গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ঃ আওয়ামীলীগের তিননেতাকে এক সঙ্গে পেয়ে নেতা-কর্মীরা উৎফুল্ল

আচরণ বিধিতে বাধা না থাকায় স্থানীয় সংসদ সদস্যগণসহ॥ আওয়ামীলীগের নেতারা জোরে শোরে মাঠে নেমেছেন ॥ সমান পাল্লা দিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন বিএনপি’র নেতারা ॥

নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত নতুন নির্বাচনী আচরণ বিধি অনুযায়ী বাধা না থাকায় গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে দলের মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে স্থানীয় সংসদ সদস্যগণসহ গাজীপুর জেলা ও মহানগর আওয়ামীলীগসহ ১৪দলীয় জোটের শীর্ষ নেতৃবৃন্দরা নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে জোরে শোরে মাঠে নেমেছেন। এতে অনেকটা হতাশা দেখা দিয়েছে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বি বিএনপি মনোনীত অপর মেয়র প্রার্থীসহ ২০ দলীয় জোটের নেতা কর্মীদের মাঝে। তবুও সমান ভাবে পাল্লা দিতে ২০ দলীয় জোটের নেতা কর্মীরাও নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছেন। বসে নেই অন্য এ নির্বাচনের প্রার্থীরাও। প্রতিদিনই দলীয় প্রার্থী ও কর্মী সমর্থকদের সঙ্গে নিয়ে শীর্ষ নেতারা গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন এলাকায় সভা ও গণসংযোগ করছেন। সিটি কর্পোরেশনের এক প্রান্ত হতে অন্য প্রান্তে ভোটারদের খোঁজে ছুটে যাচ্ছেন বাড়ি বাড়ি, অফিস ও মিল কারখানায়। নানা কৌশলে তারা নির্বাচনী পুরো এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন। এবারের নির্বাচনে মেয়র পদে ৭জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও মূল লড়াই হবে হেভিওয়েট দুই প্রার্থী আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট সমর্থিত মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম (নৌকা) ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকারের (ধানের শীষ) মধ্যে। সবার দৃষ্টিই এখন এ দু’প্রার্থী ও তাদের নির্বাচনী কার্যক্রমের দিকে।

শনিবার বিকেলে গাজীপুর প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট সমর্থিত মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম (নৌকা) ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার (ধানের শীষ)সহ গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের বিভিন্ন প্রার্থী অংশ নেন। প্রেস ক্লাবের সভাপতি খায়রুল ইসলামের সভাপতিত্বে ওই সভায় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আকম মোজাম্মেল হক এমপি, জাহিদ আহসান রাসেল এমপি, জেলা প্রশাসক ড. দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ূন কবীর সহ বিশিষ্টজনেরা অংশ নেন। এসময় আওয়মীলীগ ও বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী তাদের বক্তব্যকালে নির্বাচনকালে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের জন্য সাংবাদিকদের আহবান জানান।

শনিবার গাজীপুর ২ আসনের সংসদ সদস্য মোঃ জাহিদ আহসান রাসেল এবং গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি আজমত উল্লাহ খান ১৪ দলীয় জোট সমর্থিত আওয়ামীলীগ মনোনীত মেয়র পদপ্রার্থী (নৌকা প্রতীক) মোঃ জাহাঙ্গীর আলমকে সঙ্গে নিয়ে মহানগরের টঙ্গীর কয়েকটি ওয়ার্ডে অনুষ্ঠিত একাধিক আলোচনা সভা ও বৈঠকে এবং দোয়া মাহফিলে অংশ নেন। আলোচনা ও দোয়া মাহফিল শেষে তারা এক সঙ্গে ইফতার মাহফিলেও অংশ নেন। এসময় তারা স্থানীয়দের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং নৌকা প্রতীকের পক্ষে ভোট প্রার্থনা করেন। গাজীপুর আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় এ তিন নেতাকে একসঙ্গে নির্বাচনী মাঠে পেয়ে মহানগর আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের তৃণমুল নেতৃবৃন্দসহ ভোটারদের মাঝে আনন্দ ও স্বস্তি ফিরে আসে। এ তিন নেতাকে এক সঙ্গে গণসংযোগ করতে দেখে শরীকদলসহ আওয়ামীলীগের সকলস্তরের নেতা-কর্মীরা চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। এতে স্থানীয়রাও সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের ৫৪ নম্বর ওয়ার্ডের টঙ্গী পাইলট স্কুল মাঠ প্রাঙ্গণে মোঃ জালাল মাহমুদের সভাপতিত্বে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে স্থানীয় সংসদ সদস্য মোঃ জাহিদ আহসান রাসেল, গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি আজমত উল্লাহ খান এবং ১৪ দলীয় জোট সমর্থিত আওয়ামীলীগ মনোনীত মেয়র পদপ্রার্থী (নৌকা প্রতীক) মোঃ জাহাঙ্গীর আলম উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাহিদ আহসান রাসেল এমপি বলেন, জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকারের উন্নয়নে বিশ^াসী স্বাধীনতার পক্ষের সকল শক্তি আজ আওয়ামী লীগের পতাকা তলে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ। আমরা সবাই গাজীপুরকে আধূনিক নগরীতে পরিনত করতে ঐক্যবদ্ধভাবে নৌকা প্রতীকের জন্য কাজ করছি। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও আমি আমার নির্বাচনী এলাকায় বিভিন্ন ইফতার মাহফিলে আওয়ামী লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, তাঁতি লীগ, শ্রমিক লীগ, ছাত্র লীগসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে কাছে পেয়েছি। আমার বিশ্বাস আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে খুলনার পর গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনেও নৌকা প্রতীকের বিজয় হবে।

ইফতার পূর্ব এ আলোচনায় মেয়র প্রার্থী জাহাঙ্গীর বলেন, আমি আপনাদেরই সন্তান। আমি আপনাদের পাশে আছি ভবিষ্যতেও থাকবো। আপনাদের সুখে-দুখে সকল কিছুতেই আমি অংশীদার হতে চাই। আমি আপনাদের সেবা করার দায়িত্ব নিতে চাই। জননেত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু কণ্যা এই কাজের জন্য আমাকে মনোনীত করেছেন। আপনাদের সহযোগীতায় আমি গুরুত্বপূর্ণ এই সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত আছি। আপনাদের ভোট এবং দোয়া ও সহযোগীতা চাই।

এছাড়াও বিকেলে ৫৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক মোঃ সেলিম মিয়ার বাড়িতে দলীয় নেতা কর্মী ও স্থানীয়দের উপস্থিতিতে ইফতার ও দোয়ার আয়োজন করা হয়।

এসব অনুষ্ঠাণে অন্যান্যের মধ্যে মহানগর আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোঃ মতিউর রহমান মতি, সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী ইলিয়াস আহমেদ, কোষাধ্যক্ষ মুক্তিযোদ্ধা মোঃ জয়নাল আবেদীন, টঙ্গী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ফজলুল হক ও সাধারণ সম্পাদক মোঃ রজব আলী, টঙ্গী পাইলট স্কুল এন্ড গার্লস কলেজের অধ্যক্ষ মোঃ আলাউদ্দিন মিয়া, মোঃ সেলিম মিয়া, এম এম হেলাল উদ্দিন, যুবলীগ নেতা নুর মোহাম্মদ মামুন প্রমুখ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

অপরদিকে ২০ দলীয় জোট সমর্থিত বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী (ধানের শীষ প্রতীক) হাসান উদ্দিন সরকার শনিবার টঙ্গীতে নিজ বাস ভবনে নির্বাচনী কলাকৌশল নিয়ে দলীয় নেতা কর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করেন। বিকেলে তিনি গাজীপুর জেলা বিএনপি কার্যালয়ে ধানের শীষের নির্বাচন মনিটরিং সেলের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে মহানগরের চাপুলিয়ায় স্থানীয় বিএনপি আয়োজিত ইফতার মাহফিলে ও শহরে গাজীপুর প্রেসক্লাবের ইফতার মাহফিলে শরিক হন।

স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপকালে মেয়র প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার নিজের বিজয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ভোটাররা নির্ভয়ে স্বাধীনভাবে সিল মেরে আসবে এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। ফ্রি এন্ড ফেয়ার নির্বাচন হলে আল্লাহ্র ওপর ভরসা করে বলতে পারি আমি বিজয়ী হবো।

সরাসরি ক্রস ফায়ারের সমালোচনা করে বিএনপি প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার তার বাসায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, সবার মতামতের ভিত্তিতে মাদক বিরোধী অভিযান পরিচালনা করতে হবে। এলাকা ভিত্তিক মসজিদের ঈমাম, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, পেশাজীবী মানুষকে সঙ্গে নিতে হবে। সবাই জানেন তাদের এলাকায় কারা মাদক ব্যবসা ও অপরাধের সঙ্গে জড়িত। সবার মতামতের ভিত্তিতে মাদক ব্যবসায়ীসহ সকল অপরাধীদের স্তরে স্তরে শ্রেণী বিন্যাস করতে হবে। এমন অনেকে আছে যারা পরিবর্তন বা সংশোধন হতে পারে, আবার কিছু আছে সংশোধনের সুযোগ পায় নাই, তাদেরকে সংশোধনের রাস্তায় আসার সুযোগ দিতে হবে।

তিনি আরো বলেন, আমি দীর্ঘ দিন ধরে যে যুদ্ধের কথা বলে আসছিলাম দেরিতে হলেও এখন সেই যুদ্ধ শুরু হয়েছে। তবে এমন সময় যুদ্ধ শুরু হলো, যখন ঘরে আগুন লেগে গেছে। আপনার সন্তান যদি ভাল না থাকে তাহলে উন্নয়ন দিয়ে কি হবে। আমি মনে করি, একটা বিরাট রাস্তার এবং একটা বিশাল সুযোগ সুবিধা সম্পন্ন এলাকার চেয়ে অনুন্নত মাদকমুক্ত একটি এলাকা অনেক ভাল।

গাজীপুর জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. তারিফুজ্জামান জানান, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের এবারের নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামীলীগ ও বিএনপি মনোনীত প্রার্থীসহ ৭জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামেন। এদের মধ্যে ৬জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মনোনীত এবং একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন। এছাড়াও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ৫৭টি সাধারণ ওয়ার্ডের সাধারণ আসনের কাউন্সিলর পদে ২৫৪ জন এবং ১৯টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডের সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর পদে ৮৪জন প্রার্থী এ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এবারের নির্বাচনে একটি ওয়ার্ডে সাধারণ আসনের কাউন্সিলর পদে একজন প্রার্থী বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।

তিনি আরো জানান, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের মোট আয়তন ৩২৯ দশমিক ৫৩ বর্গ কিলোমিটার। এবার গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ৫৭টি সাধারণ ও ১৯টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে মোট ভোটার সংখ্যা ১১ লাখ ৩৭ হাজার ৭৩৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৫লাখ ৬৯ হাজার ৯৩৫ এবং নারী ভোটার ৫লাখ ৬৭হাজার ৮০১।