পবিত্র মাহে রমজান এবং মাহে রমজানের ফজিলত ও তাৎপর্য

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার যিনি আমাদেরকে নিয়ামত হিসেবে দিয়েছেন সৎকাজ করার বিভিন্ন মৌসুম।যিনি রমজানকে করেছেন মহিমান্বিত, বরকতময়। যিনি উৎসাহ দিয়েছেন মাহে রমজানে ইবাদত-বন্দেগী যথাযর্থ রুপে পালন করতে।পুণ্যময় কাজসমূহে অধিকমাত্রায় রত হতে।আমি আল্লাহর প্রশংসা করছি তার অফুরান নেয়ামতের জন্য।শুকরিয়া করছি তাঁর অঢেল করুণার জন্য।দরুদ ও সালাম তাঁর প্রতি যিনি নামাজ ও রোজা আদায়কারীদের মধ্যে ছিলেন সর্বোত্তম।যিনি তাহাজ্জুদ ও কিয়ামুল লাইল সম্পাদনকারীদের মধ্যে ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ।আল্লাহ তার প্রতি রহমত ও বরকত নাযিল করুন। তাঁর সাহাবাদের প্রতিও রহমত বর্ষণ করুন। তাবেয়ীন ও ঐকান্তিকতার সাথে,পৃথিবীতে আলো অন্ধকার যতদিন থাকবে,ততদিন যারাই তাদের অনুসরণ করবে তাদের সবার প্রতি বর্ষিত হোক আল্লাহর অফুরান রহতম । আল্লাহ তাআলা বড়-বড় উপলক্ষ্য রেখেছেন যা হৃদয়ে ইমানকে শানিত করে, অন্তরাত্মায় আন্দোলিত করে উচ্ছ্বসিত অনুভূতি।অতঃপর বাড়িয়ে দেয় ইবাদত আরাধনার অনুঘটনা, সঙ্কুচিত করে দেয় সমাজে পাপ ও অন্যায়ের ক্ষেত্রসমূহ ।রমজান মুসলমানদেরকে দেয় ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব, স্বচ্ছতা, সহমর্মিতা,আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা,পবিত্রতা, উত্তমতা, সবর ও শৌর্যবীর্যের দীক্ষা।ইহা একটি সুমিষ্ট পানিয়ের প্র¯্রবণ।ইহা ইবাদতকারীদের জন্য একটি নিরাপদ ভূমি, আনুগত্যকারীদের জন্য দুর্পার দুর্গ। যারা পাপী তাদের জন্য ইহা একটি সুযোগ,যাতে তারা তাদের গুনাহ থেকে তাওবা করতে পারে। তাদের জীবন-ইতিহাসে স্বচ্ছ কিছু অধ্যায় রচিত করতে পারে। তাদের জীবনকে ভরে দিতে পারে উত্তম আমলে,উৎকৃষ্ট চরিত্রে।

রমজানের ফজিলত:-
কালের বিবেচনায় এসব উপলক্ষ্যের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট,সম্মানের বিবেচনায় সর্বশ্রেষ্ঠ, প্রভাবের বিবেচনায় সুদূর বিস্তৃত উপলক্ষ্য হল সম্মানিত মাহে রমজান যার টলটলে রস আস্বাদন করে আমরা হই পরিতৃপ্ত । চুমুকে চুমুকে তুলে নিই তার মধু। নাক ভরে শুঁকে নেই তার সুগন্ধি। রমজান মাস শক্তি অর্জন ও দানের মাস। এ মাসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম মক্কা বিজয়ের জন্য যুদ্ধ করেছেন। তখন তিনি এবং সমস্ত মুসলমান রোজা অবস্থায় ছিলেন, আর এ রমজানেই বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়ছিল। এ সমস্ত যুদ্ধে ইসলামের পতাকা সমুন্বত হয়েছিল, মূর্তি এবং পৌত্তলিকতার পতাকা অবনমিত হয়েছিল। এ মাসে মুসলমানদের অনেক যুদ্ধ জিহাদ এবং কুরবানি সংঘঠিত হয়েছে। রমজানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম ও তাঁর সাহাবারা অধিক পরিমাণে শক্তি, সজিবতা এবং ইবাদতের জন্য ধৈর্য ধারণ করার উদ্যম অনুভব করতেন, তাইতো রমজান মাসকে সৎকাজ,ধৈর্য ও দানের মাস বলা হয়। রমজান দুর্বলতা, অলসতা, ঘুমানোর মাস নয়। কোন কোন রোজা পালনকারীকে হাত পা ছেড়ে দিয়ে, দিনের বেলায় ঘুমাতে, কাজ কম করতে দেখা যায়। এমন আচরণ রোজার তাৎপর্যের বিরোধী। রোজার উদ্দেশ্যের সাথে মিলে না। পূর্বেকার মুসলমানেরা রমজান যাপন করতেন তাদের অন্তর এবং অনুভূতি দিয়ে। রমজান আসলে তারা কষ্ট করতেন। ধৈর্যের সাথে দিন যাপন করতেন। আল্লাহর ভয় এবং পর্যবেক্ষণের কথা তাদের স্মরণ থাকত। তার রোজা নষ্ট হয় অথবা ত্রুটিযুক্ত হয় এমন সব কিছু থেকে দুরে থাকতেন। খারাপ কথা বলতেন না,ভাল না বলতে পারলে নীরব থাকতেন। তারা রমজানের রাত্রি যপন করতেন সালাত, কোরআন তেলাওয়াত, আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামের অনুসরণ করেই। রোজার উপকার অথবা ফজিলত অনেক। তা গণনা করে শেষ করা যাবে না। তবে খেলাধুলা ও রং তামাশায় মত্তব্যক্তিরা কিংবা অলস শ্রেণির লোকজন যারা সারাদিন ঘুমিয়ে কাটায়, এবং রাত্রে বাজারে ঘুরে বেড়ায় তারা রমজানের এসব ফজিলত থেকে বঞ্চিত থাকবে। এ মাসের অন্যতম বরকত হল ভাল কাজের প্রতিদান অনেক বেড়ে যায়। যেমন, রাত্রে দাড়িয়ে নামাজ আদায় করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের রাত্রে দাড়িয়ে নামাজ পড়তে উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি বলেন:
{ﻣﻦ ﻗﺎﻡ ﺭﻣﻀﺎﻥ ﺇﻳﻤﺎﻧﺎً ﻭﺍﺣﺘﺴﺎﺑﺎً ﻏﻔﺮ ﻟﻪ ﻣﺎ ﺗﻘﺪﻡ ﻣﻦ ﺫﻧﺒﻪ { ‏[ ﺭﻭﺍﻩ ﺍﻟﺒﺨﺎﺭﻱ ﻭﻣﺴﻠﻢ ‏] .
যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহতেসাবের সাথে রমজানের রাত্রে দাড়িয়ে নামাজ আদায় করবে আল্লাহ তাআলা তার পূর্বের গোনাহ মাফ করে দেবেন। (বুখারী-মুসলিম)।
এ মাসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন:
{ﻛﺎﻥ ﺍﻟﻨﺒﻲ – ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ – ﺃﺟﻮﺩ ﺍﻟﻨﺎﺱ ﺑﺎﻟﺨﻴﺮ، ﻭﻛﺎﻥ ﺃﺟﻮﺩ ﻣﺎ ﻳﻜﻮﻥ ﻓﻲ ﺭﻣﻀﺎﻥ ﺣﻴﻦ ﻳﻠﻘﺎﻩ ﺟﺒﺮﻳﻞ { ‏[ ﺭﻭﺍﻩ ﺍﻟﺒﺨﺎﺭﻱ ﻭﻣﺴﻠﻢ ‏]،
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেযয়ে বেশি দানশীল ছিলেন। রমজানে যখন তিনি জিবরীলের সাথে সাক্ষাৎ করতেন আরো বেশি দানশীল হয়ে যেতেন। (বুখারী মুসলিম) দান সদকা করা ভাল। বিশেষ করে রমজান মাসে বেশি করে করা। রমজান মাসে অধিক পরিমাণে কোরআন তেলাওয়াত করা, পূর্বসূরীরা রমজান মাসে নামাজে এবং নামাজ ব্যতীত অধিক পরিমাণে কোরআন তেলাওয়াত করতেন।

মাহে রমজান ছাওয়াব-
পুণ্য বহুগুণে বেড়ে যাওয়ার মাস। দরজা বুলন্দ হওয়ার মাস।পাপ-গুনাহ মোচন হওয়ার মাস।পদস্খলন থেকে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর মাস। এ মাসে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়।দোযখের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয়।শয়তানকে আবদ্ধ করে দেয়া হয়।যে ব্যক্তি এ মাসে রোজা রাখবে,তারাবিহ পড়বে ইমান ও ছাওয়াব লাভের আশায়, তার অতীত জীবনের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়।সহিহ হাদিসে এভাবেই এসেছে
{ ﻣﻦ ﺻﺎﻡ ﺭﻣﻀﺎﻥ ﺇﻳﻤﺎﻧﺎً ﻭﺍﺣﺘﺴﺎﺑﺎً ﻏﻔﺮ ﻟﻪ ﻣﺎ ﺗﻘﺪﻡ ﻣﻦ ﺫﻧﺒﻪ { ‏[ ﺭﻭﺍﻩ ﺍﻟﺒﺨﺎﺭﻱ ﻭﻣﺴﻠﻢ ‏]
আবু হুরায়রা (রাযি) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন:
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: যে ব্যক্তি ইমান ও ইহতেসাবু আল্লাহর কাছ থেকে ছাওয়াব প্রাপ্তির আশায় রোজা পালন করবে, তার অতীতের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। [ বুখারি ও মুসলিম] { যে ব্যক্তি ইমান ও ইহতেসাবসহ রমজানের রাত্রি যাপন করবে তার অতীতের সকল গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। [ বুখারি ও মুসলিম]
ইমাম নাসাঈ রহ. আবু উমামা রা. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল আমাকে এমন বিষয়ের নির্দেশ দেন যার মাধ্যমে আল্লাহ আমাকে প্রতিদান দেবেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলইহি অসাল্লাম
বলেন:
{ﻋﻠﻴﻚ ﺑﺎﻟﺼﻴﺎﻡ ﻓﺈﻧﻪ ﻻ ﻣﺜﻞ ﻟﻪ}
তুমি রোজা পালন কর। কেননা এর কোন তুলনা নেই। জান্নাতে একটি দরজা আছে সেখান দিয়ে শুধু রোজা পালনকারী প্রবেশ করবে। সাহল ইবনে সাআদ রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
{ ﺇﻥ ﻓﻲ ﺍﻟﺠﻨﺔ ﺑﺎﺑﺎً ﻳﻘﺎﻝ ﻟﻪ : ﺍﻟﺮﻳّﺎﻥ، ﻳﺪﺧﻞ ﻣﻨﻪ ﺍﻟﺼﺎﺋﻤﻮﻥ ﻳﻮﻡ ﺍﻟﻘﻴﺎﻣﺔ، ﻻ ﻳﺪﺧﻞ ﻣﻨﻪ ﺃﺣﺪ ﻏﻴﺮﻫﻢ، ﻳﻘﺎﻝ : ﺃﻳﻦ ﺍﻟﺼﺎﺋﻤﻮﻥ، ﻓﻴﻘﻮﻣﻮﻥ، ﻻ ﻳﺪﺧﻞ ﻣﻨﻪ ﺃﺣﺪ ﻏﻴﺮﻫﻢ، ﻓﺈﺫﺍ ﺩﺧﻠﻮﺍ ﺃﻏﻠﻖ، ﻓﻠﻢ ﻳﺪﺧﻞ ﻣﻨﻪ ﺃﺣﺪ}
[ ﺃﺧﺮﺟﻪ ﺍﻟﺒﺨﺎﺭﻱ ﻭﻣﺴﻠﻢ ‏] .
জান্নাতে একটি দরজা আছে যার নাম রাইয়ান। কিয়ামত দিবসে সেখান দিয়ে রোজা পালনকারী প্রবেশ করবে। সে দরজা দিয়ে অন্য কেহ প্রবেশ করবে না। বলা হবে: রোজা পালনকারী কোথায়? তারা দাঁড়াবে, তারা ছাড়া। আর কেহ প্রবেশ করবে না। তারা প্রবেশ করার পর দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে। আর কেহ সে স্থান দিয়ে প্রবেশ করবে না। (বুখারী মুসলিম)।

মুসলিম ভ্রাতৃবৃন্দ:
রমজান মুসলমানদের জন্য বিশাল এক আনন্দের মাস। মহাকালের পরিক্রমায় ঘুরে ঘুরে আসে রমজান।আসে এই সম্মানিত মৌসুম। আসে এই মহান মাস।আসে প্রিয় মেহমান হয়ে, সম্মানিত অতিথি হয়ে।এই উম্মতের জন্য মাহে রমজান আল্লাহর এক নেয়ামত।কেননা এ মাসের রয়েছে বহু গুণাবলি, বৈশিষ্ট্য। আবু হুরাইরা (রাযি) হতে বর্ণিত এক হাদিসে এসেছে:
{যখন রমজান আসে বেহেশতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়।দোযখের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয়।শয়তানকে শিকল পড়িয়ে দেয়া হয়। [ বুখারি ও মুসলিম]

এটা নিঃসন্দেহে বড় সুযোগ। এটা এক সম্মানিত উপলক্ষ্য যেখানে স্বচ্ছতা পায় অন্তরাত্মা। ধাবিত হয় যার প্রতি হৃদয়।যাতে বেড়ে যায় ভাল কাজ করার উৎসাহ-উদ্যম।উন্মুক্ত হয়ে যায় জান্নাত, নাযিল হয় অফুরান রহমত। বুলন্দ হয় দরজা, মাফ করা হয় গুনাহ।রমজান তাহাজ্জুদ ও তারাবির মাস।যিকির ও তাসবিহর মাস। রমজান কুরআন তিলাওয়াত ও নামাজের মাস। দান সাদকার মাস। যিকির-আযকার ও দুআর মাস।আহাজারি ও কান্নার মাস। যে কারণে রমজান আমাদের প্রয়োজন:-মুসলিম ভাইয়েরা ! জাতির জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত অতিবাহিত হওয়া জরুরি যখন আত্মার পরিশুদ্ধি ও তৃপ্তি সম্পন্ন হবে।যখন ইমানের মাইলফলকগুলো নবায়ন করা হবে। যা কিছু নষ্ট হয়েছে তা সংস্কার করা হবে।যেসব রোগব্যাধি বাসা বেঁধেছে তা সারিয়ে তোলা হবে। রমজান সেই আধ্যাত্মিক মুহূর্ত যেখানে মুসলিম উম্মাহ তাদের বিভিন্ন অবস্থা সংস্কার করার সুযোগ পায়,তাদের ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকানোর সুযোগ পায়। তাদের অতীতকে ফিরিয়ে আনার সুযোগ পায়। এটা আত্মিক ও চারিত্রিক বল ফিরিয়ে আনার একটি মাস। আর এ আধ্যাত্মিক ও চারিত্রিক শক্তি ফিরিয়ে আনা প্রতিটি জাতিরই কর্তব্য। ইমাম আহমাদ রহ. তার কিতাবে জাবের রা. থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
{ﺇﻧﻤﺎ ﺍﻟﺼﻴﺎﻡ ﺟﻨﺔ، ﻳﺴﺘﺠﻦّ ﺑﻬﺎ ﺍﻟﻌﺒﺪ ﻣﻦ ﺍﻟﻨﺎﺭ}
রোজা প্রবৃত্তির তাড়না থেকে বাঁচার জন্য ঢাল এর মাধ্যমে বান্দা আগুন থেকে মুক্তি পায়।
ইবনে মাসউদ রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহুৃআলাইহি অসাল্লাম থেকেৃবর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
{ﻳﺎ ﻣﻌﺸﺮ ﺍﻟﺸﺒﺎﺏ ﻣﻦ ﺍﺳﺘﻄﺎﻉ ﺍﻟﺒﺎﺀﺓ ﻓﻠﻴﺘﺰﻭﺝ، ﻓﺈﻧﻪ ﺃﻏﺾ ﻟﻠﺒﺼﺮ ﻭﺃﺣﺼﻦ ﻟﻠﻔﺮﺝ،ৃﻭﻣﻦ ﻟﻢ ﻳﺴﺘﻄﻊ ﻓﻌﻠﻴﻪ ﺑﺎﻟﺼﻮﻡ، ﻓﺈﻧﻪ ﻟﻪ ﻭﺟﺎﺀ} ‏[ ﺃﺧﺮﺟﻪ ﺍﻟﺒﺨﺎﺭﻱ ﻭﻣﺴﻠﻢ ‏] .
হে যুবকেরা! যে সামর্থ রাখে সে যেন বিবাহ করে। কেননা তা দৃষ্টিকে সংরক্ষণ করে এবং যৌনাঙ্গের হিফাজত করে। যে বিবাহের সামর্থ রাখে না সে যেন রোজা পালন করে। কেননা এটি তার জন্য সুরক্ষা। (বুখারী মুসলিম)।

মুসলমানরা এ মৌসুমের অপেক্ষায় থাকে অধীর আগ্রহে। এটা ইমান নবায়নের একটা বিদ্যাপীঠ। চরিত্র মাধুর্যমণ্ডিত করার সময়। আমরা কীভাবে রমজানকে স্বাগত জানাব?আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যমে আমাদেরকে প্রথমে রমজানকে স্বাগত জানাতে হবে। সকল পাপ-গুনাহ থেকে তাওবার মাধ্যমে রমজানকে স্বাগত জানাতে হবে। সকল প্রকার জুলুম অন্যায় থেকে বের হয়ে রমজানকে স্বাগত জানাতে হবে। যাদের অধিকার ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে তাদের কাছে তাদের অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার মাধ্যমে রমজানকে স্বাগত জানাতে হবে। ভাল কাজের মাধ্যমে রমজানের দিবস-রজনী যাপনের মানসিকতা নিয়ে রমজানকে স্বাগত জানাতে হবে। এ ধরনের আবেগ অনুভূতির মাধ্যমেই আশাসমূহ পূর্ণ হয়। ব্যক্তি ও সমাজ তাদের সম্মান ফিরে পায়। এর বিপরীতে রমজান যদি কেবলই একটি অন্ধ অনুকরণের বিষয় হয়। কেবলই কিছু সীমিত প্রভাবের নিষ্প্রাণ আচার পালনের নাম হয় । যদি এমন হয় যে রমজানে, পুণ্যের বদলে, পাপ ও বক্রতা কারও কারও জীবনে বেড়ে যায়, তবে এটা নিশ্চয়ই একটি আত্মিক পরাজয়, এটা নিশ্চয় শয়তানের ক্রীড়া,যার বিরূপ প্রভাব ব্যক্তি ও সমাজের উপর পড়তে বাধ্য। এই মহান মাসের আগমনে মুসলমানদের জীবনে আসুক সুখ ও সমৃদ্ধি।সারা পৃথিবীর মুসলমানদের জীবনে এ মহান মৌসুমের আগমনে বয়ে যাক আনন্দের ফল্গুধারা। যারা আনুগত্যশীল, এ মাস তাদের নেক কাজ বাড়িয়ে দেওয়ার। যারা পাপী, তাদের জন্য এ মাস পাপ থেকে ফিরে আসার। মুমিন বেহেশতের দরজাসমূহের উন্মুক্তিতে খুশি না হয়ে পারে না? পাপী, দোযখের দরজাসমূহ এ মাসে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খুশি হবে বই কি।এ এক বিশাল সুযোগ যা থেকে মাহরুম ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কেও বঞ্চিত হয় না। সিয়াম ও কিয়ামের মাস রমজানের আগমন মুসলমানদের জন্য বিরাট সুখের সংবাদ। অতঃপর হে আল্লাহর বান্দারা আপনারা সিরিয়াস হোন, ঐকান্তিক হোন, রোজাকে কখনো কঠিন ভাববেন না।রোজার দিবসকে দীর্ঘ মনে করবেন না।রোজা ভঙ্গকারী বিষয়সমূহ থেকে বিরত থাকুন।আত্মিক ও বস্তুকেন্দ্রিক সকল প্রকার রোজাভঙ্গকারী বিষয় থেকে বিরত থাকুন।

রোজার হাকীকত:-
অনেক এমন রয়েছে যারা রোজার হাকীকত সম্পর্কে বেখবর।তারা রোজাকে কেবলই খাবার ও পানীয় থেকে বিরত থাকার মধ্যে সীমিত করে দিয়েছে।তাদের রোজা মিথ্যাচারিতায় জবান দরাজ করতে বারণ করে না।চোখের ও কানের লাগাম তারা উন্মুক্ত করে দেয়। তারা গুনাহ ও পাপে নিপতিত হতে সামান্যও উৎকণ্ঠিত হয় না। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: { যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা, সে অনুযায়ী কাজ এবং মূর্খতা পরিত্যাগ করল না, তার খাদ্য ও পানীয় থেকে বিরত থাকায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই। কবি সত্যই বলেছেন: রক্ষিত যদি না হয় কর্ণ দৃষ্টিতে না থাকে বাধা তবে বুঝে নিও আমার রোজা কেবলই তৃষ্ণা ও পিপাসা। যদি বলি আমি আজ রোজা, মনে করিও আমি আদৌ রোজাদার নই।

রমজান ও উম্মতের হালত:-
মুসলমানরা বর্তমানে খুব কঠিন কালপর্ব যাপন করছে। সে হিসেবে তাদের উচিত এ সময়টাকে একটা কঠিন সময় হিসেবে নেওয়া। এ মাসটাকে একটা পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণ হিসেবে গণ্য করা। এ মাসে ইখতিলাফ ও মতানৈক্য থেকে নিষ্কৃতির পাওয়ার উপায় খোঁজে নেওয়া জরুরি। ঐক্য-ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্যের বন্ধন মজবুত করা জরুরি। চিন্তা ও মনোজগৎ ও মতামতে পরিবর্তন জরুরি। এ মাসে আমাদের চলার পথ ও পদ্ধতি কুরআন ও সুন্নাহর চাঁচে গড়ে তুলতে হবে।সালাফে সালেহীনদের নমুনায় ঢেলে সাজাতে হবে নিজেদেরকে।আর এভাবেই হারিয়ে যাওয়া সোনালি অতীতকে, সম্মান ও মর্যাদার অতীতকে ফিরে পাওয়া সম্ভব হবে। যে অতীতের বর্ণাঢ্য ইতিহাসের বহু ঘটনা অনুঘটনা নির্মিত হয়েছিল মুবারক এ মাহে রমজানে। বদর, ফতহে মক্কা,হিত্তিন যুদ্ধ, আইন জালুত যুদ্ধসহ আরো বহু অতি উজ্জ্বল ইতিহাস নির্মিত হয়েছিল এ মাসেই।আমাদের এ সম্মানিত মাস আমাদের দ্বারপ্রান্তে। অথচ মুসলিম উম্মাহর দেহে রয়েছে অঝর ধারায় ক্ষরিত হওয়া লহুর বহু জখম।বেদনাবিদ্ধ বহু ঘটনার অনুরণন। বায়তুল মাকদেসের পড়শী মুসলমানরা কী অবস্থায় এ মাসকে স্বাগত জানাবে, তারা তো ক্রিমিনাল জয়েনিষ্টদের ধারালো কুঠারের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত। যেসব মুসলিম ভাইবোনদেরকে তাদের ঘরবাড়ি, আত্মীয়-স্বজন, সম্পদ থেকে মূলোৎপাটিত করে দেশান্তরিত করা হয়েছে সেই মুসলিম ভাইয়েরা কী হালতে স্বাগত জানাবে মাহে রমজানকে ফিলিস্তিন সমস্যার অব্যাহত থাকা, বায়তুল মাকদেস, যা দুই কেবলার মধ্যে প্রথম, যা জিন-ইনসানের সরদারের ইসরার স্থল, যা পবিত্রতম তিন মসজিদের মধ্যে তৃতীয়, সেই বায়তুল মাকদেস এখনো ইসরাইলীদের দখলদারিত্বে থাকা মুসলমানদের জন্য বিরাট এক চ্যালেঞ্জ, বুদ্ধি ও ধর্মীয় আদর্শের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ, আদল-ইনসাফ, শান্তি ও নিরাপত্তার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ। মুসলমানরা বহু জায়গায় আধুনিক যুগের নৃশংস যুদ্ধের অনলে জ্বলছে, নি:শেষ হয়ে চলেছে প্রতিনিয়ত। ক্ষুধা,হত্যা , ভিটামাটি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া ইত্যাদির শিকার হচ্ছে। এ অবস্থায় তারা কীভাবে যে রমজানকে স্বাগত জানাবে তা ভাববার বিষয়।

রমজান প্রজন্ম গড়ার শিক্ষালয়:-
রোজাদার ভাইয়েরা! মাহে রমজানে মুসলিম উম্মাহ ঐকান্তিকতার শিক্ষা নেয়, খেল-তামাশা থেকে বিমুক্ত হয়ে সিরিয়াসনেস অবলম্বনের শিক্ষা নেয়, জিহ্বায় লাগাম লাগানো, যা কিছু বললে পাপ হয় সেসব থেকে বেঁচে থাকার শিক্ষা নেয় এই মাহে রমজানে। হৃদয় পরিচ্ছন্ন রাখার, হিংসা, দ্বেষ, রেষারেষি থেকে মুক্তি লাভের শিক্ষা নেয় রমজানের এই পবিত্র মাসে বিশেষ করে উলামা ও দাওয়াতকর্মীগণ। ফলে বিচ্ছিন্ন হৃদয় গুলোঅভিন্ন সুতোয় নিজেদেরকে বেঁধে নেওয়ার সুযোগ পায়। বিচ্ছিন্ন মেহনত-প্রচেষ্টা একীভূত হয় গঠনমূলক কাজ সম্পাদনের ক্ষেত্রে, কমন শত্রুকে মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে। এ মাসে আমরা সবাই খুঁটিনাটী ভুল ধরা থেকে নিজেদেরকে বাঁচিয়ে নিতে পারি। কে কোথায় সামান্য হোঁচট খেল তা থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ খোঁজে নিতে পারি। কে কোথায় ভুল করল তা ফুঁক দিয়ে ফুলিয়ে প্রচার করার প্রবণতা থেকে মুক্তি পেতে পারি। কার কি উদ্দেশ্য সে বিষয়ে বিরূপ মন্তব্য করা থেকে নিষ্কৃতি পেতে পারি। রমজান মাসে আমাদের যুবকদের কাছে প্রত্যাশা, তারা তাদের ভূমিকা যথার্থরূপে পালন করবে। তারা তাদের মিশনকে ভালভাবে আয়ত্ত করবে।তারা তাদের রবের অধিকার বিষয়ে সচেতন হবে।তারা তাদের সরকার প্রধানদের অধিকার বিষয়ে সচেতন হবে।মাতা-পিতা ও সমাজের অধিকার বিষয়ে সচেতন হবে।রমজানে মুসলমানদের শাসক ও শাসিতের মাঝে যোগাযোগের একটি উপলক্ষ্য সৃষ্টি হয়।উলামা ও সাধারণ মানুষের মাঝে, ছোট ও বড়র মাঝে সেতুবন্ধনের লক্ষণসমূহ দৃশ্যমান হয়। সবাই একহাত হয়ে, একশরীর হয়ে কাজ করার সুযোগ আসে, ফেতনা ফাসাদ দূর করার স্বার্থে,নির্যাতনে নিপতিত হওয়ার উপলক্ষ্যসমূহ দূরে ঠেলে দেওয়ার স্বার্থে, নৌকা যাতে ফুটো করা না হয়, বিল্ডিং যাতে ভেঙ্গে না পড়ে, সামাজিক ও চিন্তাগত অস্থিরতা যেন জায়গা করে নিতে না পারে সে উদ্দেশ্যে কাজ করে যাওয়ার স্বার্থে।রমজানে ভাল কাজের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়ে যায়,হৃদয়ে ঝোঁক সৃষ্টি হয়।এটা দাওয়াতকর্মী ও সংস্কারকদের জন্য একটা বিরাট সুযোগ। সৎকাজের নির্দেশদাতা ও অসৎ কাজ থেকে বারণকারীদের জন্য বিরাট সুযোগ,যারা অন্যদেরকে দীক্ষিত করে তুলতে নিজেদেরকে নিয়োজিত করেছে তাদের জন্য বিরাট সুযোগ যে তারা তাদের কল্যাণকর্মসমূহ এ মাসে উত্তমরূপে পালন করতে পারবে।কেননা সুযোগ দ্বারপ্রান্তে, মানুষের হৃদয়েও রয়েছে প্রস্তুতি।অত:পর আল্লাহকে ভয় করুন হে আল্লাহর বান্দারা! রমজানের হাকীকতকে জানুন। রমজানের আদব ও আহকামকে জানুন।রমজানের দিবস রজনীকে সৎ কাজ দিয়ে ভরে দিন। রমজানের রোজাসমূহকে ত্রুটি থেকে বাঁচান।তাওবা নবায়ন করুন।তাওবার শর্তসমূহ পূরণ করুন। আশা করা যায় আল্লাহ আপনার পাপসমূহ মার্জনা করে দেবেন। যাদেরকে তিনি তাঁর রহমত ও করুণায় ভূষিত করবেন, দোযখ থেকে মুক্তি দেবেন আপনাকে তাদের মধ্যে শামিল করে নেবেন।

মাহে রমজানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ:-
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমধিক বদান্য ব্যক্তি ছিলেন। মাহে রমজানে তাঁর দানশীলতার মাত্রা আরো বেড়ে যেতে বহুগুণে।ইবনুল কাইয়েম রাহ. বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ ছিল পূর্ণাঙ্গতম আদর্শ, উদ্দেশ্য সাধনে সর্বোত্তম আদর্শ। মানুষের পক্ষে পালনযোগ্য সহজতর আদর্শ। আর রমজান মাসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সে আদর্শ ছিল: সকল প্রকার ইবাদত বাড়িয়ে দেয়া।এ মাসে জিব্রিল ফেরেশতা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে কুরআন পঠন প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট সময় ব্যয় করতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ মাসে দান-খয়রাত বাড়িয়ে দিতেন। কুরআন তিলাওয়াত বাড়িয়ে দিতেন। নামাজ ও যিকির বাড়িয়ে দিতেন। এ মাসে তিনি ইতিকাফ করতেন এবং এমন ইবাদতে এ মাসকে বিশেষিত করতেন যা অন্য কোনো মাসে করতেন না।সালাফে সালেহীনগণও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লামের এ আদর্শ অনুসরণে সচেষ্ট হয়েছেন। তারা উত্তমরূপে রোজা পালনের ক্ষেত্রে সুন্দরতম আদর্শ স্থাপন করেছেন। তারা রোজার উদ্দেশ্য হাকীকতকে ভালভাবে আয়ত্তে এনেছেন এবং মাহে রমজানের দিবস- রজনীকে আমলে সালেহ দিয়ে ভরে রেখেছেন।আল্লাহ আমাদের সবাইকে রমজানের আমল করার তৌফিক দান করুক এবং বেশী বেশী কুরআন তেলাওয়াত নফল ইবাদত করাই তৌফিক দান করুক।