একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। রোববার (১১ নভেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে ঐক্যফ্রন্টের পক্ষে ড. কামাল হোসেন এই ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে নির্বাচন এক মাস পিছিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।সংবাদ সম্মেলনে ড. কামাল বলেন,আমরা জনগণের ঐক্যের ওপর জোর দিচ্ছি।আমাদের ইতিহাসে দেখা গেছে, যখনই জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে তারা বিজয় ছিনিয়ে এনেছে। ইনশাল্লাহ এবারও হবে। জনগণ ঐক্যবদ্ধ হবে। সবচেয়ে বড় দাবি পরিবর্তন। সংবিধানের মূল্যবোধকে কেন্দ্র করে এই ঐক্য গঠন করা হয়েছে। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য এই ঐক্য।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান জানাতে আজ এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।ড. কামালের পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট চিঠি দিয়ে সরকারের সঙ্গে সংলাপ করেছে। কিন্তু সংলাপের পর সরকারি দল সমঝোতার কোনও মনোভাব দেখায়নি। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে আমরা সরকারের কাছে যে সাত দফা দাবি দিয়েছি, তার প্রায় সবগুলো তারা পূরণের কোনও আশ্বাস তো দেনইনি, উপরন্তু কয়েকটিকে অসাংবিধানিক অভিহিত করেছে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংলাপে বলেছিলেন আমরা সভা করলে কোনও বিধিনিষেধ থাকবে না। এছাড়া গায়েবি মামলায় বিএনপি নেতাদের ধরপাকড় বন্ধ করা হবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। রাজশাহীতে বিএনপির জনসভায় নেতাকর্মীদের আসতে বাধা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া একদিনেই প্রায় ৫২ জনেরও বেশি বিএনপি নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে।বর্তমান সরকারের চাহিদা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের তফসিল পেছানোর আহ্বানে সরকার সাড়া দেয়নি। আর নির্বাচন কমিশনার সরকারের চাহিদা অনুযায়ী তড়িঘড়ি করে তফসিল ঘোষণা করেছে। তড়িঘড়ি করে একাদশ জাতীয় সংসদের তফসিল ঘোষণা প্রমাণ করে সরকার সংলাপের পর কোনও সমঝোতায় যায়নি। কোনও শর্তই সরকার পালন করেনি। এই পরিস্থিতিতে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হওয়া অসম্ভব ব্যাপার। তারপরও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তিনি নির্বাচনের তারিখ এক মাস পিছিয়ে দেওয়ার দাবি জানান। ফখরুল বলেন, ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন কমিশন ও সরকারের তৎপরতার প্রতি কড়া নজর রাখবে।জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট একক কোনও প্রতীকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করবে কিনা- সাংবাদিকদের এই প্রশ্নের জবাবে ফখরুল ও কামাল জানান, এই সিদ্ধান্ত পরে জানানো হবে।

ঐক্যফ্রন্টের সাত দফায় বর্তমান সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি ছিল। মুখে ‘দাবি থেকে না সরার’ কথা বললেও বর্তমান সংসদের মেয়াদকালে ভোট আয়োজনে সম্মতি দিয়ে মূল দাবি থেকে পিছু হটলেন ঐক্যফ্রন্টের নেতারা।

২৩ ডিসেম্বর ভোটের দিন রেখে নির্বাচন কমিশন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের যে তফসিল ঘোষণা করেছে, সেখানে ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা এবং ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময় রাখা হয়েছে।সংবিধান অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারির মধ্যে এ নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে নির্বাচন কমিশনের।ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ইতোমধ্যে বলেছেন, রাজনৈতিক জোটগুলোর দাবির প্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ভোটের তারিখ পিছিয়ে দিলে তাতে তার দল আপত্তি করবে না।

তবে নির্বাচন পেছানো হলে তা যৌক্তিকভাবে করতে হবে এবং যে দলগুলো জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করবে, তাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তা করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন কাদের।ঐক্যফ্রন্টের লিখিত বিবৃতিতে নির্বাচন পেছনোর পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলা হয়, ২০০৮ সালের নির্বাচনে তৎকালীন চার দলীয় জোটের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে তফসিল দুই দফা পেছানো হয়েছিল।

আর জোটের সাত দফা দাবির বিষয়ে সেখানে বলা হয়, এসব দাবি আদায়ের সংগ্রাম জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট অব্যাহত রাখবে। নির্বাচনে অংশগ্রহণকেও সেই আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিবেচনা করবে ফ্রন্ট।লিখিত বিবৃতিতে বলা হয়, একটা অংশগ্রহণমূলক এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের যাবতীয় দায়িত্ব সরকার ও নির্বাচন কমিশনের। নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতির পাশাপাশি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট কড়া নজর রাখবে সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের আচরণের প্রতি।

আমরা বলে দিতে চাই, জনগণের দাবি মানা না হলে উদ্ভূত পরিস্থিতির দায়-দায়িত্ব সরকার ও নির্বাচন কমিশনকেই নিতে হবে।এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ঐক্যফ্রন্ট নেতা কামাল হোসেন বলেন, আন্দোলনতো চলতেই থাকবে। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জন্য এবং পরিবেশ তৈরি করার জন্য আন্দোলন চলবে।কামাল হোসেনের নামে ফখরুলের পড়া ওই বিবৃতিতে বলা হয়, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির তথাকথিত নির্বাচন মানুষের ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকার, স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়া অধিকার হরণ করেছে। নিশ্চিতভাবে আগামী নির্বাচন দেশের মানুষের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের নির্বাচন হবে।আমরা বিশ্বাস করি, দশম সংসদ নির্বাচনের পর দেশে গণতন্ত্রের যে গভীর সঙ্কট তৈরি হয়েছে, সেই সঙ্কট দূর করে আমাদের ঘোষিত ১১ দফা লক্ষ্যের ভিত্তিতে একটা সুখী, সুন্দর, আগামীর বাংলাদেশ গড়ে তোলার সংগ্রামে দেশের জনগণ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পাশে থাকবে।

ঐক্যফ্রন্ট জোটগতভাবে নির্বাচন করলে এবং এক দল অন্য দলের প্রতীক ব্যবহার করতে চাইলে রোববারের মধ্যেই তা নির্বাচন কমিশনকে জানাতে হবে। তবে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে স্পষ্ট কোনো উত্তর দিতে পারেননি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা।ঐক্যফ্রন্টভুক্ত দলগুলো অভিন্ন প্রতীকে নির্বাচন করবে কিনা জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা পরে জানাব। অন্যদের মধ্যে বিএনপির মওদুদ আহমদ, জমিরউদ্দিন সরকার, জেএসডির আসম আবদুর রব, আবদুল মালেক রতন, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, গণফোরামের মোস্তফা মহসিন মনটু, সুব্রত চৌধুরী, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সুলতান মো. মনসুর আহমদ, গণস্বাস্থ্য সংস্থার ট্রাস্টি জাফরুল্লাহ চৌধুরীসহ ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় নেতারা সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।