বিএনপিকে ছাড়াই আগামী জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ক্ষমতাসীনরা। সেই সঙ্গে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার তৎপরতা। তারা নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়ে আন্দোলনের ডাক দিলে তা মোকাবেলার প্রস্তুতি চলছে ক্ষমতাসীন মহলে। বিএনপি ও তার মিত্ররা দাবি আদায়ের নামে আন্দোলনের ডাক দিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে না এলে গতবারের মতো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফাঁদে পড়তে চায় না ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় জোট। প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি নির্বাচনে না এলেও ৩০০ আসনেই যেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী থাকে এমন প্রস্তুতি নিচ্ছে ক্ষমতাসীনরা। তারা ১৪ দলের শরিক দলগুলো, জাতীয় পার্টি এবং আরো কয়েকটি ছোট রাজনৈতিক জোট যেন নির্বাচনে অংশ নেয় সে লক্ষ্যে কাজ করছে।

এদিকে, দেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন করার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়া। একই সঙ্গে আগামী ১ অক্টোবর থেকে সারা দেশে সভা-সমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি। এর নেতারা বলেছেন, শিগগিরই ওই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন স্থানে কমিটি গঠন করা হবে। কার্যকর গণতন্ত্র, আইনের শাসনের শাসন ও জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলুন শীর্ষক নাগরিক সমাবেশ থেকে ওই ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।শনিবার বিকেলে রাজধানীর মহানগর নাট্যমঞ্চের কাজী বশিরউদ্দিন মিলনায়তনে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়া ওই নাগরিক সমাবেশের আয়োজন করে। সমাবেশের একেবারে শেষে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী শেখ শহীদুল্লাহ ঐক্যপ্রক্রিয়ার পক্ষে ওই ঘোষণা দেন। বিএনপিসহ জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর নেতারা ওই সময় মঞ্চে ছিলেন। ওই দলগুলোর মধ্যেই বৃহত্তর ঐক্য গড়ার কথা চলছে, গতকালের সমাবেশের মধ্য দিয়ে যার এক ধাপ অগ্রগতি হলো বলে মনে করছেন ওই নেতারা। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ঐক্য জরুরি এমন কথাই উঠে এসেছে সমাবেশে নেতাদের বক্তব্যে।

ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে,আমরা এই নাগরিক সমাবেশ থেকে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি, সরকার আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টির কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবে। একই সঙ্গে তফসিল ঘোষণার পূর্বে বর্তমান সরকার ভেঙে দেবে।দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে ঘোষণাপত্রে বলা হয়, ‘এই গণদাবি আদায়ের লক্ষ্যে প্রতিটি জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে মুক্তিসংগ্রামের চেতনায় বিশ্বাসী সকল রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি, শ্রেণি- পেশা ও নাগরিক সমাজের সমন্বয়ে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য-এর কমিটি গঠন করুন এবং দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধভাবে নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ গণজাগরণের কর্মসূচি অব্যাহত রাখুন।আগামী ১ অক্টোবর থেকে জাতীয় নেতারা দেশব্যাপী সভা-সমাবেশে যোগ দেবেন বলেও জানানো হয়।

খালেদা জিয়ার আইনগত অধিকার নিশ্চিত করতে হবে : ঘোষণায় আরো বলা হয়, ন্যায়বিচারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে অগ্রাহ্য, ব্যাহত ও অকার্যকর করে অন্যায়ভাবে কারারুদ্ধ সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার আইনগত ও ন্যায়সংগত অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে নির্বাচন করার প্রস্তুতির ঘোষণা দিয়েছেন। বিএনপি নির্বাচনে না এলে জাপা ৩০০ আসনে লড়বে বলেও এরশাদ জানান। আরেক সূত্রে জানা যায়, বিএনপি নির্বাচনে না এলে ১৪ দলের শরিক রাজনৈতিক দলগুলো এককভাবে লড়তে পারে। বিষয়টি আলাপ-আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের আসন সমঝোতা হবে। ‘ডামি’ প্রার্থী দিয়ে জয়ী করে আনা হবে শরিক দলগুলোর নেতাদের। অনুরূপভাবে বাম সংগঠন ও ইসলামী দলগুলোর ছোট ছোট জোটকেও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আনার চেষ্টা রয়েছে।

ইতিমধ্যেই সারা দেশে সভা-সমাবেশসহ নানা প্রচারণার মধ্য দিয়ে নির্বাচনী আমেজ তৈরিতে মাঠে নেমে পড়েছে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, তরীকত ফেডারেশনসহ জাতীয় পার্টি- জেপি। তারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা এড়ানো এবং বিএনপির চেয়ে নির্বাচনী প্রচারণার মাঠে এগিয়ে থাকতে এখন থেকে নির্বাচন পর্যন্ত মাঠে থাকবে। এর মাধ্যমে খালেদা জিয়ার মুক্তির নামে বিএনপির যেকোনো তৎপরতা প্রতিরোধ এবং জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সম্ভাব্য আন্দোলন মোকাবেলার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার সমাবেশকে ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবদের নতুন চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র বলে আখ্যায়িত করছে ক্ষমতাসীনরা।ঐক্যপ্রক্রিয়ার ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে ১৪ দলের করণীয় কী হবে তা নিয়েও আলোচনা হবে। করণীয় নির্ধারণ করতে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনাও করছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমেরিকা থেকে দেশে ফিরলে সার্বিক বিষয় তাঁকে অবহিত করা হবে।

১৪ দলের প্রধান শরিক আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয় গত ৩০ ও ৩১ আগস্ট সিলেট সফরের মধ্য দিয়ে। দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা এ সফরে অংশ নেন। এরপর চলতি মাসে রেলপথে ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গ পর্যন্ত নির্বাচনী প্রচারণা চালান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকসহ কেন্দ্রীয় নেতারা। গতকাল শনিবার তাঁরা সড়কপথে ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত নির্বাচনী প্রচারণায় গেছেন। এসব সভা-সমাবেশের মধ্য দিয়ে স্থানীয় নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করা ও দলীয় কোন্দল নিরসনের চেষ্টা করছে আওয়ামী লীগ। মাঠের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে আগামী নির্বাচনের আগ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের এ ধরনের নানা কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।পাবনার সাঁথিয়ায় ১৪ দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে জনসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার মিটিংকে ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবদের নতুন চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র বলে অভিহিত করা হয়।

১৪ দলের শরিক দলগুলোও সারা দেশে ব্যাপকভাবে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করতে যাচ্ছে। গত তিন দিনে জাসদ উত্তরবঙ্গের রংপুর, গাইবান্ধা, বগুড়ার বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকটি নির্বাচনী জনসভার আয়োজন করে। এসব জনসভায় জাসদ সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুসহ দলটির কেন্দ্রীয় বেশ কয়েকজন নেতা উপস্থিত ছিলেন। জনসভাগুলো থেকে সংসদ নির্বাচনে জাসদের স্থানীয় প্রার্থী ঘোষণা করা হচ্ছে। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় জনসভা শেষে দেশের অন্যান্য বিভাগেও এ নির্বাচনী প্রচারণার কর্মসূচি অব্যাহত রাখবে জাসদ।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা জানান, বিএনপি নির্বাচনে না এলেও এবারে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন হবে না। গতবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফাঁদে পড়ে সরকারের অনেক বদনাম হয়েছে। জাতীয় পার্টি, ১৪ দলের একাধিক শরিক ও বাম দলগুলোর অংশগ্রহণে নির্বাচন মোটামুটি উৎসবের আমেজেই অনুষ্ঠিত হবে।জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, ১৪ দলের মুখপাত্র ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ‘ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবরা সব এক হয়েছে। আমরা মাঠে ময়দানে আছি। ওরা (বিএনপি) আছে ড্রয়িং রুমে। সেখানে বসে পলিটিক্স করছে। আর কিছু লোক এসি হলরুমে বসে হুংকার দিচ্ছে। তাদের চক্রান্ত ব্যর্থ হবে। আওয়ামী লীগ জনগণকে নিয়েই তাদের মোকাবেলা করবে। নির্বাচনেও জয়ী হবে।

ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘আমাদের নির্বাচনী কাজ শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যেই সাতক্ষীরায় আমাদের কর্মসূচি পালন হয়েছে। এরপর আমাদের দলের সাধারণ সম্পাদক নাটোর, বগুড়া, গাইবান্ধায় যাবেন।তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে নানা মেরুকরণ হচ্ছে। উত্তর দক্ষিণ মিলে গেছে। কামাল হোসেনের ঐক্য প্রক্রিয়ায় এক-এগারোর মঈনুল হোসেন ও বিএনপি মিলে গেছে। আমরা চাই এরা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করুক। আমরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন চাই না।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, আমরা রাজপথে আছি, থাকব। (শনিবার) ফেনীতে জনসভা করলাম। এতে লক্ষাধিক জনতা উপস্থিত ছিল। এ উপস্থিতি প্রমাণ করে জনগণ আওয়ামী লীগের সঙ্গে আছে। এই জনগণই বিএনপিকে মোকাবেলা করবে।জাসদের সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার বলেন, অক্টোবরের মধ্যেই সারা দেশে প্রথম পর্যায়ে আমাদের নির্বাচনী প্রচারণার জনসভাগুলো শেষ হবে। আমরা বিভিন্ন এলাকায় জনসভা করে আমাদের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। আমরা মনে করি এবারে বিএনপি নির্বাচনে আসবে। তবে না এলেও এবারে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিায় নির্বাচন হবে না।সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া বলেন, ষড়যন্ত্রের ক্ষেত্র প্রস্তুত করার জন্য জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার এ মিটিং। জামায়াতের বিরোধিতার কথা বলে জড়ো হলেও এর মূল নিয়ামক শক্তি জামায়াত। তাই চূড়ান্তভাবে ফসল যাবে জামায়াত তথা দক্ষিণপন্থীদের ঘরে। আমরা জনগণকে নিয়ে এ ধরনের ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ডকে মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত আছি।