হাটহাজারী পৌরসভার ফটিকা গ্রামের শাহজালাল পাড়া এলাকা থেকে নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন পর তাসনিম সুলতানা তুহিন (১৩) নামে এক স্কুল ছাত্রীর গলিত লাশ উদ্ধার করেছে মডেল থানা পুলিশ। গত রবিবার (১৬ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ৯টার দিকে ওই এলাকার সালাম ম্যানশন নামে ছয় তলা বিশিষ্ট একটি ভবনের চতুর্থ তলার একটি ফ্ল্যাট থেকে পুলিশ তুহিনের লাশ উদ্ধার করে। তুহিন ওই ভবনের মালিক উপজেলার গড়দুয়ারা ইউনিয়নের নেয়ামত আলী সারাং বাড়ির আবু তৈয়বের কন্যা এবং হাটহাজারী গালর্স হাই স্কুল এন্ড কলেজের ৮ম শ্রেণির ছাত্রী। তবে প্রায় ১৮ মাস যাবৎ তুহিন তার পরিবারসহ ফটিকা শাহজালাল পাড়ার তাদের মালিকানাধীন সালাম ম্যানশনের ২য় তলায় বসবাস করে আসছে।

রবিবার সন্ধ্যায় পৌর এলাকা থেকে থানা পুলিশ শাহনেওয়াজ সিরাজ মুন্না (২৬) নামে এক বখাটে যুবককে আটক করে। ওই যুবকের স্বীকারোক্তি মোতাবেক রাত ৯টার দিকে পুলিশ তার (তুহিন) লাশটি উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। পুলিশের হাতে আটক বখাটে যুবক শাহানেওয়াজ মুন্না একই পৌরসভার চন্দ্রপুর গ্রামের পল্লী চিকিৎসক মোহাম্মদ শাহাজান সিরাজের পুত্র বলে জানা গেছে। দীর্ঘদিন যাবৎ মুন্নার পরিবারও পৌর এলাকার শাহাজালাল পাড়ার সালাম ম্যানশনের চতুর্থ তলার একটি ফ্ল্যাটে বাসা ভাড়ায় থাকতো। বখাটে মুন্না সরকার দলীয় ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল। সম্প্রতি সে ছাত্র রাজনীতির বাইরে থেকে ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরণের মাদক সেবন ও বিক্রির সাথে সম্পৃক্ত ছিল। এছাড়া সে মাদক সেবী ও বিক্রেতার গ্রুপের একটি দলের নেতৃত্ব দিত বলে প্রাপ্ত সংবাদে প্রকাশ।

রাত সাড়ে ৯টায় ঘটনাস্থলে গেলে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তুহিনের ছোট মামা মো. সাইফুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, তুহিনের পিতা-মাতা বর্তমানে হজ্ব পালনের উদ্দেশ্যে সৌদিআরব অবস্থান করছেন। শুক্রবার মাগরিবের নামাজ শেষে সালাম ম্যানশনের নানুর নিচ তলার ফ্ল্যাট থেকে ২য় তলায় শিক্ষকের কাছে পড়তে যায়। কিন্তু এরপর থেকে তাকে আর পাওয়া যায়নি। আচরণ সন্দেহজনক হওয়ায় এর ঘন্টাখানেক পর ৪র্থ তলার ভাড়াটিয়া মুন্নাকে তুহিনের ভাই ও মামারা আটক করে থানা পুলিশে সোপর্দ করে। ওই রাতে পুলিশসহ ভবনের ষষ্ঠতলা ভবনের সর্বত্র এমনকি মুন্নার বসত ঘরে হন্য হয়ে খোঁজাও হয়। ভবনের বাইরে সম্ভাব্য সবস্থানে কোন সন্ধান না পাওয়ায় পরিবারের পক্ষ থেকে শনিবার থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি রুজু করা হয়। অপরদিকে মুন্নার কাছ থেকে কোন তথ্য না পাওয়ায় তাকে তার পিতামাতার জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়। এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুহিনের সন্ধানে পোস্ট দেওয়া হয়। পরিবার ও প্রশাসন সবাই তার সন্ধান করতে থাকে। এমনকি মুন্নাও তাদের সাথে তুহিনকে খোঁজার ভান করে। সর্বশেষ ভবনের ৪র্থ তলা থেকে রবিবার সন্ধ্যায় হঠাৎ পঁচা গন্ধ বের হলে মুন্নার পিতামাতা ও সে দ্রুত ঘর থেকে আত্মগোপনে চলে যায়।

বিষয়টি থানা পুলিশকে অহিত করা হলে হাটহাজারী বাজারস্থ ত্রিবেণীর মোড় এলাকা থেকে মুন্নাকে পুলিশ আটক করে (তবে অসমর্থিত সূত্রমতে সে নিজেই থানায় গিয়ে আত্মসমর্থন করে)। তার দেওয়া তথ্যানুযায়ী সালাম ম্যানসনের ৪র্থ তলার ফ্ল্যাটের দরজা খুলে ড্রয়িং রুমের সোফার নিচ থেকে প্লাস্টিকের বস্তা মোড়ানো তুহিনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ সময় ভবনের বাইরে হাজারো উৎসুক জনতার ভীড় লেগে যায়। ঘটনার খবর পেয়ে হাটহাজারী সার্কেল এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মাসুম, হাটহাজারী মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক বেলাল উদ্দীন জাহাংগীর, পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) শামীম শেখ সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে লাশটি উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে এবং ময়না তদন্তের জন্য লাশ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করে।

নিখোঁজ ওই ছাত্রীর লাশটি উদ্ধার হওয়ার খবর মুহুর্তের মধ্যে চর্তুদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় ওই ভবনের মূল ফটকের সম্মুখে শত শত উৎচোক জনতা ভিড় করে। ফলে লাশটি উদ্ধার করতে পুলিশকে বেশ হিমশিম খেতে দেখা গেছে। এছাড়া পুলিশ লাশটি উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যাওয়ার পরপর রাত সাড়ে ৯টার দিকে উত্তেজিত জনতা চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়কে হাটহাজারী থানার সামনে ব্যারিকেট দেয় এবং হত্যাকান্ডের সুষ্ঠু বিচার দাবী করে। ফলে দুই পার্বত্য এলাকা চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি-রাঙ্গামাটি মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এ সময় ওই দুই মহাসড়ক ব্যবহারকারী হাজার হাজার যাত্রী সাধারণ চরম দূর্ভোগে পড়তে দেখা গেছে। প্রায় ১৫ মিনিট পর হাটহাজারী মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক বেলাল উদ্দীন জাহাংগীর সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে হত্যাকা-ের সুষ্ঠু বিচারের আশ্বাস দিলে উত্তেজিত জনতা মহাসড়ক থেকে ব্যারিকেট তুলে নেয়। এ ব্যাপারে হাটহাজারী মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক বেলাল উদ্দীন জাহাংগীর এ প্রতিবেকদকে জানান, এ বিষয়ে থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি রুজু পর হতে আমরা ঘটনার ক্লু বের করতে বেশ তৎপর ছিলাম। গত রবিবার পৌর এলাকা থেকে মুন্না নামে এক যুবককে আটক করা হলে তার স্বীকারোক্তি মোতাবেক পৌর এলাকার শাহজালাল পাড়ার সালাম ম্যানশনের চতুর্থ তলার একটি ফ্ল্যাটের ড্রয়িং রুমের একটি সোফা সেটের নিচে প্লাটিক মোড়ানো অবস্থায় তুহিনের গলিত লাশটি উদ্ধার করি। এদিকে রাত ১০টার দিকে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য চমেক হাসপাতালে প্রেরণ করে। এছাড়া রবিবার রাতে এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই আকিব জাবেদ বাদি হয়ে হাটহাজারী মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা (নং-২৫) দায়ের করে। মামলায় মুন্নাকে প্রধান আসামী এবং তার বাবা মোহাম্মদ শাহাজান সিরাজ ও মা নিগার সুলতানাকেও আসামী করা হয়েছে। এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকা- এমনটা দাবী করে হাটহাজারী সার্কেল এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মাসুম জানান, রবিবার এ ঘটনার সাথে জড়িত শাহানেওয়াজ মুন্না নামে এক বখাটে যুবককে আটক করা হয়। আটককৃত ওই যুবকের স্বীকারোক্তি মূলে ওই ভবনে তল্লাশি করে ওই ছাত্রীর গলিত লাশটি উদ্ধার করা হয়। তবে কেন কি কারণে ওই যুবক এ ঘটনা ঘটিয়েছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়া ঘটনায় ওই ছাত্রীর পরিবারের পক্ষ থেকে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং গতকাল সোমবার বিকালে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দির জন্য তাকে বিজ্ঞ আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। অন্যদিকে গতকাল সোমবার চমেক হাসপাতালের মর্গ থেকে ময়না তদন্ত শেষে তুহিনের লাশ তার গ্রামের বাড়িতে আনা হলে আতœীয়-স্বজনদের আহাজারীতে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। ভারী হয়ে উঠে এলাকার আকাশ-বাতাস। তাদের সাস্বÍনা দেওয়ার কোন ভাষা এ সময় তাদের নিকট আতœীয়দের কাছে জানা ছিল না। এছাড়া বান্ধবীকে শেষ বারের মত এক নজর দেখতে তার গ্রামের বাড়িতে ভিড় করে সহপাঠীরা।এছাড়া সোমবার সকাল ১১টায় এ হত্যাকা-ের দৃষ্টান্তমূলক সুষ্ঠু বিচার দাবীতে হাটহাজারী সরকারী কলেজ, হাটহাজারী মডেল সরকারী পার্বতী উচ্চ বিদ্যালয় ও হাটহাজারী গালস্ স্কুল এ- কলেজ হাজারা হাজার শিক্ষার্থী এবং পরিচালনা পরিষেদের সদস্যরা চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি মহাসড়কে কলেজ গেইট এলাকায় মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করে। এ সময় চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি মহাসড়ক প্রায় দেড় ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে।