পরপর দুইদিনে নানিয়ারচরে ছয় হত্যাকান্ডের পর পাহাড়জুড়ে নেমে আসা থমথমে পরিস্থিতির এখনো অবসান হয়নি। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া শনিবার দিনভর ঘর থেকে তেমন একটা বের হয়নি গ্রামীণ মানুষ। যে কারনে সাপ্তাহিক বাজারবার হওয়া সত্ত্বেও হাট-বাজারে লোকজনের উপস্থিতি ছিলো খুবই কম। এদিকে উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের ব্রাশ ফায়ারে শুক্রবার বেতছড়িতে বাঙ্গালী গাড়ী চালক সজীব হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে তিন পার্বত্য জেলায় তিনদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে পার্র্বত্য বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদ। এর মধ্যে আজ ৬মে কালো পতাকা উত্তোলন, ৭ ও ৮ মে সকাল-সন্ধ্যা সর্বাত্মক হরতাল আহ্বান করা হয়েছে। এছাড়া সজিব হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও খাগড়াছড়ি থেকে সম্প্রতি অপহৃত ৩ বাঙালি ব্যবসায়ীকে উদ্ধারের দাবীতে আজ রোববার খাগড়াছড়ি জেলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে পার্বত্য অধিকার ফোরাম ও বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদ। শনিবার দুপুরে কালো পতাকা নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল শেষে অনুষ্ঠিত সমাবেশ থেকে এ হরতাল কর্মসূচীর ঘোষনা দেওয়া হয়। এদিকে শুক্রবার ব্রাশফায়ারে নিহত গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফ এর আহবায়ক তপন জ্যোতি চাকমা বর্মা ও সদস্য তনক চাকমার দাহক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে খাগড়াছড়ির তেতুলতলা এলাকায়। শনিবার দুপুরে ময়না তদন্ত শেষে লাশ গ্রহণ করে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতায় এ দাহ ক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। দাহক্রিয়া অনুষ্ঠান ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ ছাড়া নিহত অপর তিন জানের লাশ তাদের স্বজনরা নিজ নিজ এলাকায় নিয়ে দাহ ও দাফন সম্পন্ন করেন।

শনিবার থমথমে পরিস্থিতির মধ্যেই পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি ঘটনাস্থলগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। এসময় তিনি নানিয়ারচরের সাধারণ মানুষ ও সুশীল সমাজকে সাথে নিয়ে বিশেষ আইন-শৃঙ্খলা সভায় মিলিত হন। সভায় জনসাধারণকে আতঙ্কিত না হবার পরামর্শ দিয়ে পুলিশের এই উর্ধতন কর্ত বলেন, পাহাড়ে পুলিশ এখন থেকে নতুন ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে। তিনি উল্লেখ করেন পুলিশ জীবন দিয়ে হলেও জনগণের জানমাল রক্ষা করবে। তিনি জানান সরকারের উদ্বর্তন মহল থেকে পুলিশকে এধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে পুলিশ সাধারণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত থাকলেও আঞ্চলিক দলীয় বিশেষ সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে এতকাল পুলিশের তেমন একটা ভূমিকা ছিল না।

নানিয়ারচরে ন্যাক্কারজনক নির্মম ঘটনায় ব্যর্থতার দায়ভার কোনো ভাবেই এড়ানোর সুযোগ নেই উল্লেখ করে ডিআইজি ড. এসএম মনির-উজ-জামান বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্ত পরিবেশকে যারা অশান্ত করতে চায় তারাই এই হত্যাকান্ডটি সংঘটিত করেছে, এখানে রক্তপাত করেছে। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখেই হঠাৎ করে একটি মহল পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে উল্লেখ করে ডিআইজি বলেন, আমাদের পরিস্কার কথা যারাই অশান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই ধরণের ঘটনার সাথে জড়িত কুলাঙ্গাররা আর যাই হোক এই বাংলাদেশের সন্তান নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এক সময়ে পাহাড়ে লাশের পর লাশ পড়ে থাকতো, সেই লাশের রক্তগুলো যদি নানিয়ারচরের নদীতে ফেলা হতো তাহলে পুরো কাপ্তাই লেক রক্তের নদীতে পরিণত হতো। এই অবস্থা থেকে উত্তরনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি করেছিলো। মুষ্টিমেয় কিছু কুলাঙ্গারের জন্য এই শান্তি প্রক্রিয়া বিনষ্ট হতে পারে না। পাহাড়ের অস্ত্রধারী, চাঁদাবাজ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে সন্ত্রাসীদের খুঁেজ বের করা হবে বলে জানান তিনি।

এদিকে, নানিয়ারচরে উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমা ও গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফের ৬ নেতাকর্মী হত্যাকান্ডের পর সন্ত্রাসীদের ধরতে নানিয়ারচরে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী যৌথ অভিযান চালাচ্ছে বলে নিশ্চিত করেছেন, নানিয়ারচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল লতিফ। তিনি জানান, বর্তমানে নানিয়ারচরের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্যসহ সেনাবাহিনী টহল দিচ্ছে। তিনদিনেও কোনো মামলা না হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেএসএস এমএন লারমা গ্রুপের সহ-সভাপতি শক্তিমান চাকমা, ইউপিডিএফ সংস্কার গ্রুপের প্রধান তপনজ্যোতি বর্মাসহ ৬ জনের হত্যাকান্ডের মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

সোম ও মঙ্গলবার দু’দিনের হরতাল ঘোষণা করে বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি মোঃ শাহাদাৎ হোসেন সাকিব জানিয়েছে, গাড়ীচালক সজীব হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও মহালছড়ি থেকে অপহৃত তিন বাঙ্গালীকে উদ্ধার করার দাবীতে তারা এই কর্মসূচী দিয়েছে। তিনি বলেন, সজীব হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও অপহৃত বাঙ্গালীদের মুক্তি না দিলে আরো কঠোর কর্মসূচী দেয়া হবে বলে হুশিয়ারী দেয়া হয়। পুলিশের ডিআইজি নানিয়ারচর সফর ও রাঙামাটিতে পৃথক দুটি মতবিনিময়কালে তার সাথে ছিলেন, চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি (অপারেশন্স এন্ড ক্রাইম) এসএম রোকন উদ্দীন, অতিরিক্ত ডিআইজি আবুল ফয়েজ, রাঙামাটি জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশীদ, রাঙামাটি পুলিশ সুপার আলমগীর কবির, খাগড়াছড়ি পুলিশ সুপার মো. আলী আহম্মদ খানসহ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।

মাত্র ২৪ ঘন্টা সময়ের মধ্যে নানিয়ারচর উপজেলায় পরপর দুটি হত্যাকান্ডের ঘটনার পর সর্বত্র আতংক বিরাজ করছে। মানুষ প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছে না। নানিয়ারচরের একমাত্র সড়ক পথ রাঙামাটি মহালছড়ি খাগড়াছড়ি সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। চরম আতঙ্কের মধ্যে দিনযাপন করছে পাহাড়ি-বাঙ্গালী উভয় সম্প্রদায়ের মানুষজন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক দলের নেতারা নিজেদের বসতবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছে। নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান রণ বিকাশ চাকমা জানান, আমাদের জীবন এখন কুকুরের জীবনের চেয়েও খারাপ হয়েছে। একটি কুকুরেরও একজন প্রভু বা মালিক থাকে, কিন্তু বর্তমানে আমাদের তাও নেই।

রাঙামাটি থেকে আনোয়ার আল হক