প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন,সরকারের করা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বিষোদ্গার ও নোংরামির বিরুদ্ধে লড়তেও কাজে লাগবে।বুধবার গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, সাইবার সিকিউরিটি প্রত্যেক দেশে বিরাট সমস্যা হিসাবে দেখা দিয়েছে। সেখানে সামাজিক, পারিবারিক সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের সমস্যা, পর্ন ইত্যাদি ছড়াচ্ছে। আমরা সে লক্ষ্যে উদ্যোগ নিয়েছি।সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী ফেইসবুকে ক্রিকেটার লিটন দাসের সাম্প্রদায়িক মন্তব্যের শিকার হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বলেন, ক্রিকেটার লিটন দাস দুর্গা পূজার শুভেচ্ছা জানিয়ে দেবীর ছবিসহ একটি পোস্ট দেওয়া পর ফেইসবুকে বাজে ও বিকৃত’ মন্তব্যের শিকার হন। পরে তিনি ওই পোস্ট সরিয়ে নেন। এ ধরনের পরিস্থিতি সামলাতে সরকার কী উদ্যোগ নেবে।জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এগুলো মোকাবেলার জন্য আমরা সাইবার সিকিউরিটি আইন করেছি। এ ধরনের নোংরামি যেন না হয়।বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক বলেন, দেশে মৌলবাদি দর্শনের বিস্তারের কারণেই হয়ত এ ধরনের ঘটনা বাড়ছে। এ বিষয়ে সরকার কী করবে। উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, র‌্যাডিকাইলাইজেশন তো হচ্ছে। আমি বলব, যারা এ ধরনের কাজ করে তারা বিকৃতমনা। তাদের কোনো নীতি নাই।এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে সমাজকে সচেতন করে তোলার এবং সাংবাদিকদের তাতে অগ্রণী ভূমিকা রাখার ওপর জোর দেন সরকারপ্রধান।

আগামী জাতীয় নির্বাচনে সব দল অংশ নেবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ও বার্তাপ্রধান শাইখ সিরাজের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্বাচন হবে। দেশের মানুষও ভোট দেবে। দেশে অনেক রাজনৈতিক দল। নির্বাচনে কোনও দল আসবে, আর কোন দল আসবে না, সে সিদ্ধান্ত তো আমরা নিতে পারি না। তবে আমাদের আশা, সব দলই নির্বাচনে আসবে।বিএনপিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ২০০৮ এর নির্বাচনে আমার চেষ্টা ছিল, সবাই অংশ নিক। কিন্তু সেই নির্বাচন ঠেকানোর নামে পুড়িয়ে পুড়িয়ে মানুষ মারা হলো। আপনারা যাদের নির্বাচনে চাইছেন, তারা মানুষ পুড়িয়ে মারে। আর যারা মানুষ পুড়িয়ে মারে, তাদের জন্য এত কান্নাকাটি কেন?

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৮ এর নির্বাচন ঠেকানোর নামে যাদের পুড়িয়ে মারা হয়েছে, তারা কেমন আছে, কেউ কি খোঁজ নিয়েছেন? আমি অনুরোধ করবো, ওই সময় যাদের পুড়িয়ে মারা হয়েছিল, তাদের পরিবার কেমন আছে, তাদের খোঁজ নিন। মানুষ পুড়িয়ে মারার ওই অন্দোলনে অনেক মানুষ কর্মক্ষমতা হারিয়েছে, তাদের সংসার কেমন চলছে? যে দলের আন্দোলন মানুষ পুড়িয়ে মারা, তাদের জন্য এতো মায়াকান্না কেন?তিনি বলেন, ২০০৮ সালে বিএনপির আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত অনেকে আমার কাছে আসে। আমি তাদের সাহায্য করি। যাদের কারণে মানুষের এই অবস্থা, তাদের জন্য মায়াকান্নার দরকার আছে বলে আমি মনে করি না।তিনি বলেন, তাদের বিরুদ্ধে আরও নানা অভিযোগ আছে, মামলা আছে। ওই সব অভিযোগ-মামলার সাক্ষীও আছে অনেক। খালেদা জিয়া, তার ছেলে, তার দলের অনেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আছে। শেখ হাসিনা বলেন, ‘উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকবে। মানুষ নৌকায় ভোট দেবে। কারণ, একমাত্র নৌকা ক্ষমতায় থাকলে উন্নয়ন হয়।

দেশের রাজনীতি নিয়ে বিশ্ব নেতারা কোনও পরামর্শ দেননি বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের ব্যাপারে এমন কোনও পরামর্শ আমাকে কেউ দেয়নি।এ সময় সাংবাদিকরা হাততালি দিলে তিনি বলেন, ‘তালি বাজানোর কিছু নেই। জনগণ ভোট দিলে আছি, না দিলে নাই।প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যার সঙ্গেই কথা বলেছি, তারা বলেছেন, তারা চান আগামীতেও যেন আমাদের সঙ্গে দেখা হয়। কিন্তু আমাদের দেশের নির্বাচন নিয়ে কী হবে না হবে, তা নিয়ে কোনও কথা হয়নি। তবে যাদের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন, আমি যেন পুনরায় ক্ষমতায় আসি।’ তিনি আরও বলেন, আমি বলেছি, আমাদের দেশে আগে কী হতো, মিলিটারি ডিক্টেটর থাকতে, নির্বাচন বলতে কী হতো? স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স, ছবিসহ ভোটার তালিকা,নির্বাচনি পরিবেশের যতটুকু উন্নয়ন হয়েছে, সেটা আমরাই করেছি।আমাদের সরকারের আমলে ছয় হাজারের ওপরে নির্বাচন হয়েছে, কয়টা নির্বাচনে আমরা হস্তক্ষেপ করেছি? বরিশাল সিটি নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশন তদন্ত শুরু করেছে। তারা তদন্ত করে রিপোর্ট দিয়েছে। আমরা তো সেখানে হস্ত ক্ষেপ করিনি।

শেখ হাসিনা আরও বলেন, সিলেটে আমরা হেরে গেছি। সামান্য ভোটে। বিএনপি থাকলে তো সিল মেরেই নিয়ে নিতো। আমরা তো সে পথে যাইনি। কাজেই, আমাদের ওপর মানুষের আস্থা-বিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমরা দেশের উন্নয় করি মনের টানে, নিজেদের স্বার্থে রাজনীতি করি না।তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তার বিরুদ্ধে দেওয়া মামলা প্রসঙ্গে সরকার প্রধান বলেন, ‘২০০৭ সালে কাদের পত্রিকায় বড় বড় হেডলাইন, প্রতিদিন আমাকে দুর্নীতিবাজ বানানোর অপচেষ্টা ছিল? আমার বিরুদ্ধে একের পর এক, মোট ১৬টা মামলা দিয়েছে। প্রত্যেকটা মামলা তদন্ত করে দুর্নীতির কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এখনও কেউ কেউ বসে থাকে যে, সরকার চলে যাবে, যারা মানুষের কাছে ভোট চাইতেও যাবে না, তারা ক্ষমতায় যাওয়ার খায়েশ আছে। তাদের খায়েশ পূরণ করতে গিয়ে তো মানুষকে খেসারত দিতে হয়। জাতির পিতাকে হত্যার পর এদেশে ১৯টা ক্যু হয়েছে। এটা নিশ্চয় আমাদের কারও ভুলে যাওয়া উচিত না।

শেখ হাসিনা বলেন, আজকে দশ বছর ক্ষমতায় আছি। সবাই শান্তিতে আছে। এটাই তো সব না। যারা ষড়যন্ত্র বা অবৈধ ক্ষমতা দখলকারীদের দ্বারা উপকৃত, তাদের তো একটা আকাঙ্ক্ষা থেকেই যায়। তাদের সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে গিয়েই তো দেশকে বারবার বিপদে পড়তে হয়। তিনি আরও বলেন, ‘৪১ সালের মধ্যে আমরা বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করবো। ২১০০ সালের ডেল্টা প্ল্যান অনুযায়ী।আপনি মাত্র এসেই আপনার দলের কর্মীদের বলেছেন, দেশে এখনও ষড়যন্ত্র চলছে। আপনি কী ধরনের ষড়যন্ত্রের অনুমান করছেন? শাবান মাহমুদের এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ষড়য্ন্ত্র তো একটা থাকবেই। তবে এটা নিয়ে পরোয়া করি না। খালি আমার নেতাকর্মীদের একটু সতর্ক করতে চাই। তারা ভাবছেন, দশ বছর ক্ষমতায় ছিলাম। অনেক ভালো কাজ করেছি। আবারও ক্ষমতায় আসবো। কিন্তু বাংলাদেশ তো সেরকম দেশ না। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরাতে ইতোমধ্যেই মিয়ানমারের সঙ্গে একটি চুক্তি হয়েছে জানালেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছে। বিষয়টা নিয়ে আমাদের আলোচনা চলছে। রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার ব্যাপারে বিশ্ব নেতারা মিয়ারমারের ওপর চাপ দিয়ে যাচ্ছেন।

জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার অভিজ্ঞতা জানাতে বুধবার এই সংবাদ সম্মেলনে আসেন প্রধানমন্ত্রী। তবে বরাবরের মতই সংবাদ সম্মেলনে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন প্রসঙ্গ আসে এবং জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন সরকারপ্রধান।সরকারের মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারাও এ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশন গণভবন থেকে এই সংবাদ সম্মেলন সরাসরি সম্প্রচার করে। প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্রে জাতিসংঘের ৭৩তম সাধারণ অধিবেশনে যোগদান শেষে গত ১ অক্টোবর দেশে ফেরেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগে তিনি নিউইয়র্কের উদ্দেশে গত ২১ সেপ্টেম্বর দেশ ত্যাগ করেন তিনি।