ট্রেনের অগ্রিম টিকিট সংগ্রহের যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এবার বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে মানুষ। রোববার (১০ জুন) সকাল থেকে কমলাপুর রেলস্টেশনে বাড়ি ফেরার ভিড় জমতে দেখা যায়। জানা যায়, ১ জুন যারা ঈদের অগ্রিম টিকিট কিনেছিলেন, তারাই আজ বাড়ির পথে যাত্রা শুরু করেছেন। স্টেশন সূত্র জানিয়েছে, রবিবার (১০ জুন) কমলাপুর স্টেশন থেকে ৬৩টি ট্রেন ছেড়ে যাবে। এরমধ্যে ২৮টি আন্তঃনগর। বাকিগুলো মেইল, এক্সপ্রেস এবং লোকাল ট্রেন।সরেজমিনে দেখা যায়, স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে কিশোরগঞ্জ যাওয়ার জন্য কমলাপুর স্টেশনে এসেছেন একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা রাজিব হায়দার। তিনি বলেন, ঈদের আগ মুহূর্তে ব্যাপক ঝামেলা থাকে। তাই গত ১ জুন অগ্রিম টিকিট সংগ্রহ করেছি। আজ বাড়ি ফিরতে যাত্রা শুরু করেছি।

জামালপুরগামী অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস ট্রেনে পরিবারের সদস্যদের তুলে দিতে কমলাপুর এসেছেন একটি ডেইরি ফার্মের কর্মকর্তা মিঠু। তিনি বলেন, ‘অনেক ভিড়। দুর্ভোগ এড়াতেই পরিবারকে আগে পাঠিয়ে দিচ্ছি।খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রবিবার বেলা ১২টা পর্যন্ত ৩০টির মতো ট্রেন কমলাপুর স্টেশন ছেড়ে গেছে। স্টেশন ম্যানেজার সিতাংশু চক্রবর্ত্তী সাংবাদিকদের বলেন, রোববার সকাল থেকে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনগুলো তো স্বাভাবিক ভিড় ছিলো ।তিনি আরও বলেন, এখনও উপচেপড়া ভিড় শুরু হয়নি। ১২ জুন থেকে ভিড় বাড়বে। এছাড়া সকালে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনগুলোর মধ্যে শুধুমাত্র সুন্দরবন এক্সপ্রেস ৩০ মিনিট দেরি করেছে। সেটা দেরি করেই স্টেশনে এসেছিল। বাকি ট্রেনগুলো সব ঠিক সময়ে ছেড়েছে। অগ্রিম টিকিট ছাড়াও দাঁড়িয়ে যাওয়ার টিকিটও বিক্রি করা হবে।

এবার ঈদের সময় ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনগুলো প্রতিদিন প্রায় লাখেরও বেশি যাত্রী বহন করতে পারবে বলেও জানান সিতাংশু চক্রবর্ত্তী।তিনি জানান, অগ্রিম টিকিটসহ সব মিলিয়ে ৭৫ হাজারের মতো টিকিট দেওয়া হয়েছে। ঈদের আগে যাত্রীদের চাহিদা অনুযায়ী কিছু স্ট্যান্ডিং টিকেটও দেওয়া হবে। সব মিলিয়ে প্রায় এক লাখ যাত্রী যেতে পারবে প্রতিদিন। এদিকে, রোববার রাজধানীর বিভিন্ন বাস ও লঞ্চ টার্মিনালে বাড়ি যাওয়া মানুষের ব্যাপক ভিড় লক্ষ করা গেছে। যারা ঈদের আগ মুহূর্তে ঝক্কি ঝামেলা এড়াতে চান তারা একটু আগে ভাগেই যাচ্ছেন। অর্থাৎ ভোগান্তির আতঙ্ক থেকেই অগ্রিম ঈদযাত্রা। এদিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ব্যাপক ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে ঘরে ফেরা মানুষের। মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে ময়মনসিংহ যেতে সাধারণত দুই ঘণ্টা সময় লাগলেও ছুটির দিনে তা ৫ ঘণ্টায় ঠেকেছে। উত্তরাঞ্চলের বাসের অগ্রিম টিকেট নেয়া যাত্রীদের ভিড় দেখা গেছে গাবতলীসহ আশপাশের এলাকার কাউন্টারগুলোতে।

ট্রেনের যাত্রীদের জন্য গত এক জুন বিক্রি হয় ১০ জুনের টিকেট। ২ জুন ১১ জুনের, ৩ জুন ১২ জুনের, ৪ জুন হবে ১৩ জুনের, ৫ জুন ১৪ জুনের এবং ৬ জুন ১৫ জুনের অগ্রিম টিকেট বিক্রি হয়েছে। এই হিসেবে আজ রবিবার থেকে অগ্রিম টিকেট নেয়া যাত্রীদের বাড়ি ফেরা শুরুর কথা। কিন্তু অনেকেই অগ্রিম টিকেট সংগ্রহ করতে পারেননি। তাই একটু আগে ভাগেই পরিবার পরিজন বাড়ি পাঠানোর চেষ্টা করছেন। সকালে কমলাপুর রেল স্টেশনে গিয়ে দেখা গেছে, বাড়ি ফেরা মানুষের উপচে ভিড়। প্রতিটি কাউন্টারে টিকেট সংগ্রহের প্রাণান্ত চেষ্টা চলছে। রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অন্য দিনের চেয়ে আজকে ভিড় তুলনামূলক বেশি। টিকেটের চাহিদাও অনেক। কিছু কিছু ট্রেনের টিকেট রয়েছে। যা যাত্রীরা সংগ্রহ করছেন। অনেকেই স্ট্যান্ডিং টিকেট কিনেও বাড়ি যাচ্ছেন।

সকাল থেকে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালেও ঘরমুখো মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। সাত জুন থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত বাসের অগ্রিম টিকেট বিক্রি হয়েছে। শুধুমাত্র উত্তরাঞ্চলের যাত্রীদের জন্য বাসের অগ্রিম টিকেট বিক্রি হয়। গাবতলী, শ্যামলী, কল্যাণপুর, মোহাম্মদপুরসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকার কাউন্টার থেকে যাত্রীরা টিকেট সংগ্রহ করেন। শুক্রবার সকাল থেকে কলেজগেট থেকে গাবতলী পর্যন্ত বিভিন্ন বাস কাউন্টারে যাত্রীদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা গেছে। শ্যামলী, সোহাগ, ডিপজল পরিবহন, এ আর ট্রাভেলস, হানিফ পরিবহনসহ বিভিন্ন কাউন্টারের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সাত জুন থেকেই ঈদ উপলক্ষে যাত্রীরা বাড়ি ফিরতে শুরু করেছেন। দিন দিন ভিড় বাড়ছে।সকাল ছয়টায় এনা পরিবহনে ময়মনসিংহের উদ্দেশে রওনা দেন আশরাফ ও রাসেল। তারা জানান, দুই ঘণ্টা সময়ে মহাখালী থেকে ময়মনসিংহ পৌঁছানো গেলেও শুক্রবার তা ছিল একেবারেই ব্যতিক্রম। উত্তরা থেকে জয়দেবপুর চৌরাস্তা ও মাওনা পয়েন্টে সবচেয়ে বেশি যানজট ছিল। এর কারণ হিসেবে তারা বলেন, টঙ্গী ব্রিজ থেকে সমস্যা সবচেয়ে বেশি। সড়কের দু’পাশে ড্রেন দু’বছরেও সংস্কার হয়নি। নিষিদ্ধ যানবাহনের দৌরাত্ম্য তো আছেই। তাছাড়া সড়কের উভয়পাশে অবৈধ পার্কিং ও হাটবাজার আছেই। সেই সঙ্গে বৃষ্টির কারণে রাস্তার অর্ধেক অংশ ডুবে থাকায় এক লেনে ধীরগতিতে যানবাহন চলাচল করছে।

এদিকে আজ ১০ জুন থেকে দেয়া হয় ট্রেনের অগ্রিম ফিরতি টিকেট। পাঁচ দিনব্যাপী এই কার্যক্রম চলমান থাকবে। ঈদ উপলক্ষে এবার প্রতিদিন প্রায় তিন লাখ যাত্রী গন্তব্যে যেতে পারবেন বলে জানিয়েছেন রেলমন্ত্রী মোঃ মুজিবুল হক। তিনি বলেন, রেলে সাধারণ সময়ে ২ লাখ ৬০ হাজার যাত্রী চলাচল করতে পারেন। ঈদ উপলক্ষে সর্বোচ্চ তিন লাখ মানুষ আসা-যাওয়া করতে পারবেন।ঈদ উদযাপন শেষে কর্মস্থলে গমনেচ্ছু যাত্রীদের ১০ জুন দেয়া হবে ১৯ জুনের টিকেট, ১১ জুন দেয়া হবে ২০ জুনের, ১২ জুন দেয়া হবে ২১ জুনের, ১৩ জুন দেয়া হবে ২২ জুনের, ১৪ জুন দেয়া হবে ২৩ জুনের এবং ১৫ জুন দেয়া হবে ২৪ জুনের অগ্রিম ফিরতি ট্রেনের টিকেট। রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, দিনাজপুর ও লালমনিরহাট স্টেশন থেকে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় অগ্রিম টিকেট বিক্রি হবে।এবার টিকেট ছাড়া ভ্রমণ করা যাত্রীদের বিষয়ে করণীয় জানতে চাইলে রেলমন্ত্রী বলেন, রেলে আসা-যাওয়া মানুষ বেশি পছন্দ করেন। যাত্রীরা স্বেচ্ছায় ছাদে ওঠে। ছাদে ওঠা আমরা কোন অবস্থাতেই মেনে নিই না। কর্তব্যরতদের বলেছি, ছাদে যারা উঠবে তাদের নামিয়ে দিয়ে ভেতরে বসে ভ্রমণের জন্য ব্যবস্থা নিতে। বেআইনী কাজ আমরা এলাও করতে পারি না। আমাদের দায়িত্ব হলো ভদ্রভাবে তাদের নিবৃত করা।

ঈদের সময় কৃত্রিম সঙ্কট হবে কিনা জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, রেলের সঙ্গে যুক্ত সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি (শুক্রবারসহ) বাতিল করা হয়েছে। নাশকতা নৈরাজ্য আমরা কামনা করি না। যেখানে নাশকতা যেখানে দুর্নীতি, সেখানে আমাদের বাহিনী প্রস্তুত আছে। এর বাইরে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও আনসার মোতায়েন থাকবে।মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ঈদ উপলক্ষে সর্বমোট ১ হাজার ৪০৫টি কোচ (বিদ্যমান-১২২১+সপ আউট-টার্ন-১৮৪) চলাচল করবে। সর্বমোট ২২৯টি লোকোমোটিভ ব্যবহার করা হবে। যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচলের সুবিধার্থে ঈদের তিন দিন আগে থেকে কনটেনার ও জ্বালানি তেলবাহী ট্রেন ছাড়া কোন মালবাহী ট্রেন চলাচল করবে না। ১৫, ১৬, ১৭ ও ১৮ জুন মৈত্রী এক্সপ্রেস চলাচল করবে না। এছাড়া ১১ জুন থেকে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত সকল আন্তঃনগর ট্রেনের সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল করা হয়েছে। ট্রেনে যাতে যাত্রীরা নির্বিঘেœ যাতায়াত করতে পারেন সে জন্য ঈদে অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের ব্যবস্থা রাখার কথা জানিয়ে রেল কর্মকর্তারা বলেন, রেলে যে পরিমাণ যাত্রী আসা যাওয়া করে, তারচেয়েও বেশি যাত্রী আসা-যাওয়ার সুযোগ পাবেন এবারের ঈদে। ট্রেন প্রতিদিন দুই লাখ ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহন করে। ঈদ উপলক্ষে দুই লাখ ৭৫ হাজারের ওপর যাত্রী পারাপারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এই সংখ্যা তিন লাখও হতে পারে।