গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ঃ রমজনের প্রথমদিন প্রার্থনা ও বৈঠকের মধ্যদিয়ে প্রার্থীদের ব্যস্ত সময় পার

আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচারনা একমাস পর শুরু হলেও প্রার্থীদের পদচারণায় নিস্তব্ধতা কাটিয়ে আবারো সরব হয়ে উঠছে গাজীপুর ॥

আগামী ২৬ জুন গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের এবারের নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের স্থগিতাদেশের বাধা উচ্চ আদালতের মাধ্যমে দূর হওয়ার পর এবারের নির্বাচনে দ্বিতীয়বারের মতো ভোট গ্রহণের তারিখ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। নতুন ঘোষিত তারিখ অনুযায়ী আগামী ১৮ জুন হতে দ্বিতীয়বারের মতো এ নির্বাচনের আনুষ্ঠাণিক প্রচার প্রচারণা শুরু করবেন প্রার্থীরা। নির্বাচনে আনুষ্ঠাণিক প্রচার প্রচারণা আরো একমাস পর হতে শুরু কথা থাকলেও কোন প্রার্থীই বসে নেই তাদের নির্বাচনী প্রচার প্রচারনা থেকে। প্রতিদিনই তারা বিভিন্ন কৌশলে গণসংযোগ ও সভা করছেন। কর্মী সমর্থকদের নিয়ে ভোটারদের কাছে গিয়ে নিজেদেরকে তুলে ধরছেন ভোট পাবার আশায়। শুক্রবার প্রার্থীগণ ব্যস্ত দিন কাটিয়েছেন। এবারের রমজানের প্রথমদিন জুম্মাবার হওয়ায় এদিন প্রার্থীরা তাদের কর্মী সমর্থকদের নিয়ে নির্বাচনী এলাকায় বিভিন্ন মসজিদে জুম্মার নামাজ আদায় ও প্রার্থনা করে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। এসময় তারা মুসুল্লীদের সঙ্গে কুশলাদি বিনিময় করেছেন এবং ভোট ও দোয়া চেয়েছেন। অনেক প্রার্থী ভোটারদের বাড়ি, শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠাণে ভীড় জমিয়েছেন এবং নানা আশার বাণী শুনিয়ে সমর্থণ আদায়ের চেষ্টা করেছেন। বিশেষ করে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মেয়র প্রার্থী তাদের কর্মী সমর্থকদের নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় ভোটারদের সঙ্গে সাক্ষাত করে এদিনটি ব্যস্ত কাটিয়েছেন। প্রার্থী ও তাদের কর্মী সমর্থকদের পদচারণায় কয়েকদিনের নিস্তবদ্ধতা কাটিয়ে আবারো সরব উঠছে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনী এলাকা।

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন এবারের নির্বাচনের ভোটগ্রহণ ১৫ মে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সীমানা নির্ধারণ নিয়ে জটিলতাকে কেন্দ্র করে আদালতে দায়ের করা এক রিটের প্রেক্ষিতে গত ৬ মে হাইকোর্ট গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন তিন মাসের জন্য স্থগিত করে আদেশ দেয়। এতে স্থগিত হয়ে যায় নির্বাচনী সকল প্রকার কার্যক্রম। নগরীর সর্বত্র নিস্তব্ধতা চলে আসে। হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়েন প্রার্থী ও তাদের কর্মী সমর্থকরা। ভোটররাও নানা উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে পড়েন। পরে হাইকোর্টের ওই আদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করেন আওয়ামীলীগ ও বিএনপির দুই মেয়র প্রার্থী। শুনানী শেষে ১০ মে উচ্চ আদালতে ওই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে নির্বাচন অনুষ্ঠাণ করার আদেশ দেন। এ আদেশের প্রেক্ষিতে চারদিন নিস্তব্ধতার পর উজ্জীবিত হয়ে উঠে গাজীপুর সিটি’র নির্বাচনী পরিবেশ। ভোটারদের মাঝেও উৎফুল্লতা দেখা দেয়। নির্বাচনে সকল প্রার্থী ও তাদের কর্মী সমর্থকরা আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠে। সরব হয়ে উঠে পুরো গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন এলাকা ও ভোটাররা। নির্বাচনে মেয়র পদে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীগণসহ তাদের কর্মী-সমর্থক ও নগরবাসীর মধ্যে উদ্দীপনা ফিরে আসে। নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে আদালতের স্থগিতাদেশের বাঁধা দুর হওয়ার পর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী সকল মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা আবারও নির্বাচনী মাঠে নামতে শুরু করেন। উচ্চ আদালতের ওই আদেশের প্রেক্ষিতে আগামী ২৬ জুন গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ভোট গ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করে ঘোষণা দেয় নির্বাচন কমিশন। নতুন ঘোষিত তারিখ অনুযায়ী প্রার্থীরা আগামী ১৮ জুন হতে এ নির্বাচনে আনুষ্ঠাণিক প্রচার প্রচারণা শুরু করার সময় বেঁধে দেওয়া হলেও অধিকাংশ প্রার্থী ও সমর্থকরা ওই বিধি নিষেধ মানছেন না। প্রতিদিনই কর্মী সমর্থকদের নিয়ে প্রার্থীরা বিভিন্ন কৌশলে ভোটারদের কাছে ছুটে যাচ্ছেন এবং গণসংযোগ ও বৈঠক করছেন।

এবারের নির্বাচনে মেয়র পদে মোট ৭জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও সবার দৃষ্টি আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট সমর্থিত মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম (নৌকা) ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকারের (ধানের শীষ) দিকে। হেভিওয়েট এ দু’প্রার্থী যেখানে যাচ্ছেন সেখানেই ভোটার ও কর্মী সমর্থকরা ভীড় জমাচ্ছেন। কর্মী সমর্থকদের উপস্থিতির কারণে তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে জনসমাবেশে পরিনত হয়। তবে নির্বাচনী প্রচারে পিছিয়ে নেই অন্য ৫ মেয়র প্রার্থী এবং সাধারণ আসনের কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলররাও। জয়ের ব্যপারে আশাবাদী হয়ে নির্বাচনী আচরণবিধিকে এড়িয়ে নানা কৌশলে তারাও হন্যে হয়ে ছুটছেন ভোটারদের কাছে। ইতোমধ্যে বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার তার ১৯ দফা এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি মনোনীত মেয়র প্রার্থী কাজী রুহুল আমিন তার ৯ দফা ইশতেহার ঘোষনা করলেও আওয়ামীলীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষনা করেননি।

প্রার্থনা করে ও ভোটারদের সঙ্গে  ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন জাহাঙ্গীর আলম ॥
এবারের রমজানের প্রথমদিন শুক্রবার হওয়ায় নামাজ ও ধর্মীয় অনুষ্ঠাণে যোগ দিয়ে এবং ভোটারদের সঙ্গে দেখা করে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট সমর্থিত মেয়র প্রার্থী (নৌকা) অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম। এদিন সকালে তিনি কর্মী সমর্থকদের সঙ্গে ছয়দানাস্থিত তার বাসায় বৈঠক করেন এবং নির্বাচনী প্রস্তুতি সম্পর্কে খোঁজ খবর নেন। তিনি দুপুরে সালনাস্থিত সালনা বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে জুম্মার নামাজ আদায় করেন। এসময় তিনি মুসল্লীদের সঙ্গে কুশলাদি বিনিময় করেন এবং সবার কাছে দোয়া ও ভোট প্রার্থনা করেন। নামাজ শেষে তিনি এলাকাবাসির সঙ্গে দেখা করে তাদের খোঁজ খবর নেন। সন্ধ্যায় তিনি মহানগরের ২২ নম্বর ওয়ার্ডে মাস্টাবাড়িতে জামিয়াতুল উলুমীয়া ইসলামিয়া মাদরাসায় ইফতার করেন। এসময় মাদরাসার প্রধান মুফতি নুরুল ইসলাম ও গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সহ দপ্তর সম্পাদক মাজহারুল ইসলামসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

এসময় আওয়ামীলীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনকে আধূনিকায়ন ও উন্নয়নের জন্য ২৬ জুনের নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।

অন্যায়-অপরাধ ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জিহাদে শরিক হওয়ার আহবান হাসান উদ্দিন সরকারের ॥
বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট সমর্থিত মেয়র প্রার্থী (ধানের শীষ) হাসান উদ্দিন সরকার নগরীর বোর্ড বাজার এলাকায় হাজী মহর খান ওয়াকফ এষ্টেট কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে জুম্মার নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে তিনি মুসল্লীদেও সঙ্গে কুশলাদি বিনিময় করেন এবং ভোট প্রার্থনা করেন।

এসময় তিনি বলেন, নেতৃত্বের দুর্বলতা ও অভিভাবক সুলভ শাসনের অভাবে সমাজ আজ চরমভাবে অধঃপতন হচ্ছে। মাদকের ভয়াল আগ্রাসনে আমাদের যুব সমাজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। হাল জামানায় মাদক ও অসামাজিক কার্যকলাপসহ সমাজ ধ্বংসের যাবতীয় উপকরণ সহজলভ্য করে দেওয়া হয়েছে। চোখের সামনে অন্যায়-অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে; অথচ কেউ প্রতিবাদ করছে না। অন্যায়-অপরাধ ও দু:শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা সরাসরি জিহাদে শরিক হওয়ার চেয়েও বেশি ফজিলতের বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এরআগে মসজিদের খতিব আব্দুর রাহিম আল-মাদানী মাহে রমজানের তাৎপর্য ও সমসাময়িক বিষয়ে বয়ানের একপর্যায়ে হাসান উদ্দিন সরকারকে নিজের কেস পার্টনার উল্লেখ করে বলেন, পিতৃতুল্য হাসান উদ্দিন সরকারের সঙ্গে জেল হাজতে পরিচয় ও কথা হয়েছে। এসময় তিনি ফিলিস্তিনসহ সমসাময়িক মুসলিম বিশে^র করুণ চিত্র তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন। বোর্ড বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে হাসান উদ্দিন সরকারের সাথে জুমার নামাজে আরো শরিক হন, গাছা সাংগঠনিক থানা বিএনপির সভাপতি মোশারফ হোসেন খান, সাধারণ সম্পাদক এম.এ হামিদ, সাবেক আহবায়ক মুজিবুর রহমান মেম্বার, জামায়াত নেতা নিয়াজ উদ্দিন মাস্টার, জাতীয় পার্টির নেতা আবুল হোসেন, বিএনপি নেতা আব্দুল আজিজ মাস্টার, ইঞ্জিনিয়ার ইদ্রিস খান প্রমূখ।

বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী (ধানের শীষ) হাসান উদ্দিন সরকার সন্ধ্যায় টঙ্গীর আউচ পাড়াস্থিত নিজ বাসায় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ইফতার করেন।

গাজীপুর জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. তারিফুজ্জামান জানান, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের তফশিল ঘোষণা করা হয় গত ৩১ মার্চ। ঘোষিত তফশিল অনুযায়ী ১৫ মে এ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ঢাকা জেলার সাভার থানার শিমুলিয়া ইউনিয়নের ৬ টি মৌজা গাজীপুর সিটিতে অন্তর্ভূক্ত করে নির্বাচনী তফশীল ঘোষণা করাকে কেন্দ্র করে শিমুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবিএম আজাহারুল ইসলাম সুরুজের দায়ের করা রিটের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট গত ৬ মে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন তিন মাসের জন্য স্থগিত করে আদেশ দেয়। পরে হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে গত ৭ মে সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগে প্রথম আপিল করেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার। পরদিন ৮ মে আওয়ামীলীগের মেয়র প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম এবং পরে নির্বাচন কমিশনও আপিল করে। আপীলের শুনানী শেষে উচ্চ আদালত ১০ মে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ বাতিল করে ২৮ জুনের মধ্যে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠান করার জন্য নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দেন। এ আদেশের প্রেক্ষিতে আাগামী ২৬ জুন গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের এবারের নির্বাচনের ভোট গ্রহণের নতুন তারিখ নির্ধারণ করে ঘোষণা দেয় নির্বাচন কমিশন। নতুন ঘোষিত তারিখ অনুযায়ী প্রার্থীরা এ নির্বাচনে আগামী ১৮ জুন হতে দ্বিতীয়বারের মতো আনুষ্ঠাণিক প্রচার প্রচারণা শুরু করতে পারবেন।

ওই কর্মকর্তা আরো জানান, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের এবারের নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামীলীগ ও বিএনপি মনোনীত প্রার্থীসহ ৭জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামেন। এদের মধ্যে ৬জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মনোনীত এবং একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন। এছাড়াও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ৫৭টি সাধারণ ওয়ার্ডের সাধারণ আসনের কাউন্সিলর পদে ২৫৪ জন এবং ১৯টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডের সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর পদে ৮৪জন প্রার্থী এ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এবারের নির্বাচনে একটি ওয়ার্ডে সাধারণ আসনের কাউন্সিলর পদে একজন প্রার্থী বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।

উল্লেখ্য, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের মোট আয়তন ৩২৯ দশমিক ৫৩ বর্গ কিলোমিটার। এবার গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ৫৭টি সাধারণ ও ১৯টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে মোট ভোটার সংখ্যা ১১ লাখ ৩৭ হাজার ৭৩৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৫লাখ ৬৯ হাজার ৯৩৫ এবং নারী ভোটার ৫লাখ ৬৭হাজার ৮০১।

মোস্তাফিজুর রহমান টিটু, গাজীপুর ও নুরুল ইসলাম, টঙ্গী ॥