শিখতে হলে মুখস্থ নয়, জানতে হবে।

মে এবং জুন মাসের মাঝে পড়েছে পবিত্র রমজান মাস এ এক মজার সময়। এই সময় সুইডেনের প্রকৃতির বাহার সাথে আবহাওয়া এতটাই সুন্দর হয়ে উঠিছে যা উপভোগ না করলেই নয়। মনে হচ্ছে সুশিক্ষার ওপর লেখালেখি করার এক চমৎকার সময় এটা। আজকের লেখার বিষয়বস্তু হবে কিছুটা ভিন্ন ধরনের। এ খুবই প্রয়োজন বিশ্বব্যাপী চলাচল, বেঁচে থাকা, ব্যবসা-বানিজ্য করা, বিভিন্ন জাতির মধ্যে ভালবাসার সেতু তৈরি করে সৌজন্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ বজায় রাখা এবং মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য।
আমাকে দিয়ে শুরু করি।এইচ.এস.সি পাশ করে উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশ যাত্রা করি, সুইডেনে। সুইডেনের বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্ডারগ্রাজুয়েট পড়তে তখন (১৯৮৪ সাল) প্রয়োজন, এইচ.এস.সি বা বি.এসসি পাশ সাথে TOEFL বা IELTS, স্কোর ৫০০ কমপক্ষে, সাথে ৪০০০০ সুইডিস ক্রোনার প্রতিবছর ব্যাংকে থাকতে হবে। প্রথম ছয় মাস ভাষা শিখতে হবে এবং আমার ক্ষেত্রে সুইডিস ভাষা শেখার মাধ্যম হবে ইংরেজি।

এক বছরের মধ্যে শিখতে হবে সুইডিস ভাষা এবং তার পর এই সুইডিস ভাষাতে করতে হবে লেখাপড়া। নতুন জীবন শুরু হবে এই নতুন ভাষার মধ্য দিয়ে। ১৯৮৫-১৯৯০ এই পাঁচ বছর সময়ের মধ্যে অংক, রসায়ন,পদার্থবিজ্ঞান, কম্পিউটার এগুলো পড়তে হয়েছিল সুইডিস ভাষাতে। বুঝে, মুখস্থ করে নয়। তার পর চাকরী করা, বিয়ে করা, সামাজিকতা বজায় রাখা, সবই হয়েছে সম্ভব এই সুইডিস ভাষাকে মাধ্যম করে।সুইডিস ভাষা শিখার উদ্দেশ্য ছিল একটাই তা হল এই ভাষার মাধ্যমে সব কিছু জানতে হবে এবং শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। যেমন “জল পড়ে পাতা নড়ে”, পাতার উপর যে দেশেই জল পড়ুক না কেন, পাতা নড়বেই, এ এক ইউনিভার্সাল ট্রুথ, এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। ভাষার ভিন্নতা রয়েছে সত্যি কিন্তু সামগ্রী এক এবং অভিন্ন।
অন্যান্য ভাষার মত আরবি ভাষা শেখারও একটি গুরুত্ব রয়েছে বিশেষ করে ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী আমাদের জন্য, কারণ পবিত্র কোরআন শরিফ আরবি ভাষাতে নাজিল হয়েছে। তাই আমাদের জন্য এ ভাষা শেখা বা বোঝা খুবই গুরুত্বপূর্ণ তাতে কারো কোন সন্দেহ নেই বা থাকার কথা নয়।

আমার ভাবনা থেকে এই বিষয়ে কিছু কথা বলতে চাই। ৫৭০ সালে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর জন্ম, ৬১০ সাল থেকে তাঁর উপর কোরআন শরিফ নাজিল হতে শুরু হয়, এবং তখন থেকে মুসলিমরা রাজ্য বিজয় ও ইসলাম প্রচারের জন্য দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ে।তখন থেকে শুরু হয় সারা মুসলিম বিশ্বে আরবি পড়া, মুখস্থ করা এবং শেখা। কিন্তু দুঃখের বিষয় আজ ২০১৮ সাল এখনও আমি জানিনা কত জন বাংলাদেশী মুসলিম পবিত্র কোরআন শরিফ পড়তে পারে, বুঝে ? মুখস্থ বিদ্যা হিসাবে কোরআন শরিফের পরিচিতি এত বেশি যা পৃথিবীর অন্য কোন গ্রন্থের ক্ষেত্রে আছে বলে আমার জানা নেই। তবে এই পবিত্র কোরআন শরিফ বোঝার জন্য মুষ্টিমেয় লোক তাদের মত করে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন যুগ যুগ ধরে কিন্তু কেন ? জানা এবং বোঝার জন্যেই নিশ্চিত ছাত্ররা মাদ্রাসা বা বিভিন্ন ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনো করছে।অথচ তাদের শিক্ষা হচ্ছে কি তেমন ভাবে যেমনটি হয়েছিল আমার ক্ষেত্রে আমি যখন পড়েছিলাম সুইডেনে? আমার প্রশ্ন কেন শুধু ছেলেরা মাদ্রাসাতে পড়ছে ? কেন খুবই কম সংখ্যক মেয়েরা পড়ছে সেখানে ? তাদেরও তো সমপরিমান অধিকার রয়েছে ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহন করার? এসেছিলাম সুইডেনে শিক্ষা গ্রহন করতে, তাদের ভাষায় তাদের কথা বুঝতে, শিখতে, মুখস্থ করতে নয়। আজ বাংলাদেশের একটা ভিডিও ক্লিপ দেখলাম যেখানে মসজিদের আশেপাশে পাবলিক টয়লেটের ব্যবস্থা রয়েছে এবং তার পাশে দেওয়ালে বাংলাতে লেখা রয়েছে “এখানে প্রস্রাব করা নিষেধ” সত্ত্বেও বেশির ভাগ লোক প্রস্রাব করছে দেওয়ালের আশে পাশে। আমাদের মাননীয় ধর্ম মন্ত্রনালয়ের সেখানে নতুন এক ইনোভেটিভ চিন্তার উদয় হয়েছে, তারা বাংলায় ঐ লেখাটা মুছে সেখানে আরবিতে লিখে দিয়েছে একই কথা। এখন কেউ আর প্রস্রাব করছে না দেওয়ালে। কারন আরবি লেখা দেখেই সবাই প্রস্রাব না করে চলে যাচ্ছে। এটা একটি বড় সাফল্য বলে কর্তৃপক্ষ মনে করছেন। আমার ভাবনা, যদি সবাই বুঝত লেখাটার মানে কী এবং মানে জানার পরেও মানুষ কি প্রশ্রাব করত সেখানে?
নিজের ভাষা বা নীতিবোধ ও অস্তিত্বকে অবজ্ঞা করে অন্যের ভাষা বা অস্তিত্বের উপর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা। জানি না এ বিষয়ে কোন ধর্মে বা সমাজে তেমন কিছু বর্নিত আছে কিনা!

শুধু আরবি লিখা দেখে অনেকেই প্রস্রাব থেকে বিরত হোল অথচ একই কথা লিখা ছিল মাতৃভাষাতে তা সত্বেও সবাই সেখানে প্রস্রাব করেছে। জেনে শুনে অন্যায় কাজ করা আর না জেনে অন্যায় কাজ না করা। ভয়? রেসপেক্ট ? না নীতি ও মূল্যবোধের অবনতি ? বাংলাদেশে যে পরিমান মাদ্রাসা বা ধর্মশিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেখানে কী শিক্ষা হচ্ছে? কীভাবে শিক্ষা প্রদান করা হচ্ছে? তা আমি জানিনে, তাই প্রশ্ন সেখানে কি তেমন করে আরবি ভাষা শেখানো হয়, যেমনটি আমাকে সুইডিস বিশ্ববিদ্যালয় শিখিয়েছিল? এক বছরের শিক্ষা আমাকে পুরো সুইডিস ভাষা শিখতে সাহায্য করেছিল। যে ভাবে সাধারন সুইডিস নাগরিকরা জীবন যাপন করে সুইডিস ভাষার সাথে, ঠিক সেই ভাবে শিক্ষা দিয়েছিল। তা যদি হয় তবে নিশ্চিত যারা আরবি লাইনে পড়াশুনো করছে তারা সবকিছু বুঝে এবং জেনে শিক্ষা গ্রহন করছে এবং সব সাবজেক্টই তারা আরবিতে পড়ছে। আর তা যদি না হয় তবে আমার প্রশ্ন শুধু আরবি ভাষা শেখার জন্য তো আলাদা স্কুল কলেজ থাকার কথা নয়? আরবি ভাষা শিক্ষার পদ্ধতি তো সাধারনত অন্য ভাষার মতই হবার কথা? ব্যতিক্রম হতে পারে যদি কেউ ধর্ম নিয়ে গবেষণা করে বা ধর্মীয় প্রফেশনের সাথে সংযুক্ত থাকতে চায় অথবা যদি আরবিতে সব সাবজেক্টই পড়ানো হয় যেমন অংক থেকে শুরু করে রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান ইত্যাদি ইত্যাদি ! আরবিতে পড়া শুনোর মধ্য দিয়ে যদি অর্থ বোঝানো বা শেখানোর পদ্ধতি না জানা থাকে তাহলে সে শিক্ষাঙ্গনগুলোতে সত্বর কার্যকর সুশিক্ষার ব্যবস্থা চালু করতে হবে, তা নাহলে এ শিক্ষা জাতির জন্য উপযোগী হবে না। হবে না ধর্ম শিক্ষার প্রতিফলন, হবে না তার মূল উদ্দেশ্য সফল।

না বুঝে বা মুখস্থ করে পড়লে কি হয় এবার সে বিষয়ে কিছু লিখি। আমাদের মন একটি চলমান অনুভুতি যাকে এক জায়গায় ধরে রাখা কঠিন যদি মুহর্তটি আনন্দময় না হয় বা বিশাল প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম না হয় মনের ওপর। একটি উদাহরন দিতে চাই। আমরা যখন নামাজ পড়ি পাঁচ ওয়াক্ত, নামাজের সাথে কত গুলো সুরা মুখস্থ পাঠ করি, ভাবুন নামাজের মধ্যের সময় মনের মধ্যে কত ধরনের কথা উদয় হয়। কিভাবে আমাদের মন দেশ বিদেশ বা দৈনন্দিন জীবনের অনেক স্মৃতিচারণ করে? মনকে এক জায়গাতে ধরে রাখা বিরাট কঠিন ব্যপার। “হেয়ার এ্যন্ড নাও কনসেপ্টের মধ্য দিয়ে ”, মনকে কন্ট্রোলে রাখতে হলে দরকার কলুষতা মুক্ত, দুর্নীতি মুক্ত এবং দুশ্চিন্তা মুক্ত মন রাখা এবং অবস্থার সাথে অ্যাডজাস্ট করার কৌশল তৈরি করা। এই কৌশল তৈরি/সৃস্টি করতে হলে দরকার প্রশিক্ষণের। যেহেতু সুশিক্ষার জন্য সংগ্রাম তাই এই প্রশিক্ষণ পেতে হলে জানতে হবে, জানতে হলে শিখতে হবে, শিখতে হলে মন দিয়ে পড়তে হবে এবং বুঝতে হবে, সাথে “হেয়ার এ্যান্ড নাও কনসেপ্ট” ব্যাবহার করতে হবে।

সোনার বাংলা পেতে হলে ক্রস ফায়ার বা বন্দুক যুদ্ধ নয়, ( এ শুধু সমাজে ঘৃনা এবং প্রতিশোধ মুলক আচরন সৃষ্টি করবে, বাড়বে অরাজকতা, অবনতি হবে গণতন্ত্রের), দরকার সুশিক্ষার এবং সুস্থ্য পরিচালনার, ম্যানেজমেন্ট বাই থ্রেট্স নয় দরকার ম্যানেজমেন্ট বাই অব্জেক্টিভস, এবং তার জন্য প্রয়োজন বিশেষায়িত শিক্ষা প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয়ের।

সুইডেন থেকে – রহমান মৃধা, পরিচালক ও পরামর্শক।, [email protected]