দিন যত যাচ্ছে ব্যাংকিং সেবায় যুক্ত হচ্ছে নতুন মাত্রা। মোবাইল ব্যাংকিং, এজেন্ট ব্যাংকিং প্রভৃতির পর এবার আসছে বুথভিত্তিক ব্যাংকিং। অল্প খরচে ব্যাংকিং সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে নতুন এ সেবা চালু করতে যাচ্ছে ব্যাংকগুলো। এ বিষয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনাও দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকের কোনো পূর্ণাঙ্গ শাখার নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত স্বল্পব্যয়ী এ ব্যবসা কেন্দ্র বা বুথভিত্তিক ব্যাংক পরিচালিত হবে। ফলে ব্যাংকের শাখার মত সব সুবিধা পাওয়া যাবে না এসব কেন্দ্র থেকে। তবে অনেক সুবিধাই মিলবে বুথভিত্তিক এ ব্যাংকিং থেকে। মূলত আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বারোপ করতে নতুন এ সেবা চালু করার কথা বলছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে ব্যাংকগুলোর ব্যবসা কেন্দ্র স্থাপন নামে প্রজ্ঞাপন জারি জারি করে দেশে কার্যরত সব ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, এসব ব্যবসা কেন্দ্রের জন্য ‘ব্যাংকিং বুথ’-যুক্ত যে কোনো সুবিধাজনক বা উপযুক্ত নাম ব্যবহার করা যাবে।তবে এর পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বুথের আকার এক হাজার বর্গফুটের বেশি হবে না বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যাংকিং বুথের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দুইজন কর্মকর্তা নিয়োগ করার কথা বলা হয়েছে।

ব্যয়ের বিষয়ে বলা হয়েছে, স্বল্পব্যয়ী ব্যাংকিং আউটলেট বিবেচনায় প্রচলিত শাখা স্থাপনের জন্য নির্ধারিত বিভিন্ন ব্যয়সীমার চেয়ে ব্যাংকিং বুথ স্থাপনের ব্যয় এবং প্রচলিত শাখা কর্তৃক প্রদত্ত ব্যাংকিং সেবার জন্য নির্ধারিত ফি, চার্জ, কমিশনের চেয়ে ব্যাংকিং বুথে সেবা প্রদানের ফি, চার্জ, কমিশন প্রভৃতি কম ছাড়া বেশি হবে না। ব্যাংকিং বুথে খোলা যে কোনো ব্যাংক হিসাব নিয়ন্ত্রণকারী শাখার অর্থাত্ মূল ব্যাংক শাখায় খোলা হিসাব বলে বিবেচিত হবে। হিসাব খোলার ক্ষেত্রে গ্রাহক পরিচিতির তথ্যসহ (কেওয়াইসি) প্রচলিত বিধি-বিধান যথাযথভাবে পরিপালন করতে হবে। বুথের লেনদেন নিয়ন্ত্রণকারী শাখার বুকস অব অ্যাকাউন্টসে অন্তর্ভুক্ত হবে।ব্যাংকের ভল্টের নিরাপত্তার মতোই ব্যাংকিং বুথের নগদ টাকা জমা ও ক্যাশে থাকা টাকার পূর্ণ বিমা আচ্ছাদন নিশ্চিত করতে হবে। তাছাড়া প্রয়োজনে বুথে ভল্টও স্থাপন করা যাবে, তবে ওই ভল্ট নিয়ন্ত্রণকারী শাখার ভল্ট হিসেবে গণ্য হবে।

জানা গেছে, ব্যাংকিং বুথের সব লেনদেন রিয়েল টাইম বেসিস সম্পাদিত হবে এবং গ্রাহকদের তাত্ক্ষণিকভাবে এসএমএস ও প্রিন্ট রশিদ দিতে হবে। বুথে দেওয়া ব্যাংকিং সেবার পরিসর এবং যেকোনো লেনদেনের ঊর্ধ্বসীমা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে। বুথে বৈদেশিক বাণিজ্য-সংক্রান্ত কোনো কার্যক্রম সম্পাদন করা যাবে না। বুথগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ইন্টারনাল কন্ট্রোল অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স নীতিমালা এবং সংশ্লিষ্ট নির্দেশনার আলোকে ব্যাংকের নিরীক্ষা কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত রাখতে হবে। অর্থপাচারের ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রচলিত বিধি-বিধান মেনে চলতে হবে। ব্যাংকিং বুথের সেবা প্রদানের সময় হবে স্বাভাবিক ব্যাংকিং সময়। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন সাপেক্ষে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে ব্যাংক তার ব্যবসা ও গ্রাহকসেবার স্বার্থে অন্য সময়েও ব্যাংকিং বুথ খোলা রাখতে পারবে।

বুথভিত্তিক ব্যাংকিংয়ে নিরবচ্ছিন্ন ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা-সংবলিত তথ্যপ্রযুক্তি কাঠামো থাকার কথা বলা হয়েছে। বুথে যেসব সেবা পাওয়া যাবে তার একটি তালিকা দৃশ্যমান স্থানে টাঙিয়ে রাখতে হবে। ওই বুথে অভিযোগ কেন্দ্র থাকার কথা বলা হয়েছে। অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে।

এর আগে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অংশ হিসেবে ২০১৪ সালে ‘এজেন্ট ব্যাংকিং’ সেবা চালুর অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০১১ সালে শুরু হয় মোবাইল ব্যাংকিংয়ের যাত্রা। এরই মধ্যে দেশে মোবাইল ব্যাংকিং ও এজেন্ট ব্যাংকিং অনেক জনপ্রিয়তা পেয়েছে।বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের মাধ্যমে ১৮টি ব্যাংকে ২০ লাখ ২৮ হাজার ৮৬৪ জন গ্রাহক হিসাব খুলেছেন। এসব হিসাবে গড়ে ১২ হাজার ৪০৭ টাকা জমা রয়েছে। অর্থাত্ এই সময়ে মোট স্থিতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৫৭৭ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের এজেন্টের সংখ্যা তিন হাজার ৯০২টি এবং যাদের আউটলেট রয়েছে পাঁচ হাজার ৭৯১টি।অন্যদিকে ২০১১ সালের ৩১ মার্চ দেশে প্রথমবারের মতো মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালু হয়। এখন পর্যন্ত দেশে ১৮টি ব্যাংক মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালু করেছে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক সংখ্যা এখন ছয় কোটি ৭০ লাখ। তবে সচল অ্যাকাউন্ট রয়েছে তিন কোটি ৫৫ লাখ। ব্যাংকগুলোর মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্ট সংখ্যা আট লাখ ৭৯ হাজার ৭২৭।সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন এ সেবা চালু হলে ব্যাংকগুলোর লোকসানি শাখা কমবে। একইসঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্তাও বাড়বে। তবে এক্ষেত্রে আর্থিক খাত নিয়ে ঝুঁকির বিষয়টিও মাথায় রেখে সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং ব্যাংকগুলো আরও দায়িত্বশীল ও সতর্ক ভূমিকা থাকতে হবে।