কলা গাছ থেকে তৈরি হচ্ছে উন্নত মানের সুতা : পাহাড়ে উৎপাদনের নতুন সম্ভাবনা

মানব দেহের সৌন্দর্য ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায়সহ পুষ্টি পুরনে ভাল ভুমিকা রাখে কলা। ছাড়াও মাংসের তরকারীকে আরও সুস্বাদু করে তোলে, মাথার চুলকে করে তোলে আকর্ষনীয়, ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করে, দেহে প্রোবায়টিক এর যোগান দেয়, দুশ্চিন্তা দুর করে,ওজন কমাতে সাহায্য করে,শারিরিক পরিশ্রম ও ব্যায়ামে শক্তি যোগায়,পায়ের গোড়ালি পরিচর্যায় সহায়তা করে,ঘুমের জন্য সহায়ক এবং মাইগ্রেন দুর করতে দারুন ভুমিকা রাখে এই কলা। আমরা স্বচরাচর গাছ থেকে ফল (কলাসহ ছড়ি) কেটে নেয়ার পর গাছটি পরিত্যাক্তবস্থায় পরে থাকতে দেখা যায়। তবে পাহাড়ি অঞ্চলে গাছের ওপরের বাকল ফেলে দিয়ে মাঝখানে অংশে থাকা নরম জাতিয় (বলী বা আইটি) কেউবা বলে আলিয়া সুস্বাধু তরকারি হিসেবে খাওয়া হয়ে থাকে। তবে এবার অব্যবহৃত পরিত্যাক্ত কলা গাছ ও কলার বাকল থেকে উন্নত মানে সুতা উৎপাদনের নতুন সম্ভাবনা হিসেবে দেখছে উদ্যোক্তারা। পাহাড়ি এলাকায় সারা বছরই কলা উৎপাদিত হয়। কলাগাছের বিকল্প ব্যবহার না থাকায় ফল দেওয়ার পর গাছটি কেটে ফেলা হয়। কিন্তু এবার পরিত্যাক্ত কলার বাকল থেকেই উৎপাদিত হচ্ছে উন্নত মানের ফাইবার বা সুতা।

উৎপাদিত সুতা চড়া দামে বিক্রিও হচ্ছে । খাগড়াছড়িতে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এই প্রকল্প শুরু করে। এই প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট প্রোগ্রাম অফিসার আশুতোষ রায় জানান, আমাদের দেশে কলা গাছের বাকল কোন কাজে আসে না। কলা সংগ্রহের পর কৃষকরাগাছটি কেটে ফেলে। এটি পরিত্যাক্ত হিসেবে ধরা হত। কিন্তু পরিত্যাক্ত বাকল থেকে ফাইবার বা সুতা উৎপাদন করে সাফল্য পাওয়া গেছে। একটি কলা গাছের বাকল থেকে কমপক্ষে দুই’শ গ্রাম ফাইবার পাওয়া যায়। তিনি জানান, প্রতিটি কলাগাছ ১৫ টাকা দরে কেনা হয়। তবে পরিবহন খরচ বেশি হওয়ায় দূর থেকে কলা গাছ কিনতে গেলে খরচও একটু বাড়ে। ৫টি গাছের বাকল থেকে অন্তত এক কেজি সুতা পাওয়া যায়। যার বাজার মূল্য প্রায় ১৩০ টাকা। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান,‘ কলা গাছের বাকল থেকে ফাইবার বা সুতা উৎপাদন অন্ত্যন্ত লাভজনক। কলার বাকল থেকে ফাইবার অংশ সংরক্ষণের পর অবশিষ্ট অংশ বার্মি কমোস্ট বা কেঁচো সার উৎপাদন করা যায়। কৃষক পর্যায়ে বার্মি কম্পোষ্টের চাহিদাও রয়েছে বেশ। প্রতিকেজি কম্পোস্ট সার বিক্রি হয়ে ২০ টাকায়।
খাগড়াছড়ি জেলা সদরের গঞ্জ পাড়ায় চলছে কলার বাকল থেকে সুতা উৎপাদন। জার্মান দাতা সংস্থা ওয়েলথ হাঙ্গার হিলফ এর অর্থায়নে আনন্দ বিল্ডিং কমিউনিটি এন্টারপ্রাইজ অফ স্মল হোল্ডারস ইন বাংলাদেশ প্রজেক্টের আওতায় কলা গাছের বাকল থেকে সুতার তৈরির প্রকল্প চলছে। ওয়েস্ট এগ্রো এর কারিগরি সহায়তা চলতি বছরের ফেব্র“য়ারি মাস থেকে আনন্দ এই কার্যক্রমটি শুরু করে। প্রকল্পের শুরুতে বিদ্যুতের লো-ভল্টেজের কারণে বাকল থেকে সুতা উৎপাদনে ধীরগতি ছিল। কিন্তু বর্তমানে খাগড়াছড়িতে নতুন সাব স্টেশন চালু হওয়ায় বিদ্যুতের লো-ভল্টেজের সমস্যা কেটে গেছে। ফলে বর্তমানে উৎপাদনও বেড়েছে। তবে ধান কাটার মৌসুম হওয়ায় শ্রমিক সংকটের কারণে উৎপাদন একটু ব্যাহত হচ্ছে।
শ্রমিকদের কাজের ভিত্তিতে কমিশন দেওয়া হয়। প্রতিকেজি ফাইবাব বা সুতা উৎপাদনে একজন শ্রমিক পায় ১৩ টায়। অনেক সময় একাধিক শ্রমিক কাজ করলেও সমান মজুরী পাবে। দৈনিক একজন শ্রমিক সর্বোচ্চ ৫০ কেজি পর্যন্ত সুতা উৎপাদন করতে পারে। কর্মরত শ্রমিকেরা জানান,‘ নিয়মিত বিদ্যুত থাকলে কাজ চলে । তবে লোডশেডিং এর কারণে অনেক সময় উৎপাদন কমে যায়। ফলে সারা দিন কাজ করেও কাঙ্খিত উৎপাদন সম্ভব হয় না। সময়ে সারা দিন কাজ করেও ৩০০ টাকা আয় করতে কষ্ট হয় । তবে বিরতিহীন বিদ্যুত সরবরাহ থাকলে উৎপাদন বাড়ানো যেত। উৎপাদিত সুতা দুই দিন ছায়ামুক্ত স্থানে শুকানোর ব্যবস্থা করতে হয়। এরপর তা গাইড বেঁধে বাজারজাত করা যায়।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা-আনন্দ এর নির্বাহী পরিচালক মোঃ মনিরুজ্জামান মিঞা বলেন, সুতা বা ফাইবার উৎপাদনের বড় সম্ভাবনা হল এটি পরিত্যাক্ত কলার বাকল থেকে তৈরি হয়। পাহাড়ি এলাকায় প্রচুর কলা হয়,এখানে কলা গাছ সহজলভ্য। কলা গাছের বাকল থেকে প্রাপ্ত সুতা অত্যন্ত টেকসই মান সম্পন্ন। জুট বা কটনের সাথে মিশ্রণে এটি আরো টেকসই হয়। দলিল বা স্ট্যাম্প অর্থাৎ দীর্ঘ মেয়াদী কাগজের জন্য এই ফাইবার বেশ উপযুক্ত। এই ফাইবার মিশ্রিত কাগজ ৩৫০ পর্যন্ত স্থায়ী হয়। তিনি জানান,‘বর্তমানে প্রকল্পটি পরীক্ষামুলকভাবে খাগড়াছড়িতে চালু হয়েছে। এটি সফলতা পেলে এই প্রকল্প আরো সম্প্রসারণ করা যাবে। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী বলেন, অব্যবহৃত পরিত্যাক্ত ‘কলার বাকল থেকে প্রাপ্ত সুতা বা ফাইবার জুট বা কটনের সাথে মিশ্রণে পেপার,হ্যান্ডি ক্রাফট,হ্যান্ড ব্যাগসহ নানা পণ্য তৈরি করা হচ্ছে। এই প্রকল্পটি সঠিক ভাবে সম্প্রসারণ করতে পারলে। মনোমুগ্ধকর এসব পণ্য এলাকার চাহিদা পুরন করে বাহিরেও রফতানি করা সম্ভব। এবং এই অঞ্চলের বেকার সমস্যা কাটিয়ে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। পার্বত্য এই এলাকার উন্নয়ন এবং দরিদ্রদের বেকার সমস্যা দুরকরে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে প্রকল্পটি সম্প্রসারণে সকল প্রকার সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।