স্বাগত ২০১৯।স্বাগত নতুন বছর। রাত ১২টার পর থেকেই বিশ্ব মেতে ওঠে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর আনন্দে। মধ্যরাত পেরিয়ে যে সূর্যের দেখা মিলবে তা নতুন বছরের সূর্য। আর ওই সূর্যের আলোয় ভর করেই আসবে নতুন দিনের স্বপ্ন।

বিদায় নিল ২০১৮। সঙ্গে বিদায় নিয়েছে দুঃখ, কষ্ট আর স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার সময়গুলো। গত বছর অর্জনের ঝুলিটাও নিশ্চয়ই কম নয়। ওই সফলতার স্মৃতি থাকবে প্রেরণা হয়ে। যারা না ফেরার দেশে চলে গেছেন তাঁদের শূন্যতাও বার বার ফিরে আসবে। দুঃস্বপ্নকে ভুলে নতুন করে বুক বাঁধার এটাই সেরা সময়। সেরা অর্জনকে শ্রেষ্ঠত্বে রূপ দেওয়ার এটাই সময়। নতুন বছর এ কারণেই বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।বাংলাদেশে ইংরেজি নববর্ষের আয়োজন আসে ভিন্ন আমেজ নিয়ে। জানুয়ারি মানেই শীতের পিঠাপুলির আয়োজন। গ্রামের পথ ধরে আসে হরেক রকমের শীতের সবজি। ঘরে ঘরে বাহারি নকশীকাঁথার বিলাসিতা। বাংলাদেশে নতুন বছর মানেই শীতের সকালে কুয়াশা ভেদ করে আসার নরম রোদ। শিশুর হাসির মতই নিষ্পাপ সেই রোদের তাপ। নতুন সম্ভাবনা নিয়ে ভাবার এরচেয়ে সেরা সময় আর কীইবা হতে পারে?

বাংলাদেশে ইংরেজি নববর্ষ মানেই স্কুলে নতুন বইয়ের গন্ধ। নতুন ক্লাসে উঠার আনন্দ। নব উদ্যমে নিজের পড়াশোনা গোছানোর প্রেরণা। নতুন বছরে শিশু-কিশোরদের হাতে আসবে নতুন বই। আবারো মেতে উঠা নতুন বইয়ের পাতায় পাতায়। গ্রামবাংলায় থাকবে নানা খেলার আয়োজন, নানা ধরনের মেলার আসর। বার্তাসংস্থা বাসস জানিয়েছে, বাংলাদেশে ২০১৮ সাল ছিল বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্জনের বছর। এ বছর রাজনীতি, অর্থনীতি, কৃষি, জঙ্গি দমন এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশ আশাতীত সাফল্য অর্জনসহ মধ্য আয়ের দেশে এগিয়ে যাওয়ার পথে উন্নীত হয়েছে।এ বছর বিশ্ব সূচকেও বাংলাদেশের অনেক সাফল্য রয়েছে। এছাড়াও রাজনীতি এবং অর্থনীতি পরিবেশ ছিল শান্তিপূর্ণ। রাজনৈতিক পরিস্থিতি শান্ত থাকায় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনেও এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ।অপরদিকে, নববর্ষ উদযাপন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে পুলিশ বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করে নির্দেশ জারি করেছে। রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

এদিকে, ফোটে যে ফুল আঁধার রাতে/ঝরে ধুলায় ভোর বেলাতে/আমায় তারা ডাকে সাথে- আয় রে আয়।/সজল করুণ নয়ন তোলো, দাও বিদায়…।গানে গানে কথাগুলো বলেছিলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। সব বিদায়ের সঙ্গেই লুকিয়ে আছে এমন আনন্দ- বেদনার কাব্য। সেটা বর্ষবিদায়ের বেলায়ও।আজ আমাদের জীবন থেকে বিদায় নেবে আরেকটি খ্রিস্টীয় বছর। ২০১৮ সালের শেষ সূর্যটি গোধূলির পর হারিয়ে যাবে মহাকালের গর্ভে। আর রাত ১২টা পেরোলেই শুরু হবে নতুন খ্রিস্টীয় বছর ২০১৯।

আমাদের জীবনের সব কর্মকান্ড ইংরেজি সালের গণনায় হয় বিধায় খ্রিস্টীয় বছর অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। সেই বিবেচনায় বিদায়ী বছরটা কেমন গেল তার হিসাব কষবেন অনেকেই। ভালো, মন্দ, আনন্দ, বেদনার স্মৃতিগুলো আরও একবার রোমন্থন করবেন। একইভাবে জীবনের সব ধরনের নেতিবাচক বিষয়গুলোকে দূরে ঠেলে সুন্দর আগামীর প্রত্যাশায় নতুন করে পথচলার প্রত্যয় ব্যক্ত করবেন।২০১৮ সালের সর্বশেষ দিন আজ। যার যার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, ভাবনায় বছরটি নানাভাবে মূল্যায়িত হবে। তবে আমাদের জাতীয় জীবনে বিদায়ী বছরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ২০১৮ বেশ ঘটনাবহুল একটি বছর। নানা ক্ষেত্রে অনেক চ্যালেঞ্জ এসেছে, ঘটেছে উত্থান-পতনের খেলা। তারপরও এগিয়ে যাচ্ছি আমরা।বিদায়ী বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি ইতিমধ্যেই জাতীয় জীবনে ঘটে গেছে। ১১তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন রোববার অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়েছে।২০১৮ সালে বাঙালির জাতীয় জীবনে আরেকটি বড় ঘটনা ঘটেছে ১২ মে বাংলাদেশ মান সময় ভোর ২টা ১৪ তে। (১১ মে ২০১৮ ইউটিসি) এ সময় কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে বাংলাদেশের প্রথম ভূস্থির যোগাযোগ উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু-১ উৎক্ষেপণ করা হয়। এটি বাংলাদেশকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

অন্যদিকে এ বছরের ৮ ফেব্র“য়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদন্ড দেন আদালত। একই মামলায় বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ অপর পাঁচ আসামিকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদ-ের আদেশ দেন আদালত।বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ ঘটেছে এ বছর। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন নীতি সংক্রান্ত কমিটি (সিডিপি) ১৫ মার্চ এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের যোগ্যতা অর্জনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়। এলডিসি ক্যাটাগরি থেকে উত্তরণের জন্য মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ সূচক ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকের যে কোনো দুটি অর্জনের শর্ত থাকলেও বাংলাদেশ তিনটি সূচকের মানদ-েই উন্নীত হয়েছে।

জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিলের (ইকোসক) মানদ- অনুযায়ী এক্ষেত্রে একটি দেশের মাথাপিছু আয় হতে হবে কমপক্ষে ১২৩০ মার্কিন ডলার, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় তার থেকে অনেক বেশি ১৬১০ মার্কিন ডলার। মানবসম্পদ সূচকে ৬৬ প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশ অর্জন করেছে ৭২ দশমিক ৯। অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক হতে হবে ৩২ ভাগ বা এর কম, যেখানে বাংলাদেশের রয়েছে ২৪ দশমিক ৮ ভাগ।২০১৮ সাল পৃথিবীর ইতিহাসেও আরেকটি উল্লেখযোগ্য বছর। জুন মাসে পৃথিবীর মানুষ প্রত্যক্ষ করে বিশেষ এক সাক্ষাৎকার। দুই পারমাণবিক শক্তিধর শক্রভাবাপন্ন দেশ আলোচনায় বসে।প্রথমবারের মতো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠক করেন।সাংবাদিক জামাল খাশোগি অক্টোবর মাসে সৌদির ঘাতক টিমের হাতে নিহত হন। শুরুর দিকে সৌদি সরকার হত্যাকা-ের কথা অস্বীকার করলেও পরে স্বীকার করেছে যে, খাশোগিকে হত্যার পর টুকরো টুকরো করা হয়েছে। তবে তারা এখনও পরিষ্কার করেনি, এই হত্যাকা-ের পেছনে কার নির্দেশ ছিল।জুন মাসেই বিশ্বকাপ ফুটবল ২০১৮ আয়োজন করে রাশিয়া। এ খেলায় শিরোপা জয় করে ফ্রান্স।প্রিন্স হ্যারি ও মার্কিন অভিনেত্রী মেগান মার্কেলের বিয়ে হয় এ বছর। মে মাসে তারা জুটি বাঁধেন। উইন্ডসরে রানী ও ছয়শ’ অতিথির সামনে তারা প্রতিশ্রুতি বিনিময় করেন। পৃথিবী জুড়ে লাখ লাখ মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল তাদের বিয়ে।এ বছর পৃথিবীজুড়ে অনেকবার চরম আবহাওয়া বয়ে এনেছে। ইউরোপের খরা থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের বনে আগুন আর এশিয়ায় চরম বৃষ্টিপাত হয়েছে। বিশ্ব এজেন্ডার শীর্ষে ছিল জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, পৃথিবীর তাপমাত্রা দিনে দিনে আরও বেড়ে চলেছে।

বছরজুড়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রাধান্য পেয়েছে রোহিঙ্গা সংকট। মিয়ানমারের রাখাইনে সেনাবাহিনী যে গণহত্যাসহ অবর্ণনীয় নির্যাতন চালিয়েছিল তা নিয়ে চুপ থাকা এবং সংকট নিরসনে ভূমিকা না রাখায় অং সান সু চিকে তিরস্কারের মুখোমুখি হতে হয়েছে অনেকবার। এছাড়া বেশ কয়েকটি দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা একের পর এক তাকে দেয়া পদক ও সম্মাননা ফিরিয়ে নিয়েছে। ৯২ বছর বয়সে নির্বাচন করে আবারও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন মাহাথির মোহাম্মদ।