দেশব্যাপী চলমান মাদকবিরোধী অভিযান সময়ে আলোচনার মধ্যেই ওমরা পালনের উদ্দেশ্যে দেশ ছেড়েছে উখিয়া-টেকনাফ আসনের সরকারদলীয় সাংসদ আবদুর রহমান বদি।তার বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।শুক্রবার ভোরে সৌদি এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে তিনি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করে সে।এ সময় সঙ্গে ছিল বদির স্কুলবন্ধু নুরুল আকতার, গিয়াস উদ্দিন ও উখিয়ার হলদিয়া পালংয়ের মৌলানা আলী আহমদ নুরী।

এর আগে ২৬ মে এমপি বদির মেয়ে সামিয়া রহমান ও মেয়ে জামাই ব্যারিস্টার রানা আশরাফ ওমরার উদ্দেশ্যে সৌদি আরব যান।বিষয়টি নিশ্চিত করে এমপি বদির ব্যক্তিগত সহকারী হেলাল উদ্দিন জানান, মাদকবিরোধী অভিযান চলাকালে এমপি বদির হঠাৎ ওমরা পালনে সৌদি আরবে গমনকে অনেকে কৌশল হিসেবে মনে করলেও এটি সঠিক নয়। ওমরা যাওয়ার সময়সূচি অনেক আগেই নেয়া ছিল। হেলাল আরও বলেন, নিয়ম অনুযায়ী তিনি যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতিও নিয়েছেন। এ ছাড়া রমজানের শেষ সপ্তাহজুড়ে তিনি মসজিদ আল-হারামে ইতেকাফ করার নিয়ত করেছেন। ওমরা পালন ও সৌদিতে ঈদুল ফিতর উদযাপন শেষে ১৭ জুন দেশে ফিরবেন।

এ বিষয়ে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আফরুজুল হক টুটুল বলেন, তিনি প্রশাসনকে অবহিত করেই সৌদি আরব গেছেন।মাদকবিরোধী অভিযান শুরুর পর থেকে ফেইসবুকেও আলোচনায় রয়েছে আব্দুর রহমান বদি।বদির সৌদি আরব যাওয়ার খবরে ক্ষোভ জানিয়েছেন কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও কক্সবাজার পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত মেয়র মাহবুবর রহমান চৌধুরী।

তিনি বলেন, ইয়াবা পাচারে সম্পৃক্ততায় এমপি বদি ও তার ভাইয়েরাসহ নিকট স্বজনদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ইতোপূর্বের সব তালিকায় এমপি বদিসহ এসব স্বজনদের নাম ছিল। মাদকবিরোধী অভিযানের মধ্যেই টেকনাফে র্যা বের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে বদির বড় বোনের দেবর আকতার কামাল এবং টেকনাফ উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি ওয়ার্ড কাউন্সিলর একরামুল হক।

একরামুল কখনও ইয়াবায় ব্যবসায় জড়িত ছিলেন না Ñএ কথা জানিয়ে আওয়ামী লীগের এ নেতা বলেন, একরামুল সম্পূর্ণ নির্দোষ। ইয়াবা ব্যবসায়ী চক্রের শীর্ষ গডফাদার অথবা ষড়যন্ত্রকারী বিশেষ অন্য কোনো মহলের ইন্ধনে পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকান্ড সংঘটিত হতে পারে বলে আমাদের ধারণা। দেশে চলমান ইয়াবাসহ মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান চলার মধ্যেই খবরটি এলো। অনেকেই বলছেন, বদি আর সহজেই দেশে ফিরছেন না।বদির খালাতো ভাই আরেক বিতর্কিত ব্যক্তি মং মং সেনও গোপনে মিয়ানমার পাড়ি জমিয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্র জানাচ্ছে। মং মং টেকনাফ সীমান্তের ইয়াবা, হুন্ডি ও স্বর্ণ চোরচালানের ডন হিসেবে পরিচিত এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত কারবারি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত শীর্ষ চোরাচালানি ও ইয়াবার গডফাদার মং মং সেন আগে অন্তত দুবার গ্রেপ্তার হন এবং ছাড়া পেয়ে যান।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় বলেন, ‘উখিয়া-টেকনাফ সংসদীয় আসনের এমপি আবদুর রহমান বদি সাহেব সৌদি আরব গেছেন। তিনি আমাকে বলেছেন, পবিত্র ওমরাহ হজ পালন করবেন।এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত রবিবার রাতে একরামের জানাজায় অংশ নেওয়ার পর আর বদিকে এলাকায় দেখা যায়নি। গতকাল কক্সবাজারের আরেক আলোচিত বিষয় হচ্ছে বদির খালাতো ভাই মং মং সেনের মিয়ানমারে যাওয়ার খবরটি। শোনা যাচ্ছে, গতকাল সকাল ৬টার দিকে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ নৌঘাট দিয়ে কার্গো ট্রলারে করে তিনি মিয়ানমারে পাড়ি জমান। ট্রলারটি গরু নিয়ে মিয়ানমার থেকে এসেছিল। টেকনাফ থানার ওসি রঞ্জিত কুমার বড়ুয়া বলেন, মং মং সেনকে ধরতে গতকাল পর্যন্ত তিন দফা অভিযান চালানো হয়। কিন্তু পাওয়া যায়নি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো বলেন, ‘শাহপরীর দ্বীপ দিয়ে তাঁর মিয়ানমারে পালিয়ে যাওয়ার খবর আমরা পাইনি।

এমপি বদির পিতা প্রয়াত এজাহার মিয়া কম্পানির একাধিক স্ত্রীর মধ্যে একজন ছিলেন মিয়ানমারের রাখাইন জাতি-গোষ্ঠীর। সেই স্ত্রীর বোনের ছেলে মং মং সেন। অর্থাৎ আবদুর রহমান বদির সৎভাই মো. ফয়সালের মা ও মং মং সেনের মা আপন বোন। মং মং-এর বাবার নাম অং সেন তা। ২০১৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর ১০ হাজার ইয়াবাসহ মং মং সেনকে টেকনাফ থানা পুলিশ আটক করে। চার-পাঁচ মাস জেল খেটেই তিনি জামিনে ছাড়া পেয়ে যান। এরপর ২০১৬ সালে মার্চে মং মং ধরা পড়েন চোরাইয়ের সাড়ে ৯ কেজি স্বর্ণ ও বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থসহ। এবারও মং মং বেরিয়ে আসেন।জানা গেছে, দেশব্যাপী ইয়াবাসহ মাদকবিরোধী অভিযান শুরুর পর ভীত হয়ে পড়েন মং মং সেনসহ অনেকে। বিশেষ করে টেকনাফ সীমান্তের ইয়াবা কারবারি আকতার কামাল মেম্বার এবং পৌর কাউন্সিলর একরামুল হক বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার পর সীমান্তের কারবারিরা যে যেদিকে পারছে পালাচ্ছে। ইয়াবা সা¤্রাজ্যের আরেক ডন হিসেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি টেকনাফ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, সাবেক বিএনপি নেতা ও বর্তমানে আওয়ামী লীগ নেতা জাফর আহমদও কয়েক দিনের মধ্যে সৌদি আরব পাড়ি জমাতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে। টেকনাফ সীমান্তের ইয়াবা কারবারি হিসেবে তালিকাভুক্ত আরো অনেকেই ওমরাহ হজসহ নানা অজুহাতে বিদেশ পাড়ি দিয়েছে বা দিচ্ছে।