৫৭ ধারাকে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থি :এইচআরএফবি

সরকার জনগণের কাছে আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা বাতিলের কথা বললেও জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে কেন অন্য কথা বলেছে- সেই প্রশ্ন রেখেছে হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ-এইচআরএফবি।

এই মানবাধিকার সংগঠনটির দাবি, গত ১৪ মে হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলের ৩০তম অধিবেশনে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ৫৭ ধারা বাতিলের বিষয়টি সরকারের বিবেচনাধীন।এ নিয়ে উদ্বোগপ্রকাশ করে রোববার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন করে এইচআরএফবি।এইচআরএফবির সমন্বয়ক তামান্না হক রীতি বলেন, হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলের অধিবেশনে ১০৫টি দেশের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে ২৫১টি সুপারিশ করেন।এর মধ্যে সরকার ১৬৭টি সুপারিশ গ্রহণ করেছে। সরকারের রাজনৈতিক বিবেচনায় স্পর্শকাতর বা যথাযথ প্রস্তুতি না থাকায় ২৩টি সুপারিশের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে সরকার সময় নিয়েছে। ৬১টি সুপারিশ ‘গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে প্রত্যাখান করেছে।২৩টি সুপারিশের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে সরকারের সময় নেওয়া ও ৬১টি সুপারিশ প্রত্যাখান করার বিষয়টি দুঃখজনক’ মন্তব্য করে তামান্না হক বলেন, এ বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক পরিসরে মানবাধিকার রক্ষায় বাংলাদেশের অঙ্গীকারকে দুর্বল করবে বলেই তিনি মনে করেন।

ফোরামের সদস্য ও নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা বাতিলের জন্য সরকার মানুষের কাছে কমিটমেন্ট করেছে, কিন্তু ইউপিআর পর্যালোচনা অধিবেশনে আইনমন্ত্রী উপস্থিত থেকে এ বিষয়ে কেন সময় নিলেন? এটা একটা প্রশ্ন।তথ্য-প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারাকে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থি দাবি করে সেটি বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছিলেন গণমাধ্যম ও মানবাধিকার কর্মীরা। এই প্রেক্ষাপটে সরকার সমালোচিত ৫৭ ধারাসহ কয়েকটি ধারা তথ্য প্রযুক্তি আইন থেকে সরিয়ে সেগুলো আরও বিশদ আকারে যুক্ত করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের প্রস্তাব ইতোমধ্যে সংসদে তুলেছে।তামান্না হক বলেন, যেসব সুপারিশ গ্রহণে সরকার সময় নিয়েছে, তার মধ্যে মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় সাংবিধানিক বিধানের প্রয়োগ, বিশেষ করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা এবং খসড়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের এ সংক্রান্ত ধারার ক্ষেত্রে; আদিবাসী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে আইনগত ও সাংবিধানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং তাদের ওপর নির্যাতনের বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি করা; বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনে বিয়ের বয়স সংক্রান্ত বিশেষ ধারা বিলোপের মাধ্যমে আইনের সংশোধন; আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে বিচারবহির্ভূত হত্যা, অপহরণ, গুমের ঘটনায় যথাযথ তদন্ত এবং দোষীদের বিচারের আওতায় আনার কথা রয়েছে।এছাড়া বলপূর্বক অন্তর্ধান বা গুম সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদে অনুস্বাক্ষর; জাতিসংঘের সকল বিশেষ প্রতিনিধিদের বাংলাদেশ ভ্রমণের অনুমতি প্রদান; রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী হাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় তদন্ত করতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে ক্ষমতা দেওয়া; মৃত্যুদন্ড রহিত করা; অনলাইন ও অফলাইনে গণতান্ত্রিক চর্চার পরিসর বাড়ানো এবং এ উদ্দেশ্যে আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা বিলোপ এবং বৈদেশিক সহায়তা নিয়ন্ত্রণ আইন পর্যালোচনাসহ আরও বেশকিছু সুপারিশ সরকার প্রত্যাখান করেছে বলে জানান তামান্না।অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ সময়সূচি ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন; জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা; বৈষম্য বিলোপ আইন দ্রুত গ্রহণ; ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিতসহ ১৬৭টি সুপারিশ গ্রহণ করায় ফোরামের পক্ষ থেকে সরকারকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

জাকির হোসেন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, মৃত্যুদন্ড রহিত করতে ২০০৯ সাল থেকে বিভিন্ন দেশ সুপারিশ করে আসছে; কিন্তু বাংলাদেশ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার কথা বলে, উন্নয়নের কথা বলে তা প্রত্যাখ্যান করে এসেছে। সেই সব ক্ষেত্রে এখনও কী বাংলাদেশের উন্নয়ন হয়নি?বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, গত তিনটি অধিবেশনে বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশ সরকারকে ৪৫০ থেকে ৫০০টি সুপারিশ করেছে, যেগুলো সরকার বাস্তবায়নের কথা বলেছে। কিন্তু এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন আশাব্যঞ্জক নয়।কাপেং ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক পল্লব চাকমা বলেন, ২০১৩ সালের অধিবেশনে বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশ সরকারকে ১৯৬টি সুপারিশ দিয়েছিল। এর মধ্যে সরকার ১৫১টি গ্রহণ করেছিল। কিন্তু সেগুলো কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে তা এখন বড় প্রশ্ন।সরকারের বিবেচনাধীন সুপারিশগুলো অবিলম্বে বাস্তবায়নের জন্য গ্রহণে দাবি জানিয়ে স্টেপস টুওয়ার্ডস ডেভলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক রঞ্জন কর্মকার বলেন,৬১টি সুপারিশ কেন গ্রহণ করা হল না- সে বিষয়ে জাতির সামনে সরকারকে ব্যাখ্যা দিতে হবে।আর যেসব সুপারিশ গ্রহণ করা হয়েছে সেগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে সে বিষয়েও সময়ে সময়ে প্রতিবেদন দেওয়ার দাবি জানান তিনি।