ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলার বালিয়ান ইউনিয়নের নয়াবিলা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ২ বছর ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছে। বাকী শিক্ষকদের গড় হাজিরা থাকায় দিনের পর দিন শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে বিদ্যালয়টিতে। সংস্কারের নামের টাকা আসলেও প্রধান শিক্ষক একাই সে টাকা আতœসাৎ করেছে। এরই মধ্যে টিনের বেড়া ভেঙ্গে গিয়ে ভিতর থেকে বাহির দেখা যায়। বেঞ্চ সরকার না করায় মাটির ফ্লোরে ধুলাবালিতে চটে শিক্ষার্থীরা ক্লাস করছে।

উপজেলার বালিয়ান ইউনিয়নের নয়াবিলা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ২০০৯ সালে স্থাপিত হয়। ২০১৩ সালে বিদ্যালয়টি সরকারী হিসাবে স্বীকৃতি পায়। সরকারী ঘোষনায় হওয়ার পরও সুচতর প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমান ও তৎকালীন সভাপতি ৪ জন শিক্ষক থাকার পরও নতুন করে সাবিনা আকতার ও মেহেরুন নেছাকে নিয়োগ দেন। সরকারী নিয়মানুযায়ী ৪ জন শিক্ষকের বিলভাতা হওয়ার কথা থাকলেও শিক্ষক বেশি নিয়োগ দেয়ায় শরিফা খাতুন বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করে। ফলে বিদ্যালয়টি সরাকারী হলেও শিক্ষকদের বিলবেতন আটকে যায়। বিষয়টি জটিল আকার ধারন করলে নিয়োগের নামের ঘুষ বানিজ্যে কথা প্রকাশ পাওয়ার পর ২০১৭ সাল থেকে বিদ্যালয়ে আসা বন্ধ করে দেন প্রধান শিক্ষক। সে সময় প্রধান শিক্ষক স্লিপ প্রকল্পের ৪০ হাজার টাকার কোন সংস্কার না করেই আতœসাৎ করেন বলে সহকারী শিক্ষকরা অভিযোগ করেন।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমান ২ বছর ধরে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকায় অন্যান্য শিক্ষকরাও বিদ্যালয়ে গড় হাজিরা দিয়ে থাকেন।

সোমবার সকাল ৯ টার সময় সরেজমিন বিদ্যালয় পরিদর্শন করে দেখা গেছে, বিদ্যালয়টি কোন দরজা জানালা নেই। এরই মধ্যে ভেঙ্গে গেছে টিনের বেড়া। ঘরের ভিতর থেকে বাহির দেখা যায়। ফ্লোর কাঁচা হওয়ায় শ্রেনী কক্ষে ধুলা উড়ছে। নেই কোন চেয়ার টেবিল। কাাঁচা ফ্লোরে ধূরাবালিতে চটের উপর বসে আছে দ্বিতীয় শ্রেনীর ৬/৭ জন শিক্ষার্থী। পাশের ১ম শ্রেনীর কক্ষের অবস্থা একই সে কক্ষে বসে আছে ৫/৬ জন শিক্ষার্থী। শিশু শ্রেনীতে এক কোনায় যেখানে ধুলা কম সেখানে বসে আছে ৪/৫ জন কোমল মতি শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থীদের কাপড় চোপড়ে লেগে আছে বিদ্যালয় কক্ষের ধুলাবালি।

অফিস কক্ষের অবস্থা আরও করুন। চেয়ারগুলো ভেঙ্গে গেছে। দরজা জানালা নেই। ভিতরে বসা দুজন সহকারী শিক্ষক শরিফা খাতুন ও শামীমা ইয়াসমিন। বিদ্যালয়ের নেই কোন সাইন বোর্ড। একটা অর্ধেক বাঁশের আগায় ঝুঁলছে জাতীয় পতাকা।
উপস্থিত থাকা দুজন শিক্ষক স্বীকার করলেন ২ বছর ধরে বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের অনুপস্থিতি। প্রধান শিক্ষক কর্তৃক স্লিপ প্রকল্পের আতœসাৎ করা ৪০ হাজার টাকা।

প্রধান শিক্ষক ২ বছর ধরে বিদ্যালয়ে না আসায় এরই মধ্যে কমে গেছে শিক্ষার্থী। বর্তমানে কাগজে কলমে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১শ ৯৭ জন। কিন্তু বাস্তবে এ হিসাব মেলানো খুই কঠিন।

বিদ্যালয়ে বারান্দায় পায়চারী করছেন অভিভাবক জোসনারা। তার ছেলে গতবার পিএসসি পরিক্ষায় উত্তীর্ন হয়েছে সে এখন ৬ষ্ট শ্রেনীতে পড়ে। বিদ্যালয় থেকে খুব চাপ দেয়া হয়েছে জন্ম নিবন্ধন কার্ড জমা দেয়ার জন্য। কিন্তু তার ছেলেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করার সময় জন্ম নিবন্ধন কার্ডের মূল কপি জমা দিয়ে ভর্তি করে ছিলেন। প্রধান শিক্ষক সে সময় জন্ম নিবন্ধন কার্ডটি ফেরাত দেয়ার কথা বললেও এক বছর ধরে তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আসছেন কার্ডটি ফেরত নেয়ার জন্য এখন পর্যন্ত সে প্রধান শিক্ষকের দেখা পাননি।

বিদ্যালয়ের পাশের বাড়ীর বালিয়ান ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত আসনের মহিলা মেম্বার ফরিদা ইয়ামিন জানান, ২ বছর ধরে বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক যান না। বাকী যারা আছে তারাও অনিয়মিত। বিদ্যালয়ে কোন লেখা পড়া হয়না। আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিয়ে আমরা শংকিত হয়ে পড়েছি।

বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেনীতে পড়া শিক্ষার্থীর নাম হৃদয় তার শ্রেনী রোল-৪। নিজের নাম লিখতে বলায় দুজন শিক্ষককের সামনে তিনি লিখলেন রিদয়। ক্লাশের বিষয়ে কথা বললে হৃদয় জানান, একটা করে হয়। চটে বসলে শরীর জামা কাপড়ে ধুলা লাগে।

২ বছর ধরে অনুপস্থিত থাকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে ক্লাস্টারের দায়িত্বে থাকা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আব্বাস উদ্দিন জানান, প্রধান শিক্ষক অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন। বেতন ভুক্ত না হওয়ায় আমরা তার বিরুদ্ধে ব্যবসস্থা গ্রহন করতে পারছি না। বিদ্যালয়টি যেহেতু সরাকরী নিয়ম তার মানতে হবে। না মানলে কেন ব্যবস্থা গ্রহন করা যাবে না জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। তবে তিনি প্রধান শিক্ষকের ৪০ হাজার সরাকারী টাকা আতœসাতের বিষয়টি স্বীকার করেন।

ফুলবাড়ীয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার জীবন আরা জানান, ২ বছর ধরে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিত ভাবে জানিয়েছেন। আতœসাৎ করা স্লিপ প্রকল্পের ৪০ হাজার টাকা আতœসাতের বিষয়টি খতিয়ে দেখে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহনের আশ্বাস দেন তিন।