সুবর্ণচরে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার নারীকে গুরুতর আঘাত এবং ধর্ষণ করার অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেলেও নির্বাচনের সঙ্গে এই ঘটনার সম্পর্ক খুঁজে পায়নি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত দল। বরং ওই নারীর স্বামীর দায়ের করা এজাহারের ভাষ্য মতে, ‘পূর্ব শত্রুতার জেরেই এ ঘটনা ঘটেছে’ এই বাক্যটি প্রতিবেদনের মতামত অংশে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।

একাদশ জাতীয় নির্বাচনের রাতে (রোববার, ৩০ ডিসেম্বর) মধ্যম বাগ্যা গ্রামের সোহেল, হানিফ, স্বপন, চৌধুরী, বেচু, বাসু, আবুল, মোশারেফ ও ছালাউদ্দিন ৪০ বছর বয়সী ওই গৃহবধূর বসতঘর ভাঙচুর করে। একপর্যায়ে তারা ওই নারীর স্বামী ও চার সন্তানকে বেঁধে রেখে তাকে ঘরের বাইরে নিয়ে গণধর্ষণ শেষে পিটিয়ে আহত করে।

এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর স্বামী ৯ জনকে আসামি করে চরজব্বার থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, আসামিরা তার বসতঘর ভাঙচুর করে, ঘরে ঢুকে বাদিকে পিটিয়ে আহত করে। সন্তানসহ তাকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে দলবেঁধে ধর্ষণ করে। ধানের শীষে ভোট দেওয়ার কারণেই এ ঘটনা ঘটে বলে ওই পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল।

মানবাধিকার কমিশনের তিন সদস্যের কমিটিতে প্রধান ছিলেন মানবাধিকার কমিশনের পরিচালক (অভিযোগ ও তদন্ত) আল-মাহমুদ ফয়জুল কবীর। এছাড়া কমিশনের উপ-পরিচালক সুস্মিতা পাইক ও গাজী সালাহউদ্দিনও এই কমিটিতে ছিলেন।

এ বিষয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেন, কমিশনের তদন্ত কমিটি ধর্ষণ ও গুরুতর আঘাতের সঙ্গে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক আছে বলে প্রমাণ পায়নি। তবে প্রাথমিকভাবে ওই নারী যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, তার সত্যতা মিলেছে। এ ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। কমিশনের পক্ষ থেকে যথাযথ তদন্ত করে আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়েছে, ঘটনার সঙ্গে যে বা যারাই জড়িত থাকুক না কেন।

তবে গতকাল শনিবার রাতে টেলিফোনে ধর্ষণের শিকার ওই নারী এক জাতীয় দৈনিককে বলেন, আগে থেকে শত্রুতা থাকলে আসামিরা তো আগেই ক্ষতি করত। তিনি কোনো দল করেন না দাবি করে বলেন, ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তিনি নিজের ইচ্ছেমতো ধানের শীষে ভোট দেন। তবে ভোটের কাগজ কেমনে করে ভাঁজ করতে হবে বা কোথায় রাখতে হবে, তা জানা না থাকায় সেখানে উপস্থিত মামলার আসামিদের হাতেই তিনি তা দেন। তখন একজন ধমক দিয়ে বলে, সন্ধ্যাকালে খবর আছে।

তবে মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘মামলার এজাহারে ওই নারীর ধানের শীষের নেতা-কর্মী-সমর্থক হওয়া, তাঁর ধানের শীষে ভোট দেওয়া, আসামিরা নৌকা প্রতীকের নেতা-কর্মী-সমর্থক ও পোলিং এজেন্ট হওয়া, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচনী বিরোধের জের ধরে মারধর বা ধর্ষণের শিকার হওয়া, তা উল্লেখ নেই। বরং এজাহারে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে আসামিরা পূর্ব শত্রুতার জের ধরে মারধর ও ধর্ষণ করে।

এ ছাড়া ওই নারী তদন্ত কমিটির সামনে দেওয়া জবানবন্দির কোথাও বলেননি যে তিনি ধানের শীষে ভোট দিয়েছেন। তাঁর স্বামীও এসব কথা বলেননি।’ স্বামী-স্ত্রীর জবানবন্দি থেকেই প্রতিবেদনের উপসংহার হিসেবে বলা হয়েছে, ‘একাদশ সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষে ভোট দেওয়া বা ভোট দেওয়ার কারণে এ ঘটনা ঘটেছে বা আসামিরা আওয়ামী লীগের কর্মী হওয়া বা আওয়ামী লীগের কোনো কর্মীর মাধ্যমে ওই নারীকে মারপিট ও ধর্ষণের শিকার হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায় না।’

ঘটনার পর আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) একটি প্রতিনিধি দল পাঠায় সুবর্ণচরে। এ দল ফিরে এসে লিখিত প্রতিবেদন দেয়নি। তবে আসকের নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজা বলেন, ‘আমাদের প্রতিনিধি দলকে ধর্ষণের শিকার নারী পূর্বশত্রুতার জেরের কথা যেমন বলেছেন, তেমনি ভোটের দিনের ঘটনাও বলেছেন।’

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদনের কপি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব বরাবর পাঠানো হয়েছে।