উপচেপড়া ভিড়ে ট্রেনের টিকেট বিক্রিতে অনিয়ম:নেট বিচ্ছিন্নে ভোগান্তি

ইন্টারনেট সংযোগে সমস্যার কারণে ঈদের ট্রেনের আগাম টিকেট বিক্রি বিঘিœত হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন রাত থেকে কাউন্টারের সামনে অপেক্ষায় থাকা হাজার হাজার টিকেটপ্রত্যাশী।অগ্রিম টিকেট বিক্রির চতুর্থ দিন শনিবার ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে দেড় ঘণ্টার বেশি সময় টিকেট বিক্রি বন্ধ থাকে। একই কারণে চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে টিকেট বিক্রি বন্ধ থাকে প্রায় দেড় ঘণ্টা।দুই স্টেশনেই সকাল ৮টায় নির্ধারিত সময়ে কাউন্টার খুলে টিকেট বিক্রি শুরু করেন রেল কর্মকর্তারা। কিন্তু কমলাপুরে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সমস্যা শুরু হয়। ইন্টারনেট বিঘিœত হওয়ায় সার্ভারে ঢুকতে না পেরে তারা টিকেট বিক্রি করতে পারছিলেন না। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কমলাপুরে টিকেট বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। পরে লাইন ঠিক হওয়ার পর বেলা ১২টায় আবার টিকেট বিক্রি শুরু হয় বলে কমলাপুরের স্টেশনের ম্যানেজার সিতাংশু চক্রবর্তী জানান।একই কারণে চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনেও সকাল ১০টা ১০ মিনিট থেকে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত টিকেট বিক্রি বন্ধ ছিল বলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চিফ কর্মাশিয়াল ম্যানেজার সরদার শাহাদাত আলী জানান।ফাইবার অপটিক কেবল কাটা পড়ায় শুক্রবারও চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে নির্ধারিত সময়ের দেড় ঘণ্টা পর টিকেট বিক্রি শুরু করেছিল রেল কর্তৃপক্ষ।
ঢাকা রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইয়াসিন ফারুক মজুমদার বলেন, সার্ভারে ত্র“টির কারণে এক ঘণ্টা টিকিট বিক্রি বন্ধ ছিল। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে আবার বিক্রি শুরু হয়। এখনো কাউন্টারগুলোর সামনের জায়গা মানুষে ছিল ঠাসা।টিকিট কিনতে আসা লালমনিরহাটের রিয়াজুল ইসলাম জানান, তিনি শুক্রবার রাত নয়টায় লালমণি এক্সপ্রেসের টিকিট নিতে এসেছিলেন। কিন্তু তখন তিনি সিরিয়াল দিতে পারেননি। আজ ভোর পাঁচটায় আবার আসেন। তখন ১৪ নম্বর কাউন্টারে ৩২৫ নম্বর সিরিয়াল পান। এখনো টিকিটের অপেক্ষায় আছেন।রিয়াজুল বলেন, লালমণি এক্সপ্রেসের টিকিট শেষ বলে শুনেছি। এখন ঈদ স্পেশাল ট্রেনের টিকিটের অপেক্ষায় আছি। বাসের টিকিটও পাইনি। টিকিট না পেলে পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে পারব না।নারীদের কাউন্টারে প্রায় ১৪ ঘণ্টা অপেক্ষার পর বেলা সোয়া একটার দিকে টিকিট পেয়েছেন মৌসুমি আক্তার। তিনি বলেন, যাব দিনাজপুরে। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে দিনাজপুর এক্সপ্রেসের শোভন আসনের তিনটি টিকিট পেয়েছি।ঈদুল আজহা উপলক্ষে ৮ আগস্ট থেকে ট্রেনের আগাম টিকিট বিক্রি শুরু হয়েছে। ১২ আগস্ট দেওয়া হবে ২১ আগস্টের আগাম টিকিট।একজন যাত্রী সর্বোচ্চ চারটি টিকিট নিতে পারবেন। বিক্রি হওয়া টিকিট ফেরত নেওয়া হবে না। রেলে সচরাচর যাত্রী ধারণ ক্ষমতা প্রতিদিন ২ লাখ ৬০ হাজার। ঈদ উপলক্ষে তিন লাখ যাত্রী চলাচলের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ঈদের সময় নয় জোড়া বিশেষ ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এসব বিশেষ ট্রেনের মধ্যে ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ-ঢাকা রুটে চলবে দেওয়ানগঞ্জ স্পেশাল, চাঁদপুর স্পেশাল-১ ও চাঁদপুর স্পেশাল-২ চলবে চট্টগ্রাম-চাঁদপুর-চট্টগ্রাম রুটে, রাজশাহী স্পেশাল চলবে রাজশাহী-ঢাকা-রাজশাহী রুটে, দিনাজপুর স্পেশাল চলবে দিনাজপুর-ঢাকা-দিনাজপুর, লালমণি স্পেশাল চলবে ঢাকা-লালমনিরহাট-ঢাকা রুটে, খুলনা এক্সপ্রেস চলবে খুলনা-ঢাকা-খুলনা রুটে। এ ছাড়া শোলাকিয়া স্পেশাল-১ চলবে ভৈরববাজার-কিশোরগঞ্জ-ভৈরববাজার রুটে এবং শোলাকিয়া স্পেশাল-২ চলবে ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ রুটে।
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে মোট ১ হাজার ৪০২টি কোচ চলাচল করবে এবং ২২৯টি লোকোমোটিভ ব্যবহার করা হবে।এবার ২২ অগাস্ট কোরবানির ঈদ ধরে ২১, ২২ ও ২৩ অগাস্ট কোরবানি ঈদের ছুটি নির্ধারণ করে রেখেছে সরকার। ছুটি শুরুর আগে শেষ কর্মদিবস ২০ অগাস্ট। ওইদিনের টিকেটই শনিবার বিক্রি করছে রেল কর্তৃপক্ষ।ঈদের আগে শেষ কর্মদিবসে অফিস শেষ করে অনেকে গ্রামের বাড়ির পথ ধরেন বলে ২০ অগাস্টের টিকেটের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বেশি থাকে। ফলে রেল স্টেশনে আগাম টিকেটের লাইনে শনিবারই সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা গেছে এবার।সকাল ৮টায় কমলাপুরের ২৬টি কাউন্টারে টিকেট বিক্রি শুরু হয়। বেলা ১০টার সময়ও স্টেশন ভবনের বাইরে পর্যন্ত টিকেট প্রত্যাশীদের লাইন দেখা যায়।চট্টগ্রামের যাত্রী মো. আবদুল আজিজ জানান, শুক্রবার সন্ধ্যার পর এসে লাইনে দাঁড়িয়ে শনিবার বেলা পৌনে ৯টার দিকে কাঙ্খিত টিকেট পেয়েছেন তিনি।এখন বাসের চেয়ে ট্রেনে যাতায়াত করা সহজ। তাছাড়া ট্রেনের সেবার মানও আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে। সড়কপথে গেলে জ্যামে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। এজন্য ট্রেনে যাই আরকি! বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকুরে বিজয় যাবেন সিলেটে। তিনিও শুক্রবার রাত থেকে কাউন্টারের সামনে টিকেটের অপেক্ষায় ছিলেন। শনিবার বেলা ৯টায় পারাবাত এক্সপ্রেসের টিকেট হাতে পান।সিলেটের সড়ক যোগাযোগ খারাপ না। কিন্তু তারপরও তা ট্রেনের মত আরামদায়ক না। ১১ নম্বর সিরিয়াল ছিল আমার। সহজেই টিকেট পেয়ে গেছি। যেতে সমস্যা হবে না আর।অবশ্য তাদের মত মুখে হাসি নিয়ে ফিরতে পারেননি অনেকেই।
হক গ্র“পের বিক্রয় বিভাগের কর্মকর্তা শাহীন আলম জানান, আঠারো নম্বর সিরিয়ালে থাকলেও তিনি কাঙ্খিত টিকেট পাননি।সারারাত অপেক্ষা করেও যদি প্রত্যাশিত টিকেট না পাই কেমন লাগে বলেন? অথচ আমার আগে মাত্র ১৭ জনকে টিকেট দিয়েছে। এর মধ্যেই এসি টিকেট শেষ! এইটা মানা যায় না।
লালমনি এক্সপ্রেসের টিকেট কিনতে আসা ওয়ালিউল্লাহ অভিযোগ করেন, টিকেট নিয়ে দুর্নীতি হচ্ছে।এই ট্রেনে ৪০০ এসি সিট। আমার আগে ২০ জন টিকেট নিয়েছে। সবাই চারটা করে নিলেও তো আশিটার বেশি যায় না। ৬৫ ভাগ কোটা হিসেব করলে কাউন্টারে ২৬০টা টিকেট থাকার কথা। টিকেট নিয়ে নিশ্চয়ই কোনো দুর্নীতি হচ্ছে। নইলে টিকেট যাবে কই?কমলাপুরে নারীদের জন্য দুটি কাউন্টার থাকলেও বেলা সাড়ে ৯টা পর্যন্ত অগ্রিম টিকেট দেওয়া হচ্ছিল একটি কাউন্টার থেকে। এ কারণে সেখানে ভিড় ছিল অন্য কাউন্টারগুলোর চেয়ে বেশি।খুলনার সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনের টিকেট কিনতে আসা জেসমিন সুলতানা বলেন, এখানে এক কাউন্টারে সব ট্রেনের টিকেট দেয়। অন্য কাউন্টারের চেয়ে গতিও কম। ফলে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। দেখেন, পৌনে এক ঘণ্টায় মাত্র ২৩ জনকে টিকেট দিতে পেরেছে।টিকেটপ্রত্যাশীরা যখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে লাইনে অপেক্ষা করছেন,আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাউকে কাউকে তখন লাইন ভেঙে কাউন্টার থেকে টিকেট কেনার চেষ্টা করতে দেখা যায়।সকাল ৯টার দিকে রাজশাহীর কাউন্টারের সামনে দেখা যায় একজন আরেকজনকে ধমকাচ্ছেন। ওয়াকিটকি হাতে যিনি ধমকাচ্ছিলেন তিনি নিজেকে রেলপুলিশের সদস্য পরিচয় দেন।একটু পর কাউন্টারের সামনে গিয়ে টিকেটের জন্য একটি স্লিপ লিখে কাউন্টারের ভেতরে থাকা বিক্রয়কর্মীকে দেন। এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি টিকেট কাটব না কি করব এর জবাব কি আপনাকে দিতে হবে নাকি।এরপর সাংবাদিক পরিচয় দিলে তিনি বলেন, রেলস্টেশনে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন।দায়িত্বপালনরত অবস্থায় সিরিয়াল ভেঙে টিকেট কেনা যায় কি না জানতে চাইলে কোনো উত্তর দেননি তিনি। এক পর্যায়ে টিকেট না নিয়েই সেখান থেকে চলে যান তিনি।
রেল পুলিশের ওই সদস্য যার সঙ্গে বাক বিতন্ডা করছিলেন. সেই ব্যাংক কর্মকর্তা আরিফুর রহমান বলেন, এদের কাজ নিরাপত্তা দেওয়া, শৃঙ্খলা রক্ষা করা। কিন্তু তারাই লোকজনের ভিড় সরিয়ে টিকেট কেটে নিয়ে যায়। শুধু সে না, আরও অনেকে এভাবে টিকেট নিয়ে গেছে।কমলাপুরের স্টেশন ম্যানেজার সিতাংশু চক্রবর্ত্তী প্রশ্নের জবাবে বলেন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কামরার ট্রেনের টিকেট নিয়ে প্রতিদিনই অভিযোগ আসে। এ বিষয়ে তেমন কিছু করার নেই।আমাদের টিকেট কম। কিন্তু চাহিদা অনেক বেশি। এজন্য এসি টিকেট পান না বলে অনেকেই অভিযোগ করেন। কিন্তু আমাদের তো টিকেট বাড়ানোর সুযোগ নেই।নারীদের একটি কাউন্টার বন্ধ রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, একটা কাউন্টার দশটার পরে খুলে দেওয়া হবে। এর আগে একটা কাউন্টার থেকেই টিকেট দেওয়া হয়।ঈদুল আযহা উপলক্ষে কমলাপুর থেকে প্রতিদিন ৩৫টি আন্তঃনগর ট্রেনের ২৬ হাজার ৮৯৫ টি টিকেট বিক্রি হচ্ছে বলে স্টেশন ম্যানেজার জানান।রেল পুলিশের সদস্যদের টিকেট নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে কমলাপুর রেলওয়ে থানার ওসি ইয়াসিন ফারুক মজুমদারকে ফোন করলেও তিনি ধরেননি।