলীগের মেয়র প্রার্থীকে এজন্য মূল্য দিতে হবে।

উল্লেখ্য, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী সোমবার (২৩ এপ্রিল) প্রার্থীতা (মনোনয়নপত্র) প্রত্যাহারের শেষ দিন। প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হবে ২৪ এপ্রিল এবং ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে ১৫ মে। গত ৩১ মার্চ গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার পর হতে এটি হবে এ সিটি কর্পোরেশনের দ্বিতীয় নির্বাচন। এবার গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ৫৭টি সাধারণ ও ১৯টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে মোট ভোটার সংখ্যা ১১ লাখ ৬৪ হাজার ৪২৫ জন। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসার হিসেবে ঢাকার আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা রকিব উদ্দিন মন্ডলকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।